
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আকর্ষণীয় করতে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এগুলো হচ্ছে—জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে কর্মসূচি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর নমিনি হিসেবে স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়া, বিদ্যমান ৬০ বছর বয়সের বদলে ৫৫ বছর বয়স থেকেই পেনশন–ব্যবস্থা চালু করা ইত্যাদি।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হবে। এটি পেনশন কর্তৃপক্ষের চতুর্থ পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক। এতে উপস্থাপনের জন্য পেনশন কর্তৃপক্ষ ১১টি আলোচ্যসূচি রেখেছে।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যেসব প্রস্তাব পর্ষদ থেকে অনুমোদন পাবে, সেগুলো পরে বাস্তবায়নের দিকে যাবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
বর্তমানে চারটি সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু আছে। এগুলো হচ্ছে প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস। এগুলোর মাধ্যমে কর্মজীবী, অনিয়মিত আয়ের মানুষ ও প্রবাসীরা পেনশন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের ৪ শ্রেণির প্রায় ১০ কোটি মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট চালু করা হয় সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থা।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, চালুর তিন বছর পার হয়ে গেছে। সর্বজনীন পেনশনের চারটি কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছেন ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন গ্রাহক। তাঁদের জমা করা মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
সমতা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন এবং তাঁদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ কোটি টাকা। প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত প্রবাস কর্মসূচিতে সাড়া সবচেয়ে কম। এতে এ পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে নারী আছেন ৯৭ জন। তাঁদের মোট জমা করা আমানতের পরিমাণ ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
গ্রাহকেরা বলছেন, সর্বজনীন পেনশন–ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আগ্রহ কম হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। ব্যাংকের আমানতের তুলনায় রিটার্ন কম হওয়া এবং পেনশনের আগে গ্রাহকের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা কম থাকা এর অন্যতম কারণ।
পাঁচ বছর পরই টাকা তোলার সুযোগ
বিদ্যমান পেনশন–ব্যবস্থায় একবার কোনো কর্মসূচিতে ঢুকলে আর বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ চালিয়ে নিতে না পারলে জমা টাকা ‘মার’ যেত। এ নিয়ম বদল করার দাবি ছিল গ্রাহকদের দিক থেকে। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে নিয়ম বদলের প্রস্তাব রয়েছে। বলা হয়েছে, পাঁচ বছর অর্থ জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে পেনশনগ্রহীতাকে বিশেষ বিবেচনায় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হবে।
মনোনীত ব্যক্তির জন্য আজীবন পেনশন
কোনো পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রী আজীবন পেনশন সুবিধা পাবেন, এমন প্রস্তাব করা রয়েছে।
বর্তমানে নিয়ম রয়েছে চাঁদাদাতা পেনশন পাবেন আজীবন, অর্থাৎ মৃত্যুর আগপর্যন্ত। তিনি মারা গেলে পরিবারের কেউ আর পেনশন পাবেন না। ৭৫ বছর বয়সের আগে চাঁদাদাতা মারা গেলে তাঁর নমিনি পেনশন পাবেন ৭৫ বছর হওয়া পর্যন্ত যে সময়টুকু বাকি থাকবে, শুধু সে সময়ের জন্য।
পেনশন পাওয়া যাবে ৫৫ বছর বয়স থেকেই
পেনশন শুরু হওয়ার বয়স ৫৫ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান নিয়মে ৬০ বছর বয়স হলেই পেনশন পাওয়া যাবে, তার আগে নয়।
গত বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের দ্বিতীয় পর্ষদ বৈঠকে পেনশন স্কিমে থাকা চাঁদাদাতাদের ৬০ বছর বয়স হলেই জমা করা অর্থের ৩০ শতাংশ টাকা এককালীন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে এককালীন টাকা তোলার কোনো সুযোগ ছিল না।
ইসলামি পেনশন–ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ইসলামিক ভার্সন চালুর বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে আগামীকাল। অনেকেই সুদভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে চান না। তাঁদের কথা চিন্তা করেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বিমা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা হচ্ছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ টাকার মতো মাসিক প্রিমিয়াম নিয়ে বিমা সুবিধা দেওয়া।
আর্থিক সেবাদাতাদের কমিশন বৃদ্ধি
পেনশন স্কিমে নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ কমিশন নির্ধারিত ১৫ টাকা, তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হচ্ছে। এ কমিশন পাবে ব্যাংক, ডাক বিভাগ, মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ (এমএফএস) অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে গ্রাহক নিবন্ধন করা হয়।
মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় তহবিল গঠন
দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ও মুনাফার হার পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় রিজার্ভ বা কনটিনজেন্সি তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে আলোচ্যসূচিতে। পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, পেনশন তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এ ধরনের তহবিল গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রস্তাবগুলো পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ যেসব প্রস্তাব অনুমোদন করবে, সে অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে কার্যক্রম চালু করে দেব।’
কীভাবে নিবন্ধন করবেন
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে ইউপেনশন ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় প্রথমেই একটি প্রত্যয়ন পাতা আসবে, যেখানে লেখা থাকবে, ‘এই মর্মে প্রত্যয়ন করছি যে আমি সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নই। সর্বজনীন পেনশন স্কিম–বহির্ভূত কোনো ধরনের সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা গ্রহণ করি না। আমি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কোনো ধরনের ভাতা গ্রহণ করি না।’
এ পাতার নিচে ‘আমি সম্মত আছি’ অংশে ক্লিক করলে দ্বিতীয় পাতায় গিয়ে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। এখানে আবেদনকারীকে প্রবাস, সমতা, সুরক্ষা বা প্রগতি—এই চার স্কিমের মধ্যে একটিকে বাছাই করতে হবে। একই সঙ্গে এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ, মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল আইডি লিখে দিতে হবে। এরপর পাতার নিচের দিকে থাকা ক্যাপচা লিখে পরের পাতায় যেতে হবে। ক্যাপচা দেওয়ার পরে আবেদনকারীর মুঠোফোন নম্বর ও ই-মেইলে একটি ওটিপি বা একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন নম্বর আসবে, যা ফরমে দিয়ে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।