‘হ্যালো, এটা কি সারের কন্ট্রোল রুম? আচ্ছা, আসলে আমার কোনো সমস্যা নেই; লাইনটা সত্যিই চালু আছে কি না তা একটু পরীক্ষা করে দেখলাম!’
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এমন একটি কল আসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুমে। ওপার থেকে নিজের ঠিকানা না দিয়ে পরিচয় তাপস মন্ডল জানিয়ে ফোন কেটে দেওয়া হয়।
তার এমন অদ্ভুত কথা শুনে কিছুটা বিব্রত কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা। ঠিক ওই ঘটনা যখন ঘটে, জাগো নিউজের প্রতিবেদক সেখানে নিউজের তথ্যের জন্য নিজেই উপস্থিত ছিলেন।
এরপর ওই শিফটে কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বরত কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (পরিকল্পনা) আব্দুল আওয়াল জাগো নিউজকে বলেন, কন্ট্রোল রুম ১১ সেপ্টেম্বর চালু হলো। এরপর এখন পর্যন্ত অসংখ্য কল আসে। কিন্তু যে কারণে এটি খোলা হয়েছে, সে ধরনের প্রয়োজনে কল আসে এখন পর্যন্ত ৩০টি। বাঁকি বেশিরভাগ অপ্রয়োজনীয়।
অর্থাৎ মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে কোনো অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ফোন করা মানুষের সংখ্যা অপ্রয়োজনীয় ফোনের চেয়ে কম।
মূলত, দেশের নানা এলাকার সার সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ পরিস্থিতি তদারকিতে এ ‘সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম’ চালু করে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কিন্তু সরকারের দেওয়া এই বিশেষ সেবাটি কৃষক ও প্রান্তিক পর্যায়ের কতটা পৌঁছাতে পেরেছে, কতটা কার্যকর সেটার একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে এবার।
আরও পড়ুন
ইউপি মেম্বারের বাড়িতে মিললো ৩৪ বস্তা সার
দেখা গেছে, কন্ট্রোল রুমে ফোন দিয়ে অনেকে ভুয়া অভিযোগও দিচ্ছেন। ওইদিন সকালে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা থেকে হাবিবুর রহমান মহসিন পরিচয়ে একজন অভিযোগ করেছিলেন। তার অভিযোগ নথিভুক্তও হয়।
ফোনে অভিযোগ করা হয়েছিল, তার এলাকার ডিলার কৃষকদের সার দিচ্ছেন না। এরপর কন্ট্রোল রুম থেকে ওই এলাকার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল ফয়সালকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, অভিযোগকারী মিথ্যা বলেছেন, তার অভিযোগ সত্য নয়।
কন্ট্রোল রুম থেকে প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে সেটি সমাধানের জন্য সবাই সচেষ্ট। তবে কিছু অপ্রয়োজনীয় ফোন আসছে এটাও সত্য- কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক।
এরপর জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সালের সঙ্গে। তিনি ফোনে জানান, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সেখানে যান। এরপর অভিযোগকারীকে সার নিতে আসতে বললে, তিনি আসেননি। তিনি কৃষক কি না সেটাও জানা যায়নি।
আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, সেখানে নজরুল ডিলার বলতে মেসার্স আওয়াল অ্যান্ড ব্রাদার্সের কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার নজরুল। অভিযোগকারী বলেছিলেন, সেখানে সকাল থেকে ৪০-৫০ জন কৃষক সার না পেয়ে ফিরে গেছেন, সেটাও সত্য নয়। আমরা অন্যান্য কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছি। সকাল থেকে বিতরণের তালিকাও যাচাই করেছি।
আরও পড়ুন
সার ডিলারদের কমিশন বাড়ছে, কৃষক পর্যায়ে দাম অপরিবর্তিত
সারের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন একাধিক কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সার সরবরাহ, মজুত ও বিতরণ পরিস্থিতির তথ্য জানতে চাওয়া কিংবা কোন অভিযোগ না দিয়ে কন্ট্রোল রুমে অনেকেই কীভাবে ডিলার হবেন, অন্য এলাকার বরাদ্দ, সার্বিক মজুতসহ নানা তথ্য চাচ্ছেন। অনেকে নিজের পরিচয় গোপন করে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন।
তাহলে এ সারের কন্ট্রোল রুমে কোনো উপকার মিলছে না? এমনটাও নয়। সেখানে উপস্থিত থাকতে নাম প্রকাশ না করে রাজশাহী গোদাগাড়ী এলাকা থেকে একজন বলেন, তিনি সার নিতে গিয়ে পাননি। শোভন ট্রেডার্সের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে। পরে কন্ট্রোল রুম থেকে অভিযোগ তদন্তে গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বলা হয়।
আরও পড়ুন
খোলাবাজারে সার বিক্রি করায় ডিলারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা
এরপর ফোনে উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহমেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ওই ডিলার প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন না বলে তিনি অঙ্গীকার করেছেন। তবে অভিযোগকারী নিজের পরিচয় গোপন করায় তিনি সার পেয়েছেন কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ৫২৮ নম্বর কক্ষে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম চলছে। এজন্য ২৭টি দল গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি দলে একজন কর্মকর্তা, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন অফিস সহায়ক রয়েছেন। কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই শিফটে চলবে। প্রথম শিফট সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা এবং দ্বিতীয় শিফট বেলা ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে।
কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম নিয়ে মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক জাগো নিউজকে বলেন, কন্ট্রোল রুম থেকে প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে সেটি সমাধানের জন্য সবাই সচেষ্ট। তবে কিছু অপ্রয়োজনীয় ফোন আসছে এটাও সত্য।
তিনি বলেন, গত একমাসের মধ্যে সার নিয়ে কিছু জায়গায় বিশৃঙ্খলা হয়েছে। এমন একটা ঘটনা কিন্তু সম্প্রতি এ কন্ট্রোল রুম থেকে সমাধান হয়েছে। গাইবান্ধা ফুলছড়িতে সম্প্রতি ডিলারের দোকান খোলার নির্ধারিত সময়ের আগেই ৪০-৫০ জন স্থানীয় লোক ও কৃষক জড়ো হয়ে হট্টগোল করে। পরে ফোনের মাধ্যমে কৃষি কর্মকর্তাসহ প্রশাসন দিয়ে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা গেছে।
আরও পড়ুন
কৃষকের সার গুদামে আছে, মাঠে নেই
এছাড়া ফোনে সার পরিবহনে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত, কালোবাজারি বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে- যেটা সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রণালয় বলছে, কোনো জেলা বা উপজেলায় সার সংকটের আশঙ্কা দেখা দিলে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করছে কন্ট্রোল রুম। মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে প্রতিটি অভিযোগের প্রতিকার ও প্রাপ্ত তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে প্রতিবেদন আকারে। প্রতিদিনের সার পরিস্থিতি, পাওয়া অভিযোগ, গৃহীত ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি রেজিস্টারে সংরক্ষণ করা হয়।
আরও পড়ুন
গুদামে সার, মাঠে সংকট—সমস্যা কোথায়?
এবার সার ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগের জন্য ০৫০৩৫১ ফোন নম্বর দেওয়া হয়েছে।
এনএইচ/এমআইএইচএস