
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।
জীবন তাদের জন্য সহজ ছিল না। অভাব ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল। কেউ মা–বাবাকে হারিয়ে স্বজনের আশ্রয়ে বড় হয়েছে। কারও রাত কেটেছে না খেয়ে। কেউ পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজেই কাজ করেছে। তারপরও মেধা ও পরিশ্রমের জোরে তারা এগিয়ে গেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে তারা। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এখন তাদের সামনে। তবে কলেজে পড়ার খরচ চালানো নিয়ে তৈরি হয়েছে দুশ্চিন্তা।
বাবা অভিজিৎ রায় একটি ওষুধের দোকানে মাসিক বেতনে কাজ করতেন। লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে তিন বছর আগে তিনি মারা যান। তারও দুই বছর আগে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মা সন্ধ্যা রানী দাস। শিশু বয়সে মা–বাবাকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে যায় স্বপ্ন রায়। সহায় সম্পদ বলতে যা কিছু ছিল তা মা–বাবার চিকিৎসা বাবদ সবকিছুই বিক্রি করে দিতে হয়েছে।
জীবনসংগ্রামে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়লেও মেধাবী শিক্ষার্থী স্বপ্ন রায় দমে যায়নি। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছে সে। তাদের বাড়ি মধ্যনগর উপজেলার ইটাউড়ি গ্রামে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মা–বাবার মৃত্যুর পর স্বপ্ন রায়ের পাশে দাঁড়ান তার কাকা অভিমুন্য রায়। তিনিই তাকে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার সাহস জোগান। লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার প্রেরণা দেন। পিতৃস্নেহে তাকে জড়িয়ে নিয়ে নিজ সন্তানের মতো লেখাপড়ার খরচ মেটানোসহ সবকিছুর দায়িত্ব নেন।
অভিমুন্য রায় বলেন, ‘আমার ভাতিজা অত্যন্ত মেধাবী। পিতা–মাতাহারা ছেলেটি লেখাপড়া করে ডাক্তার হতে চায়। আমার পক্ষে লেখাপড়াসহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়। কেউ সহায়তার হাত না বাড়ালে তার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে।’
মেধাবী শিক্ষার্থী স্বপ্ন রায় বলে, ‘আমার কাকা আমার জন্য যা করেছেন, তা আমি জীবনেও পরিশোধ করতে পারব না। চোখের সামনে মা–বাবাকে অসুস্থ অবস্থায় মরতে দেখেছি। আরও ভালো চিকিৎসা করাতে পারলে তারা হয়তো বেঁচে যেত। অনেকেই আছে যারা টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। তাই আমি লেখাপড়া করে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে চাই।’
মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ বিজন কুমার তালুকদার বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী স্বপ্ন রায়। লেখাপড়া করার সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে সে দেশবাসীর মুখ উজ্জ্বল করবে।’
১০ বাই ১০ ফুটের একটি টিনের চালা ঘর। সেটিই সাত সদস্যের পরিবারের মাথা গুঁজে থাকার ঠিকানা। নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের বাঁশবাড়ি মহল্লার বস্তির এই ঘরেই বেড়ে উঠেছে মোছা. শাবনাজ খাতুন রানি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
শাবনাজ সৈয়দপুর শহরের আল ফারুক একাডেমির শিক্ষার্থী। তারা চার বোন ও এক ভাই। বড় বোন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। মেজ বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাই বেকার। সবার ছোট বোন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
শাবনাজের বাবা মো. ইসমাইল সৈয়দপুর শহরে রিকশা চালান। ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বের হন। ফেরেন গভীর রাতে। দুই বছর আগে এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনেছেন। রিকশার কিস্তি পরিশোধ করে যা থাকে, তা দিয়েই সাতজনের সংসার চলে।
মা মোছা. লাডলি আগে মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। এখন অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাই ইসমাইল। মোছা. লাডলি বলেন, শাবনাজকে স্কুলের শিক্ষকেরা সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সহায়তায় মেয়ে অর্ধেক বেতনে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
শাবনাজ বলে, অনেক রাত না খেয়েও কেটেছে তাদের। এখন উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে চলবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে সে আরও বলে, ‘জানি না, ভাগ্যে লেখাপড়া আছে কি না।’
মো. ইসমাইল বলেন, ‘এখন আমার বয়স ৫৫ বছর। সারা দিন রিকশা টেনে শরীরে শক্তি পাই না। মৃত্যুর আগে মেয়েটাকে প্রতিষ্ঠিত দেখে যেতে চাই।’
