নীল সমুদ্র, সাদা বালুর সৈকত আর বিলাসবহুল রিসোর্টের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত মালদ্বীপ। তবে পর্যটনকেন্দ্রিক রিসোর্ট এলাকার বাইরে স্থানীয় দ্বীপগুলোতে দেখা যায় ভিন্ন এক সামাজিক বাস্তবতা। সেখানে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে আজান, নামাজ, মসজিদ, হিজাব ও ইসলামি সংস্কৃতি।
রাজধানী মালে শহরের ব্যস্ত সড়ক, বাজার ও আবাসিক এলাকায় আধুনিক নগরজীবনের পাশাপাশি চোখে পড়ে মসজিদের মিনার। নামাজের সময় অনেক মানুষকে মসজিদমুখী হতে দেখা যায়। ধর্মীয় অনুশীলন দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হিজাবে মালদ্বীপের নারী
মালদ্বীপের স্থানীয় দ্বীপগুলোতে নারীদের পোশাকে ইসলামি মূল্যবোধের প্রভাব স্পষ্ট। অনেক নারী হিজাব, স্কার্ফ, আবায়া কিংবা বোরকা পরেন। আবার কেউ আধুনিক পোশাকের সঙ্গে মাথায় স্কার্ফ ব্যবহার করেন।
রাজধানী মালে শহরে পোশাকের বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি হলেও স্থানীয় আবাসিক দ্বীপগুলোতে শালীন পোশাক ও হিজাবের ব্যবহার আরও দৃশ্যমান।
স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, গত দুই দশকে নারীদের মধ্যে হিজাব ও ধর্মীয় পোশাক ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। ২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামির পর জীবন ও মৃত্যু এবং ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল বলেও তাদের কেউ কেউ মনে করেন।
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়ায় অন্যের পারমিটে চাকরি, ১৭৪ বাংলাদেশি আটক
তবে ধর্মীয় পোশাক ব্যবহারের পরিবর্তনকে শুধু সুনামির ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ধর্মীয় শিক্ষা, আলেমদের দাওয়াতি কার্যক্রম, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশ—বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
নামাজের সময় বদলে যায় মালের চেহারা
মালদ্বীপে নামাজ অনেকের ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক জীবনযাত্রারও অংশ। নামাজের সময় মালে শহরের কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কর্মীরা মসজিদে নামাজ আদায় করতে যান। কোথাও অল্প সময়ের জন্য দোকান বন্ধ রেখে নামাজ শেষে আবার ব্যবসা শুরু করা হয়।
শুক্রবারের চিত্র আরও আলাদা। জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের উপস্থিতি বাড়ে। ব্যস্ত শহরে সাময়িকভাবে কর্মচাঞ্চল্য কমে আসে এবং মসজিদমুখী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়।
মালে ৩০টিরও বেশি মসজিদের শহর
আয়তনে ছোট হলেও ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী মালে শহরে ৩০টিরও বেশি মসজিদ রয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকা, বাজার ও আবাসিক অঞ্চলের মাঝেই ছড়িয়ে আছে এসব মসজিদ।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা, ধর্মীয় শিক্ষা ও বিভিন্ন ইসলামি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মসজিদগুলো স্থানীয় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। মালে শহরে শুধু আধুনিক মসজিদই নয়, রয়েছে কয়েক শত বছরের পুরোনো ইসলামি স্থাপত্যের নিদর্শনও।
হুকুরু মিস্কি—প্রবাল পাথরে ইসলামের ইতিহাস
মালদ্বীপের ঐতিহাসিক হুকুরু মিস্কি বা মালে ফ্রাইডে মসজিদ দেশটির ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মসজিদটি ১৬৫৮ সালে নির্মিত। এটি ১১৫৩ সালে নির্মিত একটি প্রাচীন মসজিদের স্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রবাল পাথর, কাঠের কাজ, সূক্ষ্ম নকশা ও আরবি ক্যালিগ্রাফি মসজিদটির স্থাপত্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।
মালদ্বীপের প্রবাল-পাথরের মসজিদগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন সংস্কৃতির পারস্পরিক যোগাযোগ ও স্থাপত্যশৈলীরও সাক্ষ্য বহন করে। ‘কোরাল স্টোন মসজিদ অব মালদ্বীপ’ নামে প্রবাল-পাথরের মসজিদগুলোর একটি সিরিজ ইউনেসকোর সম্ভাব্য বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাতেও রয়েছে।
মসজিদ শুধু ইবাদতের জায়গা নয়
মালদ্বীপের স্থানীয় সমাজে মসজিদের ভূমিকা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন শিক্ষা, ধর্মীয় আলোচনা, ইসলামি শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র হিসেবেও মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক দ্বীপে মসজিদকে কেন্দ্র করে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় সমাজে মসজিদ ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
পর্যটনের দেশ, স্থানীয় দ্বীপে ভিন্ন বাস্তবতা
মালদ্বীপ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। বিদেশি পর্যটকদের জন্য রিসোর্ট দ্বীপগুলোতে তুলনামূলকভাবে আলাদা পরিবেশ রয়েছে। তবে রিসোর্টের বাইরে স্থানীয় দ্বীপগুলোর সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে পোশাক, ধর্মীয় আচরণ ও সামাজিক জীবনযাত্রায় ইসলামি মূল্যবোধের প্রভাব স্পষ্ট।
একদিকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ, অন্যদিকে স্থানীয় সমাজে শক্তিশালী ইসলামি পরিচয়—এই দুই বাস্তবতা একই সঙ্গে মালদ্বীপের সামাজিক চিত্রকে তুলে ধরে।
সুনামি ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন
২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরের ভয়াবহ সুনামি মালদ্বীপেও আঘাত হানে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে দেশটির বহু দ্বীপ ও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই অভিজ্ঞতার পর জীবন, মৃত্যু ও স্রষ্টার প্রতি মানুষের নির্ভরতা নিয়ে নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়েছিল বলে কয়েকজন স্থানীয়ের অভিমত।
তবে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে ধর্মীয় অনুশীলন বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে সুনামিকে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। ধর্মীয় শিক্ষা, দাওয়াতি কার্যক্রম, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস
মালদ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা ও লোককথা রয়েছে। প্রচলিত বর্ণনায় আবুল বারাকাত ইউসুফ আল-বারবারির নাম পাওয়া যায়।
ইউনেসকোর ঐতিহাসিক বিবরণে মালদ্বীপে ইসলাম গ্রহণের সময়কাল ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর ধীরে ধীরে ধর্মটি দেশটির রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিচয়ের কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে ওঠে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামি পরিচয় মসজিদ, স্থাপত্য, শিক্ষা, সামাজিক রীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।
মালদ্বীপের আরেক পরিচয়
মালদ্বীপকে শুধু রিসোর্ট, পর্যটন ও সমুদ্রসৈকট দিয়ে দেখলে দেশটির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। স্থানীয় সমাজে ইসলামি সংস্কৃতির উপস্থিতিও দেশটির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাজধানী মালে শহরের আধুনিক নগরজীবনের মধ্যেও মসজিদের উপস্থিতি, নামাজের সময় মানুষের মসজিদমুখী হওয়া, স্থানীয় নারীদের মধ্যে হিজাবের ব্যবহার এবং দ্বীপভিত্তিক ধর্মীয় সংস্কৃতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
আর শত শত বছরের পুরোনো প্রবাল-পাথরের মসজিদগুলো সাক্ষ্য দেয়, মালদ্বীপে ইসলাম শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়; দেশটির ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত।
সমুদ্রের নীল জলের আড়ালে যেমন রয়েছে প্রবালপ্রাচীর, তেমনি পর্যটনের ঝলমলে মালদ্বীপের বাইরেও রয়েছে মসজিদ, আজান, নামাজ, হিজাব ও ইসলামি সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা স্থানীয় সমাজের এক ভিন্ন চিত্র।
এমআরএম