
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স ডাইনোসর। বিলুপ্তির মাধ্যমে এর শরীরের উষ্ণতাও হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি রাসায়নিক বিশ্লেষণের সাহায্যে বিলুপ্ত ডাইনোসরের শরীরের তাপমাত্রা বের করেছেন। জানা গেছে, তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই ফল সামান্য কমবেশি হতে পারে।
নতুন এই গবেষণার ফলে টি-রেক্স উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের তালিকায় স্থায়ী জায়গা দখল করে নিল। গত কয়েক বছর ধরে করা বিভিন্ন গবেষণায়ও টি-রেক্সসহ ডাইনোসরদের উষ্ণ রক্তের প্রাণী হওয়ার প্রমাণ মিলেছিল।
টি-রেক্সের শরীর বেশ উষ্ণ ছিল। তবে খুব বেশি না। গবেষণায় পাওয়া টি-রেক্সের তাপমাত্রা অন্যান্য বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতোই পাওয়া গেছে। যেমন ভারতীয় হাতির শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মানুষের স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উটপাখির মতো উড়তে না-পারা পাখির শরীরের তাপমাত্রা আরও বেশি, প্রায় ৩৮.৩ থেকে ৩৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর মুরগির শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৪০.৬ থেকে ৪১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মানে টি-রেক্স ছিল উষ্ণ রক্তের প্রাণী, তবে মুরগির মতো এত উষ্ণ নয়।
উটপাখির মতো উড়তে না-পারা পাখির শরীরের তাপমাত্রা আরও বেশি, প্রায় ৩৮.৩ থেকে ৩৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর মুরগির শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৪০.৬ থেকে ৪১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রায় ২০০০ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ডাইনোসররা অনেকটা সরীসৃপের মতো প্রাণী। তাই এদের শরীরের তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করত বলে মনে করা হতো। অর্থাৎ এদের শীতল রক্তের প্রাণী ভাবা হতো। কিন্তু এরপর একের পর এক গবেষণায় সেই ধারণা বদলাতে শুরু করে। ভূ-রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং জীবাশ্মের সিটি স্ক্যান থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রমাণে দেখা গেছে, ডাইনোসরদের বিপাকক্রিয়া বেশ সক্রিয় ছিল। এভাবে এদেরকে উষ্ণ রক্তের প্রাণী বলে মনে করা শুরু হয়।
আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গিয়েছিল, টি-রেক্সের বিপাকক্রিয়া বেশ দ্রুত ছিল। নতুন গবেষণায় টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা আরও নির্দিষ্টভাবে বের করা সম্ভব হয়েছে।
টি-রেক্সের আকৃতি ছিল স্কুলবাসের মতো বিশাল। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই বিশাল আকৃতির শিকারি ডাইনোসরের শরীরের তাপমাত্রা বের করতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) বিজ্ঞানীরা জীবাশ্মের দাঁত নিয়ে গবেষণা করেছেন। এর মধ্যে ছিল ‘থমাস’ নামের একটি বিখ্যাত টি-রেক্সের দুটি দাঁত। দাঁত দুটি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সংগ্রহে রয়েছে।
গবেষকেরা প্রথমে ডেন্টাল ড্রিল দিয়ে দাঁতের শক্ত বাইরের অংশ, অর্থাৎ এনামেল থেকে সামান্য নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর খনিজ পদার্থের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য কাজে লাগান। কোনো খনিজ যখন তৈরি হয়, তখন এর ভেতরের রাসায়নিক বন্ধন বা পরমাণুগুলোর পারস্পরিক সংযোগ সেই সময়ের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য ধরে রাখতে পারে।
প্রায় ২০০০ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ডাইনোসররা অনেকটা সরীসৃপের মতো প্রাণী। তাই এদের শরীরের তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করত বলে মনে করা হতো।
গবেষকেরা কার্বন ও অক্সিজেনের দুটি ভারী আইসোটোপের মধ্যে রাসায়নিক বন্ধন বিশ্লেষণ করেছেন। এই বন্ধন অনেকটা থার্মোমিটারের মতো কাজ করে। দুটি আইসোটোপের মধ্যে যত বেশি এমন বন্ধন পাওয়া যায়, সেই খনিজ যে তাপমাত্রায় তৈরি হয়েছিল, তা তত কম ছিল।
