ভাঙনের আরও কাছে পৌঁছে গেছে যুক্তরাজ্য! সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন। চুক্তিতে তিন অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিন নেতার কথায়, ওয়েস্টমিনস্টারের সময় শেষের দিকে—এমন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে এই সমঝোতা। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের অবস্থান বোঝাতে তারা ‘ওয়েস্টমিনস্টার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
আরও পড়ুন
ভেঙে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য? শিগগির আসছে বড় ঘোষণা
তিন অঞ্চলের নেতাদের বিরল ঐক্য
যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই প্রথম তিন অঞ্চলের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা স্বাধীনতা বা একীভূত হওয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি স্বাধীনতার পক্ষে। ওয়েলসের রুন আপ আইওরওয়ার্থও স্বাধীনতাপন্থি।
অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের পক্ষে।
আরও পড়ুন
জানুন ইতিহাস / যুক্তরাজ্য আর ব্রিটেন কিন্তু এক নয়
আয়ারল্যান্ড এক শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থেকে যায়।
এই তিন নেতার একসঙ্গে এমন অবস্থান যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
লন্ডনের সরকার বলছে, ঐক্য অটুট
তবে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার এই উদ্যোগকে বড় কোনো হুমকি হিসেবে দেখছে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মুখপাত্র টম ওয়েলস বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের ঐক্যের প্রতি দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল।
তার মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোসহ মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানেই সরকারের বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, বিভাজনের বদলে অভিন্ন মূল্যবোধ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে মানুষ একসঙ্গে থাকলেই যুক্তরাজ্য সবচেয়ে শক্তিশালী হয়।
আরও পড়ুন
যুক্তরাজ্যের ভাঙন ঠেকাতে পারবেন না বার্নহাম, বলল সিন ফেইন
গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পাবলিক পলিসির পরিচালক নিকোলা ম্যাকইউয়েনও বলেছেন, তিন নেতার সম্মেলন প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কোনো আইনি প্রভাব নেই।
তার মতে, এই চুক্তির কারণে যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতার জন্য গতকালের তুলনায় আজ বড় কোনো হুমকি তৈরি হয়নি।
স্কটল্যান্ডে আবার স্বাধীনতার দাবি
স্কটল্যান্ড ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য গণভোট করেছিল। তখন ৫৫ শতাংশ ভোটার স্বাধীনতার বিপক্ষে এবং ৪৫ শতাংশ পক্ষে ভোট দেন।
তবে ব্রেক্সিটের পর স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার সমর্থন বেড়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
আরও পড়ুন
কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল সম্পর্ক
যুক্তরাজ্য ২০১৬ সালের গণভোটের পর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যায়।
স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন সুইনি মনে করেন, এখন স্বাধীনতা নিয়ে গণভোট হলে স্কটিশ ভোটাররা স্বাধীনতার পক্ষেই ভোট দেবেন।
তবে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে লন্ডনের সঙ্গে তার মতবিরোধ রয়েছে। বার্নহাম গত সপ্তাহে পার্লামেন্টে বলেছিলেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে ‘স্পষ্ট ঐকমত্য’ তৈরি হলে তিনি গণভোটের অনুমতি দেবেন।
পরে অবশ্য সুইনিকে চিঠি দিয়ে তিনি জানান, বর্তমানে এমন গণভোটের অনুমতি দেওয়া হবে না।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে একীভূত আয়ারল্যান্ডের দাবি
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।
১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির মাধ্যমে তিন দশকের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের অবসান হয়। এই সংঘাত ‘দ্য ট্রাবলস’ নামে পরিচিত।
চুক্তি অনুযায়ী, জনমত জরিপে যদি দেখা যায়, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব গণভোটে জিততে পারে, তাহলে গণভোট আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে যুক্তরাজ্য সরকার মনে করে, সেই পর্যায়ের জনসমর্থন এখনো তৈরি হয়নি।
এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য আয়ারল্যান্ডেও গণভোটে অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিলের চুক্তিতে সই নিয়েও রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে।
ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) উপপ্রধানমন্ত্রী এমা লিটল-পেংগেলি অভিযোগ করেছেন, ও’নিল ফার্স্ট মিনিস্টারের পদকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন।
জবাবে ও’নিল বলেন, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটছে।
ওয়েলসের অবস্থানও বদলাচ্ছে
ওয়েলসের নেতা রুন আপ আইওরওয়ার্থ স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিলেও কবে গণভোট আয়োজন করা হবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা দেননি।
তবে তিন অঞ্চলের নেতাদের যৌথ উদ্যোগে ওয়েলসের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা সামনে এসেছে।
যুক্তরাজ্যে ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে নিজস্ব পার্লামেন্ট ও কিছু নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
তবে জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও যুক্তরাজ্যজুড়ে প্রযোজ্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ লন্ডনের হাতেই রয়েছে।
এই ক্ষমতার বিভাজন নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন মাত্রা
তিন অঞ্চলের নেতাদের চুক্তির মাত্র দুইদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের একীভূত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
আইরিশ ওপেনের আয়োজক তার গলফ কোর্স পরিদর্শনের সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি আয়ারল্যান্ডকে আবারও একীভূত হতে দেখতে চান।
তার এই মন্তব্য যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সূত্র: এপিকেএএ/