ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিধ্বস্ত হওয়ার ছয় বছর পরও পুনর্নির্মাণ হয়নি সাতক্ষীরার আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। নির্মাণ হয়নি প্রয়োজনীয় সেতু-কালভার্টও। ফলে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো ও নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে ছয় গ্রামের প্রায় ২৮ হাজার মানুষকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে কুড়িকাহুনিয়া-গড়াইমহল খাল হয়ে কপোতাক্ষ নদের পুরোনো লঞ্চঘাট পর্যন্ত একটি সড়ক এবং সনাতনকাটি-নাকনা সংযোগ সড়ক মিলিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের জলোচ্ছ্বাসে সড়ক দুটির বড় অংশ ভেঙে যায়। পরের বছর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের জোয়ারে ক্ষতি আরও বাড়ে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেসে গিয়ে কোথাও কোথাও গভীর খালের সৃষ্টি হয়েছে। এরপর কয়েক বছর পার হলেও সড়ক দুটি আগের অবস্থায় ফেরেনি।
৭০০ ফুটের বাঁশের সাঁকোই ভরসা
সরেজমিনে দেখা গেছে, গড়াইমহল খালের ওপর স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ৭০০ ফুট দীর্ঘ বাঁশের সাঁকো। সাঁকোটি দিয়ে একসঙ্গে একাধিক মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের পার হতে অন্যের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ শত শত মানুষ এ পথে যাতায়াত করেন। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় নৌকা ছাড়া পারাপারের সুযোগ থাকে না।
শিশু শিক্ষার্থী সিয়াম হোসেন বলেন, প্রতিদিন স্কুলে যেতে এই বাঁশের সাঁকো পার হতে হয়। বৃষ্টি হলে বাঁশ পিচ্ছিল হয়ে যায়। তখন খুব ভয় লাগে। অনেক সময় বই-খাতা নিয়ে সাঁকো পার হওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ে।
শারীরিক প্রতিবন্ধী খাইরুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিক মানুষেরই এই সাঁকো পার হতে ভয় লাগে। আমার মতো মানুষের জন্য আরও কঠিন। কারও সাহায্য ছাড়া পার হতে পারি না। একটা সেতু হলে আমাদের এই কষ্ট থাকত না।
আরও পড়ুন
যশোরে ৩৪ মোটরসাইকেলসহ কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্য আটক
রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতেও ভোগান্তি
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় কেউ অসুস্থ হলে। মোটরসাইকেল, ভ্যান বা অ্যাম্বুলেন্স সরাসরি বাড়ির কাছে যেতে পারে না। রোগীকে কোলে, চেয়ারে অথবা অন্যের সহযোগিতায় সাঁকো পার করে নৌকায় তুলতে হয়।
অসুস্থ শাহাজাহান গাজীর বলেন, অসুস্থ শরীরে চিকিৎসকের কাছে যেতে হলেও আগে এই সাঁকো পার হতে হয়। জরুরি রোগী হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। রাতে রোগী নিয়ে বের হলে কীভাবে পার করব, সেটাই বড় চিন্তা।
স্থানীয় বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, ছোট ছেলেমেয়েদের একা সাঁকো পার হতে দিতে ভয় লাগে। আমরা সঙ্গে গিয়ে পার করে দিই। বর্ষার সময় ভয় আরও বেড়ে যায়। এত বছরেও একটা কালর্ভার্ট হয়নি।
একই এলাকার বাসিন্দা সুরাইয়া খাতুন বলেন, গর্ভবতী নারী বা অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নিতে হলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয়। রাতের বেলা পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। এদিয়ে কোনো যানবাহন চলে না।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ জানিয়েছেন, আম্পান ও ইয়াসে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও প্রয়োজনীয় সেতু-কালভার্ট না থাকায় কয়েকটি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
তিনি বলেন, সড়ক দুটি এলাকার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ বাঁশের সাঁকো ও নৌকায় চলাচল করছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা প্রয়োজন।
আশাশুনি উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী অনিন্দ্যদেব সরকার বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এলজিইডিকে কাজ করার সুযোগ দিলে অথবা প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) পাওয়া গেলে সড়ক পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত কাজ শুরু করার চেষ্টা করা হবে।
এনএইচআর