ফুটবল থেকে দূরে থাকলেও ফুটবল যেন কখনোই ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে ছেড়ে থাকেনি। মাঠে বল পায়ে তার অসাধারণ নৈপুণ্য যেমন কোটি মানুষকে মুগ্ধ করেছে, তেমনি মাঠের বাইরেও বলের সঙ্গে তার সখ্যের নানা ছবি উঠে এসেছে। এবার তেমনই এক বিরল মুহূর্তের ছবি প্রকাশ্যে এনেছেন তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ট্রেনার ফার্নান্দো সিনিওরিনি।
১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বরের কয়েকটি ছবি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করেছেন সিনিওরিনি। ছবিতে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত মার্কিন রণতরি ইউএসএস আইওয়ার ডেকে বিশাল কামানের দুটি নলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বল নিয়ে কসরত করছেন ম্যারাডোনা। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ক্লারিন জানিয়েছে, এত দিন ছবিগুলো প্রকাশ্যে আসেনি।
১৯৮৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত ট্রেনার হিসেবে কাজ করেন সিনিওরিনি। দীর্ঘ এই সময়ে মাঠ ও মাঠের বাইরে ম্যারাডোনার জীবনের অসংখ্য মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন তিনি। ছবিগুলো প্রকাশ করে ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘সব জায়গাতেই ম্যারাডোনার সঙ্গে বল থাকতই। ১৫ নভেম্বর, ১৯৮৯।’
সে সময় ইতালির নেপলসে নাপোলির হয়ে খেলছিলেন ম্যারাডোনা। ক্লাবটির হয়ে দুর্দান্ত সময় কাটানোর মধ্যেই ন্যাটোর নেপলস সদর দপ্তর থেকে তাকে ইউএসএস আইওয়া পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন সিনিওরিনিও।
সিনিওরিনি জানান, রণতরিতে ম্যারাডোনাকে রাষ্ট্রপ্রধানের মতো অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন তিনি। আমাদের সময়টা দারুণ কাটছিল।’
তবে সফরের একপর্যায়ে সেখানে হাজির হয় ম্যারাডোনার চিরচেনা সঙ্গী ফুটবল। কোথা থেকে যেন একটি বল এনে দেওয়া হয় তাকে। বল হাতে পেয়েই নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জাগলিং শুরু করে দেন তিনি।
সিনিওরিনির ভাষায়, ‘হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা বল চলে এল। বল পাওয়ামাত্রই একদম ছোটবেলার মতো নাচাতে (জাগলিং) শুরু করে দিলেন ম্যারাডোনা—যেটি আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সের ম্যাচে মধ্যবিরতিতে তিনি নিয়মিত করতেন।’
আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সে খেলার সময় থেকেই ম্যাচের বিরতিতে বল নিয়ে নানা কসরত দেখিয়ে দর্শকদের আনন্দ দেওয়ার অভ্যাস ছিল ম্যারাডোনার। ইউএসএস আইওয়ার ডেকেও যেন ফিরে এসেছিল সেই পুরোনো দিনের দৃশ্য।
ইউএসএস আইওয়া ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ রণতরিগুলোর একটি। ১৯৩৯ সালে নির্মাণ শুরু হওয়া আইওয়া শ্রেণির রণতরিগুলোর মধ্যে এটি ছিল প্রথম বা ‘লিড শিপ’। ১৯৮৯ সালে নেপলসে অবস্থানকালে ম্যারাডোনার সফরও রণতরিটির ইতিহাসে যোগ করে একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।
সেই সময় ম্যারাডোনা ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পাশাপাশি নাপোলির হয়ে ইতালিয়ান লিগ ও উয়েফা কাপ জেতায় নেপলসে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।
রণতরির ডেকে সেই সময় ম্যারাডোনার সঙ্গে ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলো রসি। তিনি নেপলস ও দক্ষিণ ইতালির অন্যতম শীর্ষ দৈনিক ইল মাতিনোতে কাজ করতেন এবং পরে ম্যারাডোনার ইউএসএস আইওয়া সফর নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
ম্যারাডোনা ও সিনিওরিনির সম্পর্কও ছিল দীর্ঘদিনের। একবার ম্যারাডোনাকে নিয়ে সিনিওরিনি বলেছিলেন, ‘আমি ডিয়েগোর পেছনে পৃথিবীর শেষ সীমানা পর্যন্ত যেতে রাজি আছি, কিন্তু ম্যারাডোনার সঙ্গে রাস্তার মোড় পর্যন্তও যাব না।’
সিনিওরিনির সেই মন্তব্যে ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত ‘ডিয়েগো’ এবং বিশ্বখ্যাত ‘ম্যারাডোনা’—এই দুই সত্তার পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছিল। তবে দুই সত্তার মাঝেও একটি বিষয় ছিল অটুট—ফুটবলের প্রতি তার গভীর টান।
ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণতরি পরিদর্শন—জীবনের নানা স্মরণীয় মুহূর্তে বল যেন ম্যারাডোনার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। ৩৭ বছর পর প্রকাশ্যে আসা ইউএসএস আইওয়ার ডেকের ছবিগুলো সেই সম্পর্কেরই আরেকটি বিরল স্মারক।