
বাউল শাহ আবদুল করিমকে অনেকে শুধু মরমি গীতিকার হিসেবে চেনেন। কিন্তু তাঁর গানে ও জীবনে মিশে আছে গভীর রাজনীতি—হাওরের দুঃখী মানুষের কথা, রাষ্ট্রের শোষণ আর সমাজ ভাঙনের আখ্যান। ‘দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি’ আঁকতে গিয়ে করিম কীভাবে হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর, এ নিয়ে লিখেছেন সহুল আহমদ
কেউ বলে শাহ আবদুল করিম কেউ বলে পাগল
যার যা ইচ্ছা তা–ই বলে, বুঝি না আসল-নকল।
—কালনীর ঢেউ
বাউল শাহ আবদুল করিমের জীবন ও গানে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকা রাজনীতির খবর তাঁর ভক্ত-মুরিদ ও বিশ্লেষকদের কল্যাণে রাষ্ট্র হয়ে করিম-চর্চায় প্রবলভাবেই প্রতিষ্ঠিত। যতীন সরকার দরদের সঙ্গে তাঁর গান ও গীতে সন্ধান করেছিলেন ‘সর্বহারার দুঃখজয়ের মন্ত্র’, বলেছিলেন, মার্ক্স-এঙ্গেলস পড়ে করিম ‘দুঃখনিরোধের পথের সন্ধান করেননি’, বরঞ্চ ‘দুঃখের ভেতরে থেকেই তিনি অবলোকন করেছেন দুঃখের সব কারণ বা হেতুসমূহকে।’ আবার তাঁর জীবনী নিয়ে আলাপগুলোয় বাংলাদেশের মূলধারার ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে করিমের সম্পর্কের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। কাগমারী সম্মেলনে তাঁর যোগদানের বৃত্তান্ত বারবার উঠে এসেছে গানে, আত্মস্মৃতি ও আলাপচারিতায়। ফলে রাজনীতির সঙ্গে তাঁর জীবনের সম্পৃক্ততা এবং গানের মধ্যে গণমানুষের দুঃখ–দুর্দশা তুলে ধরার রাজনীতি—দুটো আলাপই প্রতিষ্ঠিত। এ লেখাটাকেও একই কিসিমের বলে ধরে নেওয়া যায়, তবে লেখার শেষের দিকে দাবি করা হবে, আবদুল করিমের একটা বিষয় করিম-চর্চায় যথেষ্ট মনোযোগ পায়নি।
একটি ইশতেহার
বাউল করিমের ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’কে তাঁর পুরো বাউল–জীবনের ইশতেহার হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। তাঁর জনপ্রিয় এই গানের ছত্রে ছত্রে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন গান গাওয়ার উদ্দেশ্য ও টান। গানের প্রথম অংশেই গানের প্রতি তাঁর সীমাহীন টান ও তীব্র ভালোবাসা প্রকাশিত হয়: ‘অন্তরে আসিয়া যখন দিলে তুমি ইশারা/ তোমার সঙ্গ নিলাম আমি সঙ্গে নিয়া একতারা/ মন মানে না তোমায় ছাড়া/ তোমাতে সঁপেছি প্রাণ।’ গানে গানে সুরে সুরে মনের কথা প্রকাশ করাই তাঁর কাছে রাত-দিনের সাধনার বিষয়: ‘কী করে পাব তোমারে তাই ভাবি দিনরজনী/ মনের কথা প্রকাশ করি কথায় দিয়ে রাগিণী।’
কিন্তু এই ‘এশকে দিলদরিয়ার পানি’ কোন দিকে বয়ে যায়? গানে সুরে তিনি তাঁর মনের কোন কথাটা প্রকাশ করতে চান? এই গানের শেষাংশেই তিনি এই সওয়ালের মোক্ষম জবাব দিয়েছেন। নিজেকে মরমি কবিদের থেকে পৃথক করে বলেন, মরমিরা তত্ত্বগান গেয়ে থাকেন। বাউল করিমেরও অসংখ্য গান যে মরমি তত্ত্বগানের চৌহদ্দিতেই থাকবে এর স্বীকৃতি খোদ প্রখ্যাত সুধীর চক্রবর্তীর জবানেই পাওয়া যায়: ‘অখণ্ড বাংলার লোকায়ত সাধনার একজন মরমি গীতিকার রূপে শাহ আবদুল করিমের একটি স্থায়ী আসন…আমাদের পাততেই হবে।’ আরেকজন সংগীত বিশ্লেষক আবদুল করিমকে যেভাবে ‘সীমার মাঝে অসীমের সন্ধান, দেহ থেকে দেহাতীতে, রূপ থেকে অরূপে যাওয়ার সাধনায় নিমগ্ন’ বলে চিহ্নিত করেছেন, তাতেও এই মরমি পরিচয়টাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শাহ আবদুল করিমের প্রচুর গানে একটা অতীতের চেহারা পাওয়া যায়, সেখানে ‘সেই সময়/জমানা’ বনাম ‘এই সময়/জমানা’–এর মধ্যকার তুলনামূলক আলাপ বিধৃত থাকে। আমাদের প্রজন্মের কাছে সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। গানটা এই ঘরানার একেবারে ধ্রুপদি নজির হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে।
