
চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর মোড়ে লালখান বাজারে যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেল খুঁজছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ খোকন। তিনি জানান, এই পথে আগে সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ টাকা ভাড়া দিতেন। আজ তাঁর কাছে চাওয়া হয় ১১০ টাকা।
তেলের দাম বাড়লে চালকের খরচও বাড়বে, সেটি বোঝেন খোকন। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, বাড়তি ভাড়া দেওয়ার টাকা আসবে কোথা থেকে? তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বাড়লে ভাড়া কিছুটা বাড়বে, সেটা বুঝি। কিন্তু আমাদের আয় তো বাড়েনি। বাড়তি টাকা আমরা কোথা থেকে দেব? প্রয়োজনের জন্য তো বের হতেই হবে। সবকিছুর দাম বাড়ছে। এভাবে সাধারণ মানুষের চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
একই কথা বললেন আরেক যাত্রী মোহাম্মদ সাইফুল। তিনি বলেন, ‘চালকেরও খরচ বেড়েছে। তাঁকে তেল কিনে গাড়ি চালাতে হবে। তিনি হয়তো ভাড়া বাড়িয়ে খরচ সামলাবেন; কিন্তু আমরা কী করব? আমাদের তো আয় বাড়ছে না।’
আজ সোমবার দুপুরে দুজনের সঙ্গে কথা হয়। গতকাল রোববার রাতে সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। রোববার রাত ১২টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে।
কথা হয় ভাড়ায় চালানো মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের সঙ্গে। চারজনের সংসার তাঁর। মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চলে পরিবার। এখন জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে; কিন্তু সেই অনুপাতে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে জানান তিনি। বেশি ভাড়া চাইলে যাত্রী মেলে না।
তেলের দাম বাড়ার পর সংসারে কী প্রভাব পড়বে, জানতে চাইলে আলাউদ্দিন বলেন, ‘কীভাবে চলব? এখনই খুব হিসাব করে চলছি। অনেক কষ্টে আছি। গাড়ি চালানো ছাড়া উপায় নেই। আবার তেল না কিনেও গাড়ি চালানো যাবে না। যাত্রীরা ন্যায্য ভাড়া দিলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।’
আলাউদ্দিনের মতো মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালান নগরের আমানবাজারের মোহাম্মদ আকাশ। চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণার খবর পেয়ে রোববার রাতেই ছুটেছিলেন পেট্রলপাম্পে। লাইনে দাঁড়িয়ে পুরোনো দামে এক হাজার টাকার তেল কিনেছেন। সেই তেল শেষ হলেই কিনতে হবে নতুন দামে।
আকাশ বলেন, ‘একাই চারজনের সংসার চালাই। তেলের দাম বাড়লে ভাড়াও কিছুটা বাড়াতে হয়। কিন্তু বেশি ভাড়া চাইলে যাত্রীদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। অনেকে যেতে চান না। আবার কম ভাড়ায় গেলে নিজের খরচই উঠবে না। এখন কোনটা করব? সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে যাবে।’
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর আলাউদ্দিন ও আকাশের মতো মোটরসাইকেলচালকেরা পড়েছেন এমন সংকটে। বাড়তি জ্বালানি খরচ তুলতে তাঁদের ভাড়া বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরাও বাড়তি ভাড়া দিতে চাইছেন না। মোটরসাইকেলচালকদের দাবি, যাত্রীও কমে গেছে।

গত ফেব্রুয়ারির পর এ নিয়ে তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল। তবে প্রতিবার সব ধরনের তেলের দাম বাড়েনি। ফেব্রুয়ারিতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, পেট্রল ১১৬, অকটেন ১২০ ও কেরোসিন ১১২ টাকা। ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। একই সময় পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫, অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়।
এরপর জুনে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। তবে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম আরও পাঁচ টাকা করে বাড়ে। সর্বশেষ রোববার চার ধরনের তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ফলে ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন ডিজেলের দাম লিটারে ৩৫ টাকা বেশি। পেট্রল বেড়েছে ৪৪ টাকা, অকটেন ৪৫ এবং কেরোসিন ৪৩ টাকা। ডিজেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে। তাই এর দাম বাড়ার প্রভাব এরই মধ্যে পণ্য পরিবহনের ভাড়ায় পড়তে শুরু করেছে। গতকাল দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গিয়ে এর কিছুটা দেখা গেল।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক চাপের কথা বলছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও জাহাজভাড়া বেড়েছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
জ্বালানি বিভাগের দাবি, মূল্যবৃদ্ধির আগের দরে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ধরে শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। সে হিসাবে দিনে লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। বছরে শুধু ডিজেলেই লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে সরকারের হিসাব।
বিপিসির হিসাবে, এবার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে এক বছরে সংস্থাটির বাড়তি ৮ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা আসতে পারে। জ্বালানি বিভাগ বলছে, মূল্যবৃদ্ধির ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেও গত পাঁচ মাস দেশে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে দাম কম থাকায় জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির কথাও বলেছে জ্বালানি বিভাগ।
তবে নতুন করে তেলের দাম বাড়ল এমন সময়ে, যখন দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এর চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে। সরকার এর আগে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, এখন তেলের দাম বাড়াল। মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা আরও কঠিন হবে।