
নাইকো রিসোর্সেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের বিরুদ্ধে পেট্রোবাংলার করা ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবির মামলাটি (মানি স্যুট) ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে ঢাকার আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে কোম্পানিটির, অর্থাৎ বিবাদীপক্ষের সাক্ষীকে লিখিত সাক্ষ্য দাখিল করার সুযোগ দিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার যুগ্ম জেলা আদালতের (দ্বিতীয় আদালত) দুটি আদেশের বিরুদ্ধে নাইকো রিসোর্সেস ২০১৯ সালে হাইকোর্টে আবেদন (সিভিল রিভিশান) করে। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত রুলসহ আদেশ দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩০ আগস্ট ওই রায় দেন। আট পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আদেশ দেন ঢাকার যুগ্ম জেলা আদালত (দ্বিতীয় আদালত)। বিবাদীপক্ষের (নাইকো) সময় আবেদন নামঞ্জুর করে বিবাদীপক্ষে (নাইকোর পক্ষে) সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত ও মামলাটি যুক্তিতর্কের জন্য শুনানির দিন ধার্য করেন। তবে মামলাটি যুক্তিতর্ক পর্যায় থেকে প্রত্যাহার করে বিবাদীপক্ষের সাক্ষীর (যিনি আবেদনকারীও) সাক্ষ্য শেষের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে বিবাদীপক্ষ (নাইকো), যা ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খারিজ করে দেন একই আদালত।
ওই আদেশের বিরুদ্ধে নাইকো হাইকোর্টে আবেদনটি করে। তাতে বিচারিক আদালত আইন অনুযায়ী আবেদন দুটি নিষ্পত্তি করেননি বলে উল্লেখ করা হয়। শুনানি শেষে গত ৩০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল যথাযথ (অ্যাবসলিউট) ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে ঢাকার যুগ্ম জেলা আদালতের (দ্বিতীয় আদালত) ওই দুটি আদেশ বাতিল করা হয়েছে।
আদালতে নাইকোর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান শুনানি করেন, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী সুমাইয়া ইফরিত বিনতে আহমেদ ও সুমন সেন গুপ্ত। পেট্রোবাংলার পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী সঞ্চিতা সিদ্দিকী ও জাহাঙ্গীর হোসেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, যুগ্ম জেলা জজকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে যে এই আদেশ গ্রহণের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বিবাদীকে (মো. মাসুদুর রহমান) লিখিত সাক্ষ্য দাখিল করার এবং অপ্রয়োজনীয় মুলতবি ছাড়াই তাঁকে জেরা বা পরীক্ষার জন্য হাজির করার সুযোগ দিয়ে আইন অনুযায়ী মামলাটি (মানি স্যুট) বিচার দ্রুত সম্পন্ন করবেন। আদেশের অনুলিপি গ্রহণের তারিখ থেকে ছয় মাসের মধ্যে আইন অনুযায়ী বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে যুগ্ম জেলা জজকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।
এর আগে সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০০৩ সালে নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা খননকাজ শুরুর পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন গ্যাসক্ষেত্রটিতে দুটি মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাসক্ষেত্রের মজুত গ্যাস পুড়ে যায় এবং আশপাশের স্থাপনা ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ জন্য নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে পেট্রোবাংলা, তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় প্রতিষ্ঠানটি। ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ২০০৮ সালে দেশের আদালতে ওই মামলা করে পেট্রোবাংলা।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনায় নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৯৭৩ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলা বাদী হয়ে ওই মামলা করে বলে জানান আইনজীবী সঞ্চিতা সিদ্দিকী।
আইনজীবী সঞ্চিতা সিদ্দিকী আজ শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, পেট্রোবাংলার নিয়োজিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকীর হয়ে তাঁরা হাইকোর্টে শুনানিতে অংশ নেন। এর আগে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতে ওই মামলার কার্যক্রম চলছিল। বাদীপক্ষের সাক্ষী ও জেরা শেষে ২০১৮ সালে বিবাদীপক্ষের সাক্ষ্য শুরু হয়। সাক্ষ্য চলাকালে বিবাদীপক্ষ ১১ বার সময় নেয়। ১২তম বার বিবাদীপক্ষ থেকে সময় চাওয়া হলে বাদীপক্ষ থেকে তাতে আপত্তি জানানো হয়। বিচারিক আদালত যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য করেন। পরে বিবাদীপক্ষ আরেকটি আবেদন দেয়, যা খারিজ হয়। এই দুটি আদেশের বিরুদ্ধে নাইকো হাইকোর্টে আবেদনটি করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটির কার্যক্রম এত দিন স্থগিত ছিল। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে এখন মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।