আল ফারুক একাডেমির প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, শাবনাজ অনেক মেধাবী। ওর লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল তার একাগ্রতা। এ ছাড়া মা–বাবার কষ্টকে সে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। সে তার মা–বাবা, শিক্ষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
শৈশব থেকেই মায়ের স্নেহ পায়নি। জীবনের পরতে পরতে ছিল অভাব আর চরম প্রতিকূলতা; কিন্তু কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং দিনমজুর বাবার স্নেহে সব বাধা পেরিয়ে এবারের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে লিজা আক্তার।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বাড়াগাঁও গ্রামে বাড়ি লিজাদের। তার বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন মা আমেনা বেগম মারা যান। পরবর্তী সময়ে বাবা বিল্লাল হোসেন দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বিল্লালের নিজের কোনো জমি নেই। পরিবারের সম্বল বলতে কয়েক শতক জমির ওপর টিনের একটি বসতঘর।
অন্যের জমিতে মজুরি খেটে বড় দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তৃতীয় মেয়ে লিজা আক্তার। চতুর্থ মেয়ে জিম আক্তার সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। দ্বিতীয় স্ত্রীর নুসরাত নামে পাঁচ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। এমন অবস্থায় চার লক্ষাধিক টাকা ঋণ করে ২০২৪ সালে লিজার বড় ভাই হৃদয় মিয়াকে বিদেশে পাঠায় পরিবার। তবে সেখানে গিয়ে ভালো কাজ পাননি হৃদয়। এতে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হিমশম খাচ্ছে পরিবার।
লিজা আক্তার নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন দুটি টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করেছে। সে প্রথম আলোকে বলে, ‘ভবিষ্যতে আমি একজন শিক্ষক হতে চাই, যাতে আমার মতো কষ্টে লেখাপড়া করা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে পারি। আর কারও কাছ থেকে সহযোগিতা পেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে কষ্টে থাকা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে সহযোগিতা করতে চাই।’
বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘মাইয়াডার লেখাপড়া করার আগ্রহ অনেক, কিন্তু কলেজের বই-খাতা-পোশাক কিনার টাহা লইয়া চিন্তায় আছি।’
দাউদকান্দি আদর্শ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘লিজা আক্তার খুবই মেধাবী এবং শান্ত স্বভাবের মেয়ে। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তির কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে লিজা আক্তার লেখাপড়ায় আরও ভালো করবে।’
বাবা পরিতোষ পাল মাটির হাঁড়িপাতিল তৈরি করেন, মা শিখা রাণী পাল গৃহিণী। বাড়ির আঙিনায় মাটির পণ্য তৈরি করে সামান্য কিছু আয় হয়। এই দিয়ে কষ্ট করে চলে তাদের সংসার। এই অভাবের সংসারে জন্ম নেওয়া লক্ষ্মী রাণী পাল এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
লক্ষ্মী রাণী পাল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা। এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী আইন নিয়ে পড়ালেখা করে বিচারক হতে চায়। তবে কলেজে পড়ার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবারটি।
লক্ষ্মী রাণীর বাবা পরিতোষ পাল জানান, মাত্র ৫ শতক জমির ওপর টিনের বাড়িতে তাঁরা বসবাস করেন। তাঁর বড় মেয়ে শ্রাবণী পালের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ছেলে দেবরতন পাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। মাঠে তাঁর কোনো চাষযোগ্য জমি নেই। আবার মাটির পাত্র তেমন বিক্রি হয় না। বছরে ছয় মাস মাটির পাত্র তৈরির কাজ চলে, অন্য সময় বসে থাকতে হয়। এই কাজ করে তাঁর মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকা আয় হয়। এই টাকায় সংসার খরচের পাশাপাশি মেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাতে হয়।
মা শিখা রাণী জানান, মেয়ে ছোট থেকেই পড়ালেখায় ভালো। তার পড়ার কথা বলতে হয় না। খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করতে হয়েছে। অন্য বান্ধবীরা ভালো ভালো পোশাক পরে স্কুলে এসেছে, তাকে এক পোশাকে সপ্তাহ পার করতে হয়েছে। নিজে গাইড বই কিনতে পারেনি, অন্যের বাড়িতে গিয়ে খাতায় পড়া লিখে এনে পড়তে হয়েছে।
লক্ষ্মী রাণী মহেশপুরের ফতেপুর গাজীরন নেছা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ জানান, লক্ষ্মী রাণী পাল খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় অনেক কষ্ট করে তাকে পড়ালেখা করতে হচ্ছে। তারপরও সে ভালো ফল করেছে। একটু সহযোগিতা পেলে সে ভালো জায়গায় পৌঁছাতে পারবে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন, নিজস্ব প্রতিবেদক, ঝিনাইদহ; প্রতিনিধি, ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ; সৈয়দপুর, নীলফামারী ও দাউদকান্দি, কুমিল্লা]