‘কাকা, এখানে একটা বাচ্চা পড়ে আছে’- ভাতিজার এমন কথায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা স্কুলছাত্র ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতীমকে দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল কাদির জিলানী। তারা বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়ে জঙ্গলের ভেতর অপ্রতীমের মরদেহ দেখতে পান।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কসংলগ্ন পশ্চিম সানন্দা এলাকায় ওই স্থান থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অপ্রতীম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদির জিলানী জানান, তারা ওই এলাকায় কাজ করতে গিয়েছিলেন। কাজের প্রয়োজনে বাঁশ সংগ্রহ করতে জঙ্গলের দিকে গেলে তার সঙ্গে থাকা ভাতিজা তাকে বলে, ‘কাকা, এখানে একটা বাচ্চা পড়ে আছে।’ এরপর সেখানে গিয়ে শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তারা। ভয় পেয়ে সেখান থেকে সরে আসেন। পরে এক শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ থাকার বিষয়টি জানতে পেরে তারা ঘটনাটি জানান।
কাদির জিলানী আরও বলেন, ‘পরে স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান। আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে সেখানে শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়।’
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, অপ্রতীমের মাথা, হাত, পা, পিঠ, পেট ও কোমরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার একটি চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ঘাড়ে আঘাতের চিহ্ন থাকতে পারে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
এর আগে শনিবার ভোরে অপ্রতীমের মুঠোফোনের সর্বশেষ অবস্থানের তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সামাজিক বনায়ন এলাকায় তল্লাশি চালান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে স্থানীয়ভাবে তথ্য পেয়ে ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কসংলগ্ন পশ্চিম সানন্দা এলাকায় টিলার পাদদেশে অপ্রতীমের মরদেহ দেখতে পান তারা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, শুক্রবার রাতেও অপ্রতীমের সন্ধানে সামাজিক বনায়ন এলাকায় তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশ রাতের দিকে জানায়, সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সামাজিক বনায়ন এলাকায় তাদের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ভোরে আলো ফোটার পরও অপ্রতীমের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তারা সেখান থেকে চলে যান।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরা ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও পুলিশের তথ্যের সাথে মিলে যায়।
এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতীম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
এ ঘটনায় তদন্তের স্বার্থে তুহিন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। তার বাড়ি সানন্দা এলাকায়। তার বাবার নাম নুরুল আলম। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোটবাড়ি থানার ইন্সপেক্টর মহিবুল আলম ভূঁইয়া।
এদিকে অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটি এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই আমরা পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও পাওয়া যায়নি।’
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। আমাদের কাছে আছে একজন ব্যক্তি, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সঠিকভাবে খতিয়ে দেখব, তদন্ত করব এবং প্রকৃত হত্যাকারীকে না ধরা পর্যন্ত আমরা ননস্টপ এটা নিয়ে কাজ করব।’
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অপ্রতীমের মৃত্যুর কারণ, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং কীভাবে সে ওই স্থানে পৌঁছেছে- এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।