
ভাজা খাবারের নাম শুনলেই অনেকের জিভে পানি চলে আসে। আলুর চপ, বেগুনি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কিংবা ভাজা মুরগি—তেলে ভাজার পর খাবারের স্বাদ আর গন্ধ যেন বদলে যায়। বাইরেটা হয় মচমচে, ভেতরটা থাকে নরম। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, খাবার ভাজার জন্য তেলই কেন ব্যবহার করা হয়? পানি দিয়ে তো খাবার রান্না করা যায়। তাহলে পানি দিয়ে ভাজা যায় না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাপমাত্রায়। পানি সাধারণত ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটতে শুরু করে। তাই স্বাভাবিক চাপে পানিকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম করা কঠিন। কিন্তু খাবার ভাজার জন্য এর চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন। সাধারণত ১৭৫ থেকে ১৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় খাবার ভাজা হয়। তেল সহজেই এই তাপমাত্রায় পৌঁছাতে পারে। এ কারণেই খাবার ভাজার জন্য পানির পরিবর্তে তেল ব্যবহার করা হয়।
তেলের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে। বিভিন্ন ধরনের তেলের স্ফুটনাঙ্ক ও ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা পানির তুলনায় অনেক বেশি। ফলে তেলকে খাবার ভাজার উপযোগী উচ্চ তাপমাত্রায় নেওয়া যায়।
পানি সাধারণত ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফুটতে শুরু করে। তাই স্বাভাবিক চাপে পানিকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরম করা কঠিন। কিন্তু খাবার ভাজার জন্য এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন।
তেলে খাবার ছাড়ার পর একই সঙ্গে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। খাবারের বাইরের অংশে অনেক সময় ময়দা বা কর্নস্টার্চের আবরণ থাকে। গরম তেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আবরণ দ্রুত শুকিয়ে মচমচে হয়ে যায়। তাপমাত্রা যখন প্রায় ১৪০ থেকে ১৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন ঘটে মেইয়ার্ড বিক্রিয়া। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে খাবারের বাইরের অংশ সোনালি-বাদামি রং ধারণ করে এবং তৈরি হয় সেই পরিচিত সুস্বাদু গন্ধ ও স্বাদ।
এদিকে খাবারের ভেতরে থাকা পানি গরম হয়ে বাষ্পে পরিণত হয়। সেই বাষ্প খাবারের ভেতরের অংশ রান্না করতে সাহায্য করে।

একই সঙ্গে বাইরের শুকনো আবরণ কিছুটা বাষ্প আটকে রাখে। ফলে খাবারের ভেতরটা ভালোভাবে রান্না হয়, আর বাইরের অংশ থাকে মচমচে।
তাই বলা যায়, তেলে খাবার ভাজা হয় কারণ তেল পানির চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রায় গরম হতে পারে। সেই উচ্চ তাপমাত্রায় মেইয়ার্ড বিক্রিয়াসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া ঘটে, যা খাবারের বাইরের অংশকে মচমচে ও সোনালি-বাদামি করে এবং তৈরি করে কাঙ্ক্ষিত স্বাদ ও গন্ধ।
খাবারের ভেতরে থাকা পানি গরম হয়ে বাষ্পে পরিণত হয়। সেই বাষ্প খাবারের ভেতরের অংশ রান্না করতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বাইরের শুকনো আবরণ কিছুটা বাষ্প আটকে রাখে।
খাবার ভাজার জন্য বিভিন্ন ধরনের তেল ব্যবহার করা যায়। যেমন চিনাবাদাম, তুলাবীজ, নারকেল, রাইস ব্র্যান (চাল থেকে পাওয়া যায়), ক্যানোলা১, সরিষা ও সয়াবিন তেল ইত্যাদি। এগুলোর স্বাদ, দাম ও রাসায়নিক গঠন এক নয়। তাই কোন তেল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর খাবারের স্বাদ ও তেল কতটা তাপ সহ্য করতে পারবে, তা কিছুটা নির্ভর করে।
তবে তেল ভাজার উপযোগী হলেই যে সেটি স্বাস্থ্যের জন্যও সবচেয়ে ভালো, এমন নয়। যেমন নারকেল তেলকে অনেক সময় ভাজার জন্য ভালো বলা হয়। কারণ এতে স্যাচুরেটেড২ বা সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি। এই ধরনের চর্বি তুলনামূলকভাবে তাপ সহনশীল। ফলে বেশি তাপে তেল সহজে ভেঙে যায় না। নারকেল তেলে ভাজার কথা শুনে অনেকের ভ্রু কুঁচকে যেতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশে এই তেল রান্নায় ব্যবহার করা না হলেও প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কাসহ অন্য আরও কিছু দেশে এর ব্যবহার রয়েছে।

