
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর মেধাসম্পদ অধিকার (আইপিআর) সুরক্ষায় বাংলাদেশ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি এবং শিল্প খাতে নানা বাধ্যবাধকতা ব্যবসায়ের খরচ, পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় কার্যকর আইনি প্রয়োগ এবং যথাযথ নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চান ব্যবসায়ীরা।
আজ সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
‘এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শিল্প খাতের রূপান্তর: মেধাস্বত্ব অধিকারসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নির্ধারণ’ শীর্ষক এ ফোকাস গ্রুপ আলোচনা যৌথভাবে আয়োজন করে অর্থনৈতিক ইআরডির সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রকল্প (এসএসজিপি) ও ঢাকা চেম্বার।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, দেশে মেধাস্বত্ব আইন থাকলেও তাতে কাঠামোগত দীর্ঘসূত্রতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, সীমিত সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সক্ষমতা ধরে রাখতে একটি শক্তিশালী মেধাস্বত্ব অধিকার ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শিক্ষক এবং ওয়াইপো একাডেমির সাবেক পরামর্শক মোহাম্মদ আতাউল করিম। তিনি বলেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এত দিন পেটেন্ট ছাড় উপভোগ করায় সস্তায় জীবনক্ষাকারী জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে পেরেছে। তবে ট্রিপস প্লাস চুক্তির আওতায় পেটেন্ট করা নতুন ওষুধ বাজারে এলে জেনেরিক ওষুধের তুলনায় তার দাম গড়ে ২ থেকে ৫ গুণ বা তারও বেশি হতে পারে। এভাবে বিভিন্ন খাতে ট্রিপস ও সম্ভাব্য ট্রিপস-প্লাস বাধ্যবাধকতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
আইপিআর সুরক্ষা ও প্রশাসনিক অবকাঠামো শক্তিশালী করতে ঢাকা চেম্বার সভাপতি কয়েকটি প্রস্তাব দেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। এগুলো হচ্ছে একটি আধুনিক ও কার্যকর মেধাস্বত্ব অধিকারবিষয়ক কার্যালয় স্থাপন করা। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আইপি ট্রাইব্যুনাল চালু করা। ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রবর্তন। প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং বিশেষ করে এসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানতে চায়—আমরা কেবল সময় বাড়ানোর সুপারিশ করবো, নাকি এই সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করব। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছি যে আমাদের