কিন্তু আবদুল করিম কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেন, মরমি কবিরা যেখানে তত্ত্বগান গেয়ে থাকেন, সেখানে তাঁর কাজ দেশের দুঃখ–দুর্দশার ছবি এবং বিপন্ন মানুষের দাবি তুলে ধরা। তাঁর গান, আত্মস্মৃতি ও প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে হাওর অঞ্চলের মানুষের দুঃখ–দুর্দশার কথা বারবার নানাভাবে উঠে আসে। হাওরাঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য, প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিত্য সংগ্রাম, দুর্দশাগ্রস্ত জীবনযাপন তুলে ধরে এসব থেকে তাঁর জনপদকে মুক্ত করাই যেন তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন-সাধনা।
১৯৯৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা আমার গাঁয়ে এসেছেন, দেখে যান এখানে, এই বিশাল ভাটি অঞ্চলজুড়ে মানুষগুলো কী অপরিসীম দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে বাস করে। যখন মাঝে মাঝে শহরে যাই, স্তম্ভিত হয়ে এই ব্যবধান লক্ষ করি। লোকে কয়, আমি নিরন্ন দুস্থ মানুষের কবি, আমি আসলে তাক ধরে দুস্থদের জন্য কিছু লিখিনি। আমি শুধু নিজের কথা বলে যাই, ভাটি অঞ্চলের একজন বঞ্চিত নিঃস্ব দুঃখী মানুষ আমি, আমার কথা সব হাভাতে মানুষের কথা হয়ে যায়। … দ্যাখেন তো এই অঞ্চল ঘুরে মানুষের আয়ের কোনো উৎস আছে কি না।’
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা উল্লেখ করেছিলেন, এই কথাগুলো বলার সময় ‘করিম শাহ ক্রমে উত্তেজিত এবং চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে উঠছে’.../ ‘করিম শাহর চোখে অশ্রুধারা’ পড়ছিল। তাঁর মতে, ‘মানুষই যদি না থাকে তাহলে দেহসাধনা করবে কে?’ তাই তিনি ‘সুযোগ পেলেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে’ ধরেন। যে ‘বাউলা’ গানে তাঁর মন মজেছে, সেখানে আসলে তিনি এই ছবি তুলে ধরে শান্তিবিধান চান: ‘আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি/ বিপন্ন মানুষের দাবি—/ করিম চায় শান্তিবিধান…’।
করিমের এই গান প্রচণ্ড রাজনৈতিক, যেমন করে তাঁর এই ‘সিদ্ধান্ত’ও রাজনৈতিক।
‘সময়’–এর চেহারা
শাহ আবদুল করিমের প্রচুর গানে একটা অতীতের চেহারা পাওয়া যায়, সেখানে ‘সেই সময়/জমানা’ বনাম ‘এই সময়/জমানা’–এর মধ্যকার তুলনামূলক আলাপ বিধৃত থাকে। আমাদের প্রজন্মের কাছে সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। গানটা এই ঘরানার একেবারে ধ্রুপদি নজির হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। পুরো গানটাই আদতে অতীতের স্মৃতিচারণা; ফেলে আসা দিনগুলোতে কী করতেন, কেমন উদ্যাপনযোগ্য ছিল সমাজ, তারই চিত্র এঁকেছেন। স্মৃতিচারণার পর একেবারে শেষে বলেছেন, ‘করি ভাবনা সেদিন আর পাব না/ ছিল বাসনা সুখী হইতাম/ দিন হতে দিন আসে যে কঠিন/ করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম’।
