
আমরা যে জগতে বাস করি, সেটা শব্দের জগৎ। শব্দ বলতে যদি আপনি আওয়াজ বুঝে থাকেন, তবে সমস্যা নেই। পৃথিবীতে বায়ু আছে বলেই শব্দ বা আওয়াজ তৈরি হয়। কিন্তু সব শব্দ বা আওয়াজই ভাষার উপাদান নয়। ভাষার উপাদান হিসেবে যে শব্দের কথা বলা হয়, তা বাক্যের একক এবং আপাতভাবে ধরে নেওয়া হয় সেই শব্দের অর্থ আছে। এ লেখায় শব্দকে বাক্যের উপাদান হিসেবে ধরতে হবে।
বক্তা ও শ্রোতার কিংবা লেখক ও পাঠকের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করে যে মাধ্যম, তাকে ভাষা বলা যায়। এই বিবেচনায় শব্দের উচ্চারিত রূপ যেমন আছে, অনুচ্চারিত রূপও আছে। আবার যোগাযোগ যে কেবল ভাষিক উপাদানের মাধ্যমে হয় তা নয়, অভাষিক উপাদান, যেমন প্রতীক বা চিহ্ন, অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি, ইশারা-ইঙ্গিত, দৃষ্টি, স্পর্শ, এমনকি নীরবতার মাধ্যমেও হতে পারে। শিরোনামের ‘ভাষা’ শব্দ দিয়ে মূলত ভাষিক যোগাযোগ বোঝানো হয়েছে।
আর ‘জগৎ’ বলতে মানুষের বাস্তব ও অবাস্তব—ভাষা ব্যবহারের এই দুই ক্ষেত্র বুঝতে হবে। এর একটি প্রত্যক্ষ জগৎ, যেখানে মানুষ অপর মানুষের সঙ্গে সরাসরি ভাষা ব্যবহার করে। আরেকটি জগৎ কল্পনার, যেখানে মানুষ নিজের মতো চিন্তা করে। এই দুই জগতে ভাষা একই কাঠামো নিয়ে থাকে না।
এই প্রশ্নের উত্তর হলো না, মানুষ ভাষা দিয়ে চিন্তা করে না। মানুষ যদি ভাষা দিয়ে চিন্তা করত, তবে মানবসভ্যতার আদি থেকেই ভাষা ছিল বলতে হয়। ভাষার উৎপত্তি ও বিবর্তনের ধারণা এটা বলে যে ধ্বনিগুচ্ছের সমবায়ে শব্দ তৈরির ক্ষমতা মানুষ একদিনে অর্জন করেনি।
মানুষের চিন্তাভাবনা বরং প্রাক্-ভাষিক, অর্থাৎ ভাষাকাঠামোর আগের রূপ। এর মধ্যে আছে মনের ছবি, ধারণা ও আবেগীয় অনুভূতি। তবে ভাষা চিন্তার স্তরকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তি শুধু অপরের সঙ্গে নয়, নিজের সঙ্গেও কথা বলার সময় প্রায়ই শব্দ ব্যবহার করে। এখান থেকে ভাষা সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যায়—ভাষা কেবল পরস্পরের যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ব্যক্তির নিজের প্রকাশ ও উপলব্ধিরও ধরন।
প্রথাগত ব্যাকরণ শব্দকে চিহ্নিত করে তার অর্থসংশ্লিষ্টতা দিয়ে। তবে বাক্যের অন্তর্গত না হওয়া পর্যন্ত শব্দের অর্থ নির্ধারণ করা কঠিনই বটে! যেমন কামানের গোলা এসে পড়ল তার ধানের গোলার ওপর। এখানে দুই গোলার অর্থ আলাদা; বাক্যে ব্যবহারের আগপর্যন্ত তা আলাদা করা যায় না।