যাই হোক, নারকেল তেলে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন নারকেল তেলের বদলে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ কম এমন তরল উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। কারণ সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে এলডিএল৩ বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। অর্থাৎ কোনো তেল বেশি তাপ সহ্য করতে পারে বলেই, সেটি যে হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখার জন্য সবচেয়ে ভালো—এমনটা নয়।
নারকেল তেলকে অনেক সময় ভাজার জন্য ভালো বলা হয়। কারণ এতে স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি। এই ধরনের চর্বি তুলনামূলকভাবে তাপ সহনশীল।
অন্যদিকে চিনাবাদাম, রাইস ব্র্যান, ক্যানোলা, তুলাবীজ, সরিষা ও সয়াবিনের তেলও খাবার ভাজার জন্য ব্যবহার করা যায়। এগুলোর দাম ও স্বাদে পার্থক্য রয়েছে। সরিষার তেলে খাবারে আলাদা ঝাঁঝালো স্বাদ আসে, অন্যদিকে সয়াবিন তেলের স্বাদ তুলনামূলকভাবে মৃদু। তাই খাবারের নিজস্ব স্বাদ যেন বেশি বদলে না যায়, সে জন্য মৃদু বা প্রায় স্বাদহীন তেল বেছে নেওয়া যায়।
সরিষার তেলে মূলত দুই ধরনের অসম্পৃক্ত বা আনস্যাচুরেটেড চর্বি থাকে—মনো-আনস্যাচুরেটেড৪ ও পলি-আনস্যাচুরেটেড৫ চর্বি। এর মধ্যে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ। এর অন্যতম প্রধান উপাদান ইরুসিক অ্যাসিড ও ওলিক অ্যাসিড। আর পলি-আনস্যাচুরেটেড চর্বি থাকে প্রায় ২০–২১ শতাংশ। এর মধ্যে শরীরের প্রয়োজনীয় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি ধরন আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের লিনোলিক অ্যাসিড রয়েছে। অর্থাৎ সরিষার তেলে সম্পৃক্ত চর্বির তুলনায় অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণই বেশি।

সয়াবিন তেলেও অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকে পলি-আনস্যাচুরেটেড বা পলি–অসম্পৃক্ত চর্বি, যার প্রধান উপাদান লিনোলিক অ্যাসিড। এতে মনো-আনস্যাচুরেটেড চর্বির পাশাপাশি আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিডও থাকে। আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড হলো ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের একটি ধরন। অন্যদিকে সয়াবিন তেলে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। তাই সম্পৃক্ত চর্বির বদলে সয়াবিনের মতো তরল উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করলে খাদ্যতালিকায় সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ কমানো সম্ভব।
সয়াবিন তেলে অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকে পলি-আনস্যাচুরেটেড বা পলি–অসম্পৃক্ত চর্বি, যার প্রধান উপাদান লিনোলিক অ্যাসিড।
জলপাই, চিনাবাদাম ও অ্যাভোকাডো তেলেও অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে মনো-আনস্যাচুরেটেড বা মনো–অসম্পৃক্ত চর্বিও রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে তাপ সহনশীল এবং সম্পৃক্ত চর্বির তুলনায় হৃদ্যন্ত্রের জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে।
শুধু উদ্ভিজ্জ তেলই নয়, প্রাণিজ চর্বিও খাবার ভাজার কাজে ব্যবহার করা যায়। ঘি, ট্যালো ও লার্ড—অর্থাৎ পশুর চর্বি—দীর্ঘদিন ধরেই রান্না ও ভাজার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এগুলো খাবারে আলাদা এক ধরনের স্বাদ যোগ করতে পারে। তবে এসব চর্বিতে চর্বির পরিমাণ বেশি হওয়ায় খাবার আরও বেশি চর্বিযুক্ত হতে পারে এবং স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
শুধু উদ্ভিজ্জ তেলই নয়, প্রাণিজ চর্বিও খাবার ভাজার কাজে ব্যবহার করা যায়। ঘি, ট্যালো ও লার্ড—অর্থাৎ পশুর চর্বি—দীর্ঘদিন ধরেই রান্না ও ভাজার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সব তেল উচ্চ তাপমাত্রায় সমানভাবে স্থিতিশীল থাকে না। যেসব তেলে পলি–আনস্যাচুরেটেড বা বহু-অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি, সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম তাপ-স্থিতিশীল। বেশি তাপে, বিশেষ করে তেলের ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেলে, এগুলো দ্রুত জারিত ও ভেঙে যেতে পারে। একই তেল বারবার ব্যবহার করলেও এই সমস্যা বাড়তে পারে।
সানফ্লাওয়ার, স্যাফফ্লাওয়ার, গ্রেপসিড ও কর্ন অয়েলে বহু-অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব তেল অস্বাস্থ্যকর। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সানফ্লাওয়ার, স্যাফফ্লাওয়ার ও কর্ন অয়েলকে হৃদ্যন্ত্রের জন্য উপযোগী রান্নার তেলের তালিকায় রেখেছে। সম্পৃক্ত চর্বির বদলে এসব অসম্পৃক্ত তেল ব্যবহার করলে এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে পারে।
তবে বারবার বেশি তাপে খাবার ভাজার ক্ষেত্রে এসব তেল তুলনামূলকভাবে কম উপযোগী। এ ক্ষেত্রে চিনাবাদাম, অ্যাভোকাডো বা পরিশোধিত জলপাই তেলের মতো তুলনামূলকভাবে বেশি তাপ-স্থিতিশীল তেল ব্যবহার করা যায়। যে তেলই ব্যবহার করুন না কেন, সেটিকে ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রার ওপরে অতিরিক্ত গরম না করাই ভালো। আবার একই তেল বারবার ব্যবহার করাও এড়িয়ে চলা উচিত।
বেশি তাপে, বিশেষ করে তেলের ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা ছাড়িয়ে গেলে, এগুলো দ্রুত জারিত ও ভেঙে যেতে পারে। একই তেল বারবার ব্যবহার করলেও এই সমস্যা বাড়তে পারে।
ভাজা খাবার যে সুস্বাদু, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু নিয়মিত বেশি ভাজা খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। খাবার তেলে ভাজার সময় এতে অতিরিক্ত চর্বি ও ক্যালরি যোগ হতে পারে। তাই ভাজা খাবার মাঝেমধ্যে খাওয়াই ভালো।