
দৃষ্টিনন্দন নকশা খোদাই করতে স্থানীয় কারিগরদের দিনের পর দিন লাগত। সেই সনাতনী ধারা থেকে বেরিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাচ্ছে।
মৌলভীবাজারের কাঠ ব্যবসার ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে এই জনপদ ছিল কাঠের ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। মনু নদের তীরে রাজস্ব স্টেশন বা টোলকেন্দ্রে হাতি দিয়ে টানা কিংবা স্রোতে ভাসিয়ে আনা কাঠের সেই সুদীর্ঘ ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেই এই অঞ্চলে আসবাবশিল্পের গোড়াপত্তন। শতবর্ষী সেই ঐতিহ্যের শিকড় আঁকড়ে ধরে মৌলভীবাজারের কাঠশিল্পে যে প্রতিষ্ঠানটি এখনো সততা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে, তার নাম ‘আলী ফার্নিচার’। মাত্র চারটি কাঠের চেয়ার বানানোর মধ্য দিয়ে যে ক্ষুদ্র উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ৩৬ বছরের ব্যবধানে তা এখন বৃহত্তর সিলেটের স্থানীয় আসবাবশিল্পে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
প্রায় ৩৬ বছর আগের কথা। বর্তমান ঠিকানার অদূরেই ছোট্ট একটি দোকান দিয়ে উদ্যোক্তা জীবনের সূচনা করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির মূল মালিক শাহ্ মোশাহিদ আলী। শুরুর মূলধন বলতে ছিল সততা, কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক রাখাল পালের স্মৃতিকথনে উঠে আসে সেই শুরুর দিনগুলোর কথা। তিনি প্রথম আলোকে জানান, মাত্র চারটি কাঠের চেয়ার তৈরির মধ্য দিয়ে তাঁদের যে ব্যবসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তা আজ বহুদূর বিস্তৃত। শুরুর দিকে বনের বয়স্ক গাছ বৈধভাবে কিনে প্রচলিত ডিজাইনে আসবাব তৈরি করা হতো। তখনকার দিনে মানুষের ধারণা ছিল, একবার আসবাব কিনলে তা যুগ যুগ চলে যাবে। অন্যান্য দোকানের থেকে আলাদা কিছু করার চিন্তাভাবনা থেকেই শাহ্ মোশাহিদ আলী মৌলভীবাজারে প্রথম ফার্নিচারের ‘বিক্রয়োত্তর সেবা’ বা কাগজে-কলমে ওয়ারেন্টির প্রচলন করেন।
কালের পরিক্রমায় মোশাহিদ আলীর দেখানো পথে এখন ব্যবসার হাল ধরেছেন তাঁর ছেলে শাহ্ উসমান আলী জাকি। বাবা-ছেলের নিরলস পরিশ্রমে সেই ছোট্ট দোকানটি আজ ৪০ জনের বেশি কর্মীর এক বিশাল কর্মমুখর কারখানায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ ক্রেতার নাগালের মধ্যে থাকা ৩ হাজার টাকার চেয়ার থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকার বিলাসবহুল রাজকীয় পালঙ্ক—সবই তৈরি হচ্ছে আলী ফার্নিচারের নিজস্ব কারখানায়।
আসবাবের বাজারে ক্রেতার আস্থা অর্জনে আলী ফার্নিচারের মূলমন্ত্র হলো, সততা ও মানের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করা। তারা প্রতিটি আসবাবে ১০ বছরের রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি দিচ্ছে। অর্থাৎ কাঠে ঘুণ ধরলে বা ফেটে গেলে মেরামতের বদলে সম্পূর্ণ নতুন পণ্য দেওয়া হয়।
ব্যবস্থাপক রাখাল পাল জানান, এক অভিনব কৌশলের কথা। ব্যবসার শুরুর দিকে গ্রাহকদের কাছে নিজেদের ‘আফটার সেলস সার্ভিস’-এর নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ করতে তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে দু-চারটি আসবাবে সামান্য ত্রুটি রেখেই ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করতেন। পরবর্তী সময় সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে সেই ত্রুটিপূর্ণ পণ্যগুলো পরিবর্তন করে দিয়ে বিক্রয়োত্তর সেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন।
ছেলের বিয়ের জন্য দোকানে আসা ক্রেতা মো. ইউনুস শিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘২৫ বছর ধরে খাট-পালঙ্ক বানাই এখান থেকে। এত দিনে একবারও অভিযোগ নিয়ে আসা লাগেনি। সামনেও লাগবে না আশা করি।’ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি ইউক্যালিপটাসের মতো ক্ষতিকর কাঠ সম্পূর্ণ বর্জন করে সেগুন, আকাশমণি বা শিলকড়ইয়ের মতো পরীক্ষিত ও টেকসই কাঠ ব্যবহার করছে।

মৌলভীবাজারের আসবাবশিল্পে আলী ফার্নিচার কেবল একটি সফল প্রতিষ্ঠানই নয়, উদ্ভাবকের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হয়েছে। একসময় কাঠের ওপর দৃষ্টিনন্দন নকশা খোদাই করতে স্থানীয় কারিগরদের দিনের পর দিন সময় লাগত। সেই সনাতনী ধারায় তারা প্রথম আধুনিক প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাচ্ছে।
উসমান আলী জানান, চীন থেকে আধুনিক সিএনসি মেশিন আমদানি করে তারা কারখানায় থ্রি–ডি ডিজাইনের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন। চীনে তৈরি দুটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ইতিমধ্যে পৌঁছেছে, যার সাহায্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাঠে অত্যন্ত নিখুঁত, সূক্ষ্ম ও আধুনিক নকশা করা সম্ভব। কায়িক শ্রম থেকে প্রযুক্তির এই স্থানান্তর কারখানার উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়াবে, তেমনি ডিজাইনের বৈচিত্র্য এনে স্থানীয় আসবাবশিল্পে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
আলী ফার্নিচারের এই সফল যাত্রায় বর্তমানে প্রধান বাধা কাঁচামালের আকাশচুম্বী দাম ও আইনি কড়াকড়ি। এক দশকেই কাঠের দাম ১২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বনজ কাঠের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞায় সামাজিক বনায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়ায়, মান ও সাশ্রয়ী দাম ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি, কাঠ সংগ্রহ থেকে পণ্য ডেলিভারি পর্যন্ত পথে পথে চাঁদাবাজি ও হয়রানির কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের মূল্যে।
সরেজমিনে মৌলভীবাজারের পশ্চিম বাজার ঘুরে প্রতিবেদন তৈরি ও ছবি তুলেছেন তুরানুর ইসলাম