“মন” বলতে আমরা যে জিনিসটাকে বোঝাই, সেটার চিহ্নমাত্রও থাকল না আর। তা ছাড়া সবচেয়ে আক্ষেপ লাগে যখন দেখি যে এই বিজ্ঞান বা যন্ত্রসভ্যতার ফল ভোগ করছে কয়েকজন হাতে গোনা কোটিপতি। এই যন্ত্রসভ্যতা ফলত ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে আকাশ-পাতাল পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
আরেক গানে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘অতীত বর্তমানে কি আর মিল আছে?/ নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নাই ঘুরছে সব স্বার্থের পাছে’। তাঁর এই ঘরানার সব গানেই ‘যায় দিন ভালো’র সুর আছে। এই সুরের মধ্যে বর্তমান নিয়ে হতাশা লেপটে থাকে; হতাশাগ্রস্ত বর্তমান নিয়ে আক্ষেপেরও বহিঃপ্রকাশ এই মনোভাব।
বিভিন্ন গানে ‘সেদিন/সেই সময়/সেই জমানা’র বা অতীতের যে চেহারা বাউল শাহ আবদুল করিম দেখান, সেখানে একটা জীবন্ত ‘সমাজ’–এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়, বা বলা যায় তিনি এর সন্ধান আমাদের সামনে হাজির করতে চান, কিন্তু সেই সমাজ এখন গরহাজির। সেই সমাজের নানা সাংস্কৃতিক ইশারাও গানে লেপটে থাকে। তাহলে বর্তমানে কী আছে? এই সময় বা বর্তমানে আদতে সেই ‘সমাজ’ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন আত্মস্মৃতিমূলক গানে তিনি এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এই সমাজে ‘মামলা-মোকদ্দমা’, ‘নির্বাচন’ ইত্যাদিসহ আধুনিক রাষ্ট্রের শুঁড় ও সরঞ্জাম প্রবেশ করেছে। এগুলো তাঁর ফেলে আসা সমাজজীবন ধ্বংস করেছে, মানুষে মানুষে হিংসা-দ্বেষ বৃদ্ধি করেছে।
ইতিহাসবিদ ই পি টমসন বলেছিলেন, সম্ভবত পরিসংখ্যানের গড় আর মানুষের অভিজ্ঞতা প্রায়ই উল্টো পথে হাঁটে। ‘সেই সময়ে’ কি সংকট ছিল না? অভাব-অনটন ছিল না? ‘সেই সময়’ থেকে কি ‘এই সময়ে’ মানুষের আয়–রোজগার বৃদ্ধি পায়নি? করিমের এলাকায় কি আগের চেয়ে রাস্তাঘাট ভালো হয়নি? নগরায়ণ ও শহরায়ণের ছোঁয়া লাগেনি? তবু করিম আমাদের আরেক অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির কথা শোনান। টমসনকে স্মরণ করে বলা যায়, মানুষের মাথাপিছু সম্পদের পরিমাণ যেভাবে বাড়ে, একইভাবে তো তাদের জীবনযাপনে অস্থিরতা, অশান্তি, হতাশাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই সামাজিক জীবন ভেঙে যাওয়ার উপক্রমে জনজীবনে যে অস্থিরতা ও হতাশা ‘অতীত’ সম্পর্কে স্মৃতি রোমন্থনের জন্ম দেয়, তারই প্রতিচ্ছবির দেখা মেলে করিমের গানে।
শাহ আবদুল করিমের এই ‘অতীতমুখিনতা’ নিয়ে তাঁকে সওয়াল করা হয়েছিল। তিনি কি তবে বর্তমান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, বা নিচ্ছেন? করিমের জবাবে আমরা এই উন্নয়নের বিপরীতে হাঁটা মানুষের অভিজ্ঞতা পাই: ‘বর্তমান আমার কাছে গৌণ কোনো বিষয় নয়। আমার চোখের সামনে এই পরিবেশ-পরিপার্শ্ব আমূল বদলে গেছে। নগরায়ণ ও যন্ত্রসভ্যতার বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে পরিবর্তন করেছে। আমি একে খারাপ চোখে দেখি না। কিন্তু আমার কান্না পায়, ভেতরে তীব্র হাহাকার অনুভব করি, যখন দেখি যে চোখের সামনে অবিকল যন্ত্র হয়ে উঠল মানুষগুলো। “মন” বলতে আমরা যে জিনিসটাকে বোঝাই, সেটার চিহ্নমাত্রও থাকল না আর। তা ছাড়া সবচেয়ে আক্ষেপ লাগে যখন দেখি যে এই বিজ্ঞান বা যন্ত্রসভ্যতার ফল ভোগ করছে কয়েকজন হাতে গোনা কোটিপতি। এই যন্ত্রসভ্যতা ফলত ধনী-গরিবের মধ্যকার বৈষম্যকে আকাশ-পাতাল পর্যায়ে উন্নীত করেছে।’
তাঁর মতে, এখানে নির্বাচনব্যবস্থাটাই এমন হয়ে গেছে যে এর উসিলায় এক গ্রামের মানুষ পাঁচ দলে বিভক্ত হয়ে দলাদলি, মারামারি, মামলা-মোকদ্দমা করে। প্রতি নির্বাচনের মৌসুম ‘স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল’ তৈরি করে এবং নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে তা স্তিমিত হয়, কিন্তু তিন-চার বছর পর আবার শুরু হয়।
শাহ আবদুল করিম অতীতে মানুষের ‘মন’–এর অনুসন্ধান করেন, যা তাঁর মতে, নগরায়ণের ফলে ‘যন্ত্রে’ রূপান্তরিত হয়েছে। অতীতের সামাজিক উদ্যাপনের সঙ্গে ‘যন্ত্র’-এর প্রবল বৈপরীত্য। ধনী–গরিবের বৈষম্যের কারণেই নগরায়ণ ও বিজ্ঞানের সুফল গুটিকয় লোক ছাড়া আর কেউ পাচ্ছে না।
সবাই প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সবাই সবাইকে শত্রু ভাবছে। প্রতিযোগী ‘মন’-এর কি আর ‘যন্ত্র’ না হয়ে উপায় থাকে? কিন্তু বাউল তো এটা চান না। তিনি অতীত রোমন্থন করতে পারেন, কিন্তু হতাশ নন। তিনি বারবার গানে–গীতে বিপ্লবের কথা বলেন, পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন।
রাষ্ট্রের অন্দর
মোটাদাগে রাজনৈতিকতার দুটি পরিসর থাকে। একটি হচ্ছে যেখানে নাগরিক তার দাবিদাওয়া নানা অপ্রাতিষ্ঠানিক কায়দায় তুলে ধরে; আরেকটি হচ্ছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক আদব–লেহাজে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের ক্ষমতাসম্পর্কের বিবিধ সুরত নিয়ে বাতচিত করে। আবদুল করিমের রাজনীতি নিয়ে এতক্ষণ যা আলাপ হয়েছে, তা আসলে প্রথমাংশের বিষয়। এবং সাধারণত তাঁর গানে যে রাজনীতির অনুসন্ধান করা হয়েছে, সেটা আসলে এই জায়গা থেকেই: তিনি কীভাবে সাধারণ মানুষের দুঃখ–দুর্দশার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর গানে এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পরিসর বিষয়ে যে আলাপ পাওয়া যায়, তা নিয়ে খুব একটা আলোচনা এখনো হয়নি।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত শাহ আবদুল করিমের ভাটির চিঠি এই দিক থেকে এক অনন্য সৃষ্টি। এখানে তিনি ভাটি অঞ্চলের জীবনযাপন তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতায় এই আধুনিক ‘রাষ্ট্র’ ও এর কলকবজার জটিলতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। হাওর অঞ্চলের জীবনযাপন থেকে গল্প শুরু করে ধারাবাহিকভাবে সেটা নিয়ে গেছেন রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিতকরণের দিকে এবং তাতে যে ইশারা দিয়েছেন, সেটা এখনো আমাদের রাজনৈতিক মহল মানতে নারাজ।
যেমন, ধরা যাক নির্বাচনের কথা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘নির্বাচন’ তো একেবারে প্রধান ফটক বা ন্যূনতম। কিন্তু আমাদের এখানে নির্বাচনব্যবস্থা যে রূপ ধারণ করেছে, সেটার মধ্যেই যে সহিংসতার আঁচ লেপটে আছে, তা আবদুল করিমের নজর এড়ায়নি। তাঁর মতে, এখানে নির্বাচনব্যবস্থাটাই এমন হয়ে গেছে যে এর উসিলায় এক গ্রামের মানুষ পাঁচ দলে বিভক্ত হয়ে দলাদলি, মারামারি, মামলা-মোকদ্দমা করে। প্রতি নির্বাচনের মৌসুম ‘স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল’ তৈরি করে এবং নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে তা স্তিমিত হয়, কিন্তু তিন-চার বছর পর আবার শুরু হয়। এই ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ানোর ও ভালোবাসা-সম্প্রীতি কমানোর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি যে পথ হারাবে, সহিংসতার জন্ম দেবে, তার পূর্বাভাস যেন তিনি দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই পেয়েছিলেন।
চমস্কি যা বলার চেষ্টা করেছিলেন, আবদুল করিমের জবানিতেও আমরা তা শুনি: ‘নিরপেক্ষ থাকে যারা সাধারণ মানুষ/ চারদিকের তাড়নায় হয়ে যায় বেহুঁশ।’ এই বেহুঁশ ও বেহাল নাগরিকদের জন্য আবদুল করিমের গান ও গীতিকবিতা কিছুটা হলেও পথ দেখাতে পারে।
কিন্তু আবদুল করিম এখানেই তাঁর আলাপ শেষ করেননি। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন শাসনতান্ত্রিক কাঠামো নিয়েই। যেখানে নির্বাচন এলে ‘ভালো মানুষ’ বা ‘সৎ লোকের’ শাসন নিয়ে আলাপের জোয়ার বয়ে যায়, সেখানে আবদুল করিমের রায় হচ্ছে, এই শাসনকাঠামোতে ভালো লোক (বা পড়তে পারেন, সৎ লোক) গেলেও আখেরে কোনো লাভ হবে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিশারদেরা যা তত্ত্বকথায় বিগত দশক যাবৎ বলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, করিম সেটা বলছেন তাঁর মতো করে:
শোষকের শাসনতন্ত্র বহাল থাকিলে।
কী হবে পার্লামেন্টে ভালো লোক দিলে।।
শোষকের তৈরি শাসনকাঠামো যে তার।
কৃষক-মজুর শোষণের হাতিয়ার।।
কাল যা ছিল আজো আছে ভেবে দেখ তাই।
এই তন্ত্রে শোষিতের পক্ষে কিছুই লেখা নাই।
এরপর তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না শাসনকাঠামো গণমুখী করা যাবে, ততক্ষণ আমাদের ভাগ্য পাল্টাবে না। তিনি যখন বলেন, ‘চারদিকে টাকার জয়, গরিবের মরণ/ চলেছে আমলাতান্ত্রিক নির্মম শোষণ’, তখন কোর্ট-কাছারি, আদালত, আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে গণমুখী করার বাসনাই পরিষ্কার হয়।
এ লেখায় আদতে আবদুল করিমের তিনটি গানকে কেন্দ্র করে তাঁর রাজনৈতিক অভিমুখ ধরার চেষ্টা করেছি। এবার ইতি টানা যেতে পারে। একবার নোম চমস্কিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনি তো এত সুন্দর সুন্দর বিষয়ে কথা বলেন, সাধারণ মানুষ এগুলো শোনে না কেন?’ চমস্কি তখন অনেকটা এভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, এই নিওলিবারেল জমানা মানুষকে তো পেরেশানির মধ্যে ফেলে রেখেছে, যাকে টেবিলে খাবার জোগাড় করতেই সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়; যদি আজকে অসুস্থ হই, আগামী মাসের বাসাভাড়া কীভাবে জোগাড় করা হবে, এই ভাবনাতেই উদ্বিগ্ন থাকতে হয়, অথবা বাচ্চাটাকে অসুস্থ রেখে কাজে গেলে বাচ্চাটার কী হবে, এমন হাজারো দুশ্চিন্তায় আমজনতা যখন বেহাল হয়ে থাকে, তখন তারা ওই ভাবনার সময় কোথায় পাবে? তারা কখন ভাববে, আমি এটা হব, ওটা হতে চাই? এই পরিকল্পিত শৃঙ্খলিত বাসিন্দাদের সেই চিন্তা করার মতো সময় থাকে না। চমস্কি যা বলার চেষ্টা করেছিলেন, আবদুল করিমের জবানিতেও আমরা তা শুনি: ‘নিরপেক্ষ থাকে যারা সাধারণ মানুষ/ চারদিকের তাড়নায় হয়ে যায় বেহুঁশ।’
এই বেহুঁশ ও বেহাল নাগরিকদের জন্য আবদুল করিমের গান ও গীতিকবিতা কিছুটা হলেও পথ দেখাতে পারে।
লেখায় ব্যবহৃত গান ও সাক্ষাৎকারের হদিস: শুভেন্দু ইমাম (সংকলন ও সম্পাদনা), শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র, বইপত্র, ২০১৩
সহুল আহমদ: লেখক ও গবেষক