
সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধ, অথচ রাতের আকাশে চাঁদের পর সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখায় শুক্রকে! গ্রহটির এই চোখধাঁধানো আলোর রহস্য কী? চলুন, বিজ্ঞানের আলোয় জেনে নিই শুক্র গ্রহের এই বিস্ময়কর উজ্জ্বলতার পেছনের কারণ।
মেঘমুক্ত ভোরে কিংবা গোধূলির আলোয় আকাশে তাকালে সহজেই শুক্র গ্রহ চোখে পড়ে। রাতের আকাশে চাঁদের পর এটিই সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। গবেষকদের মতে, রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটির চেয়েও শুক্র গ্রহ প্রায় ১০০ গুণ বেশি উজ্জ্বল। জ্যোতির্বিজ্ঞানের উজ্জ্বলতা মাপার স্কেলে এর মান মাইনাস ৪.১৪। এই স্কেলে মান যত কম বা ঋণাত্মক হয়, বস্তুটি তত বেশি উজ্জ্বল দেখায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সূর্যের সবচেয়ে কাছে অবস্থান বুধ গ্রহের, সে হিসাবে তো তারই সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হওয়ার কথা। কিন্তু শুক্র গ্রহ কীভাবে এত বেশি উজ্জ্বল হলো? জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী থেকে শুক্র গ্রহকে ঠিক কতটা উজ্জ্বল দেখাবে, তা প্রধানত তিনটি বিশেষ বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
গবেষকদের মতে, রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটির চেয়েও শুক্র গ্রহ প্রায় ১০০ গুণ বেশি উজ্জ্বল। জ্যোতির্বিজ্ঞানের উজ্জ্বলতা মাপার স্কেলে এর মান মাইনাস ৪.১৪।
শুক্র গ্রহকে এত উজ্জ্বল দেখানোর প্রধান কারণ হলো এর উচ্চ অ্যালবেডো বা সূর্য থেকে আসা আলো প্রতিফলিত করার ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টারের বিজ্ঞানী সঞ্জয় লিমায়ে জানান, শুক্রের অ্যালবেডোর মান ০.৭৬। মানে, গ্রহটি এর ওপর পড়া সূর্যালোকের প্রায় ৭৬ শতাংশই মহাকাশে প্রতিফলিত করে ফেরত পাঠায়।
তুলনা করলে বিষয়টি আরও সহজ হবে। একটি নিখুঁত আয়না ১০০ শতাংশ আলোই ফেরত পাঠাতে পারে। সেখানে পৃথিবী পাঠায় মাত্র ৩০ শতাংশ। আর চাঁদের আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা আরও কম। এর অ্যালবেডো ০.০৭, অর্থাৎ চাঁদ মাত্র ৭ শতাংশ আলো ফেরত পাঠায়। বুঝতেই পারছেন, শুক্র গ্রহ কী বিপুল পরিমাণ আলো প্রতিফলন করে!

শুক্র গ্রহের এই চমৎকার আলো প্রতিফলনে বড় ভূমিকা রাখে একে ঘিরে থাকা ঘন মেঘের স্তর। ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে শুক্রে পাঠানো বিভিন্ন মহাকাশযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০১৮ সালে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে জানা যায়, গ্রহের ওপরিভাগ থেকে ৪৮ থেকে ৭০ কিলোমিটার উঁচুতে এই মেঘ ছড়িয়ে রয়েছে। এই মেঘের স্তর মূলত ভাসমান সালফিউরিক অ্যাসিডের অতিসূক্ষ্ম কণা দিয়ে তৈরি, যা ঘন কুয়াশার মতো ছড়িয়ে থাকে। এই অ্যাসিডের কণাগুলো এতই ছোট যে এর বেশির ভাগের আকার একটি ব্যাকটেরিয়ার সমান। এই ক্ষুদ্র ফোঁটা আর কুয়াশার আস্তরণ মিলে সূর্যালোককে চারদিকে চমৎকারভাবে প্রতিফলিত করে দেয়।
একটি নিখুঁত আয়না ১০০ শতাংশ আলোই ফেরত পাঠাতে পারে। সেখানে পৃথিবী পাঠায় মাত্র ৩০ শতাংশ। আর চাঁদের আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা আরও কম।
তবে সৌরজগতে আলো প্রতিফলনের দিক থেকে কিন্তু শুক্র প্রথম নয়। ২০১০ সালের এক গবেষণায় জানা যায়, শনির বরফে ঢাকা উপগ্রহ এনসেলাডাসের অ্যালবেডো শুক্রের চেয়েও বেশি, যা প্রায় ০.৮০। অর্থাৎ এটি তার ওপর পড়া আলোর প্রায় ৮০ শতাংশই প্রতিফলিত করে দেয়। তবু পৃথিবী থেকে দেখলে এনসেলাডাসের চেয়ে শুক্র গ্রহকেই বেশি উজ্জ্বল ও ঝলমলে দেখায়। এর মূল কারণ সূর্য থেকে দূরত্ব।
ভোরের আকাশে যে শুক্র গ্রহ দেখা যায়, তা সূর্য থেকে মাত্র ১০ কোটি ৮০ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অন্যদিকে শনি গ্রহ শুক্র থেকে অন্তত ১৩ গুণ বেশি দূরে রয়েছে। সূর্যের কাছাকাছি থাকার কারণে শনির এনসেলাডাসের তুলনায় শুক্র গ্রহ প্রায় ১৭৬ গুণ বেশি তীব্র সূর্যালোক পায়। দূরত্বের এই সুবিধাই তাকে রাতের আকাশের সেরা উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কে পরিণত করেছে।
শনি গ্রহ শুক্র থেকে অন্তত ১৩ গুণ বেশি দূরে রয়েছে। সূর্যের কাছাকাছি থাকার কারণে শনির এনসেলাডাসের তুলনায় শুক্র গ্রহ প্রায় ১৭৬ গুণ বেশি তীব্র সূর্যালোক পায়।
শুক্র গ্রহকে সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখায় তখনই, যখন সূর্য থেকে আসা আলোয় আলোকিত অংশের মাত্র একটি সরু কাস্তের মতো অংশ আমাদের চোখে পড়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতার বিন্দু ধরেন। শুক্র গ্রহ যখন পৃথিবী ও সূর্যের ঠিক মাঝখানে আসে, তার ঠিক এক মাস আগে ও এক মাস পরে এই অসাধারণ ঘটনাটি ঘটে।
২০০৬ সালে গবেষক অ্যান্থনি মালামা ও তাঁর সহযোগীদের গবেষণায় দেখা যায়, ‘এই বিশেষ মুহূর্তে শুক্রের বায়ুমণ্ডলে ভাসমান সালফিউরিক অ্যাসিডের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণাগুলো সূর্যের আলোকে সোজা পৃথিবীর দিকে প্রতিফলিত করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ আলোকীয় ঘটনাটিকে বলা হয় গ্লোরি। আকাশে আমরা যে রংধনু দেখতে পাই, সেটিও ঠিক একই ধরনের আলোকীয় ঘটনা।