গবেষণাটির অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী ও মার্কিন ভূ-জীববিজ্ঞানী রবার্ট ইগলের ভাষায়, কোনো খনিজ তৈরি হওয়ার সময় তার রাসায়নিক গঠনের কিছু বৈশিষ্ট্য যেন সেই মুহূর্তেই ‘হিমায়িত’ হয়ে যায়। তাই সেই রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা অনেক কোটি বছর আগের তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষকেরা ফলাফল যাচাই করতে একই জায়গা থেকে পাওয়া প্রাচীন কুমিরজাতীয় প্রাণীর দাঁতের সঙ্গেও টি-রেক্সের দাঁতের তুলনা করেছেন। জীবাশ্মগুলো পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানার হেল ক্রিক গঠন নামের ভূতাত্ত্বিক এলাকায়। সেখানে টি-রেক্সের দাঁত থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এর শরীরের তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিপরীতে প্রাচীন কুমিরজাতীয় প্রাণীগুলোর গড় তাপমাত্রা ছিল মাত্র ৩১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
কোনো প্রাণী উষ্ণ রক্তের হলে সেটি স্বাভাবিকভাবে বেশি সক্রিয় জীবনযাপন করে। সক্রিয় হওয়ায় টি-রেক্স বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে টিকে থাকতে পারত। গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, শুধু তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতার দিক থেকে বিবেচনা করলে উত্তর আমেরিকার বিশাল এলাকায় টি-রেক্সের বসবাস সম্ভব ছিল। উত্তরে আলাস্কা থেকে দক্ষিণে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এর বিচরণ সম্ভব ছিল।
জীবাশ্মগুলো পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানার হেল ক্রিক গঠন নামের ভূতাত্ত্বিক এলাকায়। সেখানে টি-রেক্সের দাঁত থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এর শরীরের তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে এসব পরিবেশের সবটাই টি-রেক্সের জন্য উপযোগী হতে পারে। এই ফল ডাইনোসর কোন ধরনের পরিবেশ পছন্দ করত, সেই প্রশ্নটিকেও নতুনভাবে সামনে এনেছে।
স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরাতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার জীবাশ্মবিজ্ঞানী স্টিফেন ব্রুসাটে অবশ্য মনে করেন, টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা জানার পর এখন নতুন অনেক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই বিশাল শিকারি ডাইনোসর আসলে কীভাবে এর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত, সেটি এর মধ্যে অন্যতম।
একটি সম্ভাবনা হলো, মানুষের মতোই টি-রেক্সের শরীরের ভেতরে তাপ উৎপাদনের ব্যবস্থা ছিল। মানে শরীরের ভেতরের বিপাকক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়মিত তাপ তৈরি হতো এবং শরীরের তাপমাত্রা প্রায় একই থাকত।
তবে আরেকটি সম্ভাবনাও আছে। ব্রুসাটের মতে, টি-রেক্স হয়তো বিশাল আকৃতির, ভয়ংকর এক ‘থার্মাল কাপের’ মতো ছিল। এত বড় শরীরের কারণে এর ভেতরের তাপ সহজে বাইরে বেরিয়ে যেত না। ফলে শরীর ঠান্ডা হতে অনেক সময় লাগত।
ব্রুসাটের মতে, টি-রেক্স হয়তো বিশাল আকৃতির, ভয়ংকর এক থার্মাল কাপের মতো ছিল। এত বড় শরীরের কারণে এর ভেতরের তাপ সহজে বাইরে বেরিয়ে যেত না।
টি-রেক্সের বিশাল শরীর নিজ থেকেই হয়তো তাপ ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। সে ক্ষেত্রে মানুষের ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখির মতো উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে যে জটিল রাসায়নিক বিপাকক্রিয়া কাজ করে, টি-রেক্সের ক্ষেত্রে তেমন ব্যবস্থার প্রয়োজন নাও হয়ে থাকতে পারে।
তবে টি-রেক্সের দাঁত নিয়ে গবেষণা এখানেই শেষ হচ্ছে না। ভূ-জীববিজ্ঞানী রবার্ট ইগল জানিয়েছেন, তাঁর দল এখন আরও একটি রাসায়নিক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। এর মাধ্যমে টি-রেক্স ও অন্যান্য ডাইনোসর কী ধরনের খাবার খেত, সে সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।