তবে শব্দের অর্থের ব্যাপারটা একেবারেই ধারণাগত। অর্থাৎ আমরা গরুকে ‘গরু’ বলে ডাকি বলেই তার নাম গরু। গরুর নাম ‘গোলাপ’ রাখা হলে আমরা গরুকে গোলাপ বলে ডাকতাম। বাস্তব জগতের বস্তু বা উপাদান প্রাথমিকভাবে কোনো নাম দ্বারা চিহ্নিত হয়। এর সঙ্গে সরাসরি কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। রিচার্ডস ও অগডেন ব্যাপারটিকে অর্থ–ত্রিভুজের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন। এই ত্রিভুজের এক প্রান্তে থাকে শব্দ, এক প্রান্তে থাকে নির্দেশিত বস্তু এবং এ দুইয়ের মাঝখানে শীর্ষ প্রান্তে থাকে শব্দের ধারণাগত অর্থ।
জিওফ্রে লিচ বলেন, প্রতিটি শব্দ কিছু অর্থ–বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি। যেমন ‘বাঘ’ বলতে বোঝায়: এটি প্রাণী, এটি হিংস্র, এটি মাংসাশী, এটি চতুষ্পদী, এটি স্তন্যপায়ী, এটি লেজযুক্ত, এর চামড়া ডোরাকাটা ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্য যত বাড়ানো যায়, শব্দটির দ্বারা নির্দেশিত বস্তু বা উপাদান তত নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হয়। এ ধরনের সাধারণ অর্থকে ধারণাগত অর্থ বলা যায়।
তবে বাঘ শব্দটি আরও বহু ব্যঞ্জনায় ভাষায় ব্যবহৃত হতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে ‘বাঘ’ বলার মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্বের এমন দিক উন্মোচিত হয়, যা তাকে বাঘের সদৃশ করে তোলে। আবার যদি বলা হয় ‘সুন্দরবনে একসময় আর বাঘ থাকবে না’ কিংবা ‘হাসমত ভাইকে বাঘে খেয়েছে’, তবে সেখানে বাঘের ধারণাগত অর্থ ঠিকই থাকে, আর দুই বাক্যে বাঘের প্রতি দুই ধরনের প্রবল অনুভূতিও যুক্ত হয়ে যায়।
ধ্বনিবাদীরা ধ্বনির সঙ্গে শব্দের অর্থের যোগ খুঁজে পান। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেন, প ও ট ধ্বনির আলাদা রূপ ও অন্তর্গত অর্থ আছে। এই দুয়ের সম্মিলনে পট শব্দ তৈরি হয়, যেখানে প ও ট ধ্বনির অন্তর্গত অর্থ একসঙ্গে বিদ্যমান আছে। আবার ‘পটকা’ পট করে ফাটে বলেই তার নাম পটকা। বারবার পট পট করে ফাটার আওয়াজ থেকে পাওয়া যায় নতুন শব্দ ‘পটপট’। পটপট আওয়াজ খই ভাজার সময়ে যেমন হয়, তেমনি মানুষের মুখ দিয়েও খইয়ের মতো পটপট করে শব্দ বের হতে পারে।
ধ্বনির সঙ্গে অর্থের যোগ ধ্বন্যাত্মক শব্দ দিয়েও বোঝা যায়। টকটকে, চকচকে—এসব শব্দের মধ্যেও ধ্বনি বা আওয়াজ লুকিয়ে আছে। কাঠের মধ্যে আঙুল দিয়ে বারবার টোকা দিলে টকটক শব্দ হয়। এই শব্দ কানের, এটাই যখন চোখে তীব্র অনুভূতি তৈরি করে, তখন তা হয় ‘টকটকে লাল’। আবার পিতলের তেল মাখানো কলসি চকচক করে, সেটা চোখের অনুভূতি। সেই কলসির গায়ে আঙুল দিয়ে ঘষা দিলে কানে চঅক্ শব্দ শোনা যাবে।
শব্দের অর্থ যে নির্দিষ্ট নয়, তা ভাষা ব্যবহারকারী দ্রুত বুঝতে শুরু করে। যেমন ‘আমার হাতে অনেক বই’ কিংবা ‘আমার হাতে অনেক কাজ’ বললে এক রকম অর্থ বোঝাবে না। নোয়াম চমস্কি এ ধরনের ধারণাকে ভাষার ব্যবহার ও ভাষাবোধের উপরিতল ও গভীরতলের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন।
আবার একটি শব্দ একই গঠন নিয়ে নানা রকম অর্থ প্রকাশ করতে পারে। আগেই দেখানো হয়েছে, ‘গোলা’ বলতে ধানের গোলা, কামানের গোলা—দুইই বোঝাতে পারে। আবার ভিন্ন ভিন্ন অর্থের সঙ্গে লুকিয়ে থাকতে পারে এদের কোনো সূত্র বা আদি সম্পর্ক। যেমন ‘পাতা’ শব্দটি গাছের পত্রফলক এবং বইয়ের পৃষ্ঠা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আপাতভাবে এ দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক নেই মনে হতে পারে। কিন্তু গাছের পাতাতেই একসময়ে লেখা হতো। সেসব পাতা সুতা দিয়ে একত্রে গাঁথা বা গ্রন্থিত হওয়ার পর তার নাম হয়েছে গ্রন্থ। এখন গ্রন্থের কাগজের পৃষ্ঠা বা ডিজিটাল বইয়ের পৃষ্ঠাকেও বলা হচ্ছে পাতা।
সমার্থক শব্দ কখনোই পুরোপুরি সম-অর্থক হয় না। যেমন সূর্য শব্দের সমার্থক হিসেবে সবিতা, অরুণ, মার্তণ্ড ইত্যাদি নির্দেশ করা যায়। সবগুলোই সূর্য, তবে এক রকম সূর্য নয়। অতিপ্রত্যুষের সূর্য—যেটা এখনো পুরোপুরি ওঠেনি, কেবল উঠি উঠি করছে, তাকে বলা হয় সবিতা। ওঠার পর প্রথম সকালে যখন ডিমের কুসুমের মতো গোল লাল রং ধারণ করে, তখন তার নাম হয় অরুণ। তাই কবি বলতে পারেন—‘অরুণ প্রাতের তরুণ দল’। দুপুর বা বিকেলের আকাশে অরুণ পাওয়া যাবে না। আবার মধ্যদুপুরের গনগনে সূর্যকে বলে মার্তণ্ড।
জন লায়ন্স বলেন, ভাষায় পূর্ণ সমার্থক শব্দ পাওয়ার ব্যাপারটি প্রায় অসম্ভব। এমনকি সমার্থ শব্দকোষে একটি শব্দের পাশে একগুচ্ছ শব্দের তালিকা থাকলেও সেগুলো পুরোপুরি সম-অর্থবোধক হয় না। ‘নারী’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত ললনা, রমণী, কামিনী, রামা ইত্যাদি শব্দেরও যে কারণে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। মানুষের চিন্তা ও ভাষা ব্যবহারের জগতে সেগুলো এক মনে হয় মাত্র।
বিপরীত শব্দগুলো তারতম্য ধারণার সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে চান এডওয়ার্ড স্যাপির। যেমন একটা বস্তা ভারী, আরেকটা বস্তা তার চেয়েও ভারী। তাদের তারতম্য কম হলে দুটিই ভারী হিসেবে চিহ্নিত হবে। কিন্তু তাদের তারতম্য বেশি হলে বলা যাবে, একটা হালকা, একটা ভারী। বিপরীত শব্দ অনেক সময় একটি অন্যটির পরিপূরক হয়। যেমন জীবিত শব্দের বিপরীত মৃত। যখন কাউকে জীবিত বলা হয়, তার মানে সে মৃত নয়। কিংবা কাউকে মৃত বলা মানে, সে জীবিত নয়। এই দুই শব্দের সংযোগে তৈরি ‘জীবন্মৃত’ শব্দ নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করে।
আবার ‘ছোট-বড়’, ‘লম্বা-খাটো’—এ ধরনের বিপরীতার্থক শব্দগুলো সাধারণভাবে আপেক্ষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একজন ব্যক্তি ছোট বা বড় হতে পারে, কিন্তু সেটা অন্য কারও সাপেক্ষে। আবার ছোট সব সময় ছোট নয়, কিংবা বড় সব সময় বড় নয়। ধরা যাক বলা হলো, ছোট একটা হাতির পিঠে বড় একটা পিঁপড়া বসে আছে। এই বাক্যে ছোট ও বড় শব্দ দুটি স্বাভাবিক বিপরীত শব্দের মতো আচরণ করছে না।
উত্তর হলো, না। একটি শব্দ সব শব্দের সঙ্গে মিলতে পারে না বা বসতে পারে না। জন ফার্থ বলেন, কোনো শব্দকে বুঝতে হলে তার সাথের শব্দগুলোকে দেখতে হবে। এ কারণে মিষ্টি হাওয়া, মিষ্টি কথা, মিষ্টি মেয়ে—এগুলো বলা গেলেও সাধারণ প্রয়োগে মিষ্টি আকাশ বা মিষ্টি হাত বলা যায় না। আবার ‘মিষ্টি চোর’ বললে শব্দের অর্থ ও প্রয়োগগত ধরন বদলে যায়। তখন মিষ্টি গুণবাচক শব্দ না হয়ে নামবাচক শব্দে পরিণত হয়।
শব্দের আরেকটি গুণ হলো গুচ্ছাকারে থাকা। বাক্যে শব্দ ব্যবহৃত হয় গুচ্ছাকারে। যেমন একদল সাদা হাতি গভীর জঙ্গল থেকে গ্রামে এসে পড়েছে। এই বাক্যে চারটি শব্দগুচ্ছ আছে: (১) একদল সাদা হাতি, (২) গভীর জঙ্গল থেকে, (৩) গ্রামে এবং (৪) এসে পড়েছে। প্রতিটি গুচ্ছ বা একক আলাদাভাবে অর্থের এককও তৈরি করে।
তা হতে পারে, না–ও পারে। যেমন ‘একেবারে রাজকুমারের মতো দেখতে’—এই বাক্যের সাধারণ একটা অর্থ আছে। কিন্তু উচ্চারণের বা কণ্ঠস্বরের ভিন্নতার কারণে এর অর্থ সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে পারে। স্বর বাঁকিয়ে যদি বলা হয়, ‘হ্যাঁহ্, একেবারে রাজকুমারের মতো দেখতে!’, তাহলে নিশ্চয় আগের মতো অর্থ বোঝাবে না।
আবার যা বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে বক্তা তার অতিরিক্ত কিছু বোঝাতে চান। যেমন ঘরে অতিথি ঢুকে যদি বলেন, ‘আজ খুব গরম পড়েছে’, তবে তিনি বন্ধ থাকা ফ্যানটি প্রকারান্তরে চালিয়ে দিতে বলেন, কিংবা এক গ্লাস শরবত দেওয়ার ইঙ্গিত করেন। শ্রোতাও এ ক্ষেত্রে শুধু শব্দের ধারণাগত কিংবা বিশেষ অর্থ দিয়ে তাঁর বাস্তব জগৎ বা চিন্তার জগৎ নির্মাণ করেন না।
সহজ করে এর উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, অতীতের ভাষা যদি রূপান্তরিত হয়ে এ পর্যায়ে এসে থাকে, তবে বর্তমানের ভাষাও দূর ভবিষ্যতে বদলে যাবে। সে ক্ষেত্রে ভাষার শব্দ এভাবে না–ও থাকতে পারে, কিংবা শব্দ নতুন আচরণ করতে পারে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নতুন নতুন শব্দের জন্ম দেবে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে ভবিষ্যতের ভাষাও গতিশীল হবে; সে ক্ষেত্রে সংক্ষেপণের কারণেও শব্দের রূপের বদল ঘটবে।
শব্দের অবাধ আদান–প্রদানের কারণে ভাষার ব্যাকরণ অনিয়মিত হয়ে পড়বে, ভাষাগত ব্যবধানও কমে যেতে পারে। বর্তমানে মানুষের অন্তর্জগতের বোধ ও চিন্তা মূলত প্রাক্-ভাষিক উপাদান দিয়ে পরিচালিত হয়; ভাষিক উপাদান, যেমন শব্দ, বাক্য সেখানে গৌণ হয়ে থাকে। ভবিষ্যতে এই অন্তর্জগতের ভাষাই বহির্জগতের ভাষা হয়ে উঠতে পারে।