
টিনের ঘরের একটি বিছানায় শুয়ে আছেন অভিনেতা জামিলুর রহমান। চলচ্চিত্রাঙ্গনে তিনি ‘শাখা ভাই’ নামে পরিচিত। বয়স ৮৫ বছর। শরীরে নানা অসুখ। কথাও বলেন ধীরে ধীরে। কখনো চোখ বন্ধ করে পুরোনো দিনের কথা মনে করার চেষ্টা করেন। বিছানার পাশে বই। অবসরে সেগুলো পড়েন, কবিতা আবৃত্তি করেন।
একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই বদলে যেতেন জামিলুর রহমান। কখনো বিচারক, কখনো দরবেশ, কখনো শ্রমজীবী মানুষ, আবার কখনো পরিবারের আপনজন। ছয় শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। চরিত্র ছোট হলেও অভিনয়ে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন। এখন ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতীর পারে আলগীরচর গ্রামের পৈতৃক ভিটায় টিনের একটি ঘরে তাঁর দিন কাটে। স্ত্রী সঙ্গে থাকেন। একমাত্র ছেলেও মারা গেছেন। পুরোনো অনেক কথাই এখন মনে করতে তাঁর কষ্ট হয়। একসময় যে অভিনয় ছিল তাঁর জীবনের ব্যস্ততা, এখন সেই জীবনই যেন থমকে গেছে।
সোমবার দুপুরে অভিনেতা জামিলুরের বাসায় গিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। জীবন কেমন চলছে—এমন প্রশ্নে তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘শুটিংয়ের ডাক, ক্যামেরার আলো, পরিচালকের নির্দেশ আর সহশিল্পীদের সঙ্গে কর্মব্যস্ত দিন—এসব নিয়েই কেটেছে আমার জীবনের বড় একটি সময়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সবকিছু। এখন জীবনই নাই, চলার কী আছে।’
জামিলুর রহমানের অভিনয়জীবনের শুরু ১৯৬৮ সালে। তরুণ বয়সে বিনোদনজগতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। নায়ক বা কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় না করেও নানা ধরনের চরিত্রে নিজের জায়গা করে নেন।
নবাবগঞ্জের প্রবীণ সাংস্কৃতিক কর্মী শফিকুর রহমান বলেন, ‘শাখা ভাই তাঁর অভিনয়ের দক্ষতায় দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। তিনি এখন অসুস্থ, কিন্তু দেখার কেউ নেই।’
জামিলুরের স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করে চলচ্চিত্রের সেই দিনগুলো। আনোয়ার হোসেন, আহমেদ শরীফ, আনোয়ারা বেগম, শাবানা ও ববিতার সঙ্গে কাজ করার কথা গর্বের সঙ্গে বলেন তিনি। পুরোনো দিনের কোনো কোনো ঘটনা মনে পড়ে, আবার কিছু কথা বলতে গিয়ে থেমে যান। ‘খায়রুন সুন্দরী’ চলচ্চিত্রের কথা বিশেষভাবে মনে আছে তাঁর। ওই ছবিতে খায়রুনের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মৃতি হিসেবে ছবিটির কথা বলেন তিনি।
শুধু চলচ্চিত্রে নয়, মঞ্চনাটকেও অভিনয় করেছেন জামিলুর রহমান। মঞ্চনাটকের অভিনয়শিল্পী কৃষ্ণেন্দু সাহা একসময় তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন। স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘শুধু সিনেমা নয়, মঞ্চনাটকে শাখা ভাইয়ের অভিনয় ছিল স্মরণীয়। এখন চিকিৎসার অর্থ নেই, নিরাপদ বাসস্থানও নেই, অর্থকষ্টে তাঁর দিন কাটছে।’

একসময় যাত্রাশিল্পে কাজ করেছেন এরশাদ আল মামুন। তিনি বলেন, চলচ্চিত্রের দর্শকেরা হয়তো আজও তাঁর (জামিলুর) মুখ দেখলে চিনতে পারবেন। কোনো পুরোনো সিনেমার দৃশ্যে হঠাৎ তাঁকে দেখে বলতে পারবেন—এই তো শাখা ভাই! কিন্তু যে মানুষটি বছরের পর বছর অভিনয় দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের অসংখ্য গল্পের অংশ হয়ে আছেন, তাঁর বর্তমান জীবনের গল্পটি অনেকটাই আড়ালে গড়াচ্ছে।
চলচ্চিত্রের সেটে একসময় দিনের পর দিন ব্যস্ত থাকতেন জামিলুর রহমান। এখন বয়স ও অসুস্থতার কারণে সেই ব্যস্ততা নেই। কাজের ডাকও আসে না। একসময় পর্দায় অন্য মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। এখন নিজের জীবনেই তিনি অসুস্থতা, একাকিত্ব ও অর্থকষ্টের বাস্তবতার মুখোমুখি। সেই জীবনে নেই ক্যামেরার আলো, নেই পরিচালকের ‘অ্যাকশন’ বলার শব্দ। আছে অসুস্থ শরীর, পুরোনো স্মৃতি আর একসময়ের ব্যস্ত জীবনকে ফিরে দেখার দীর্ঘশ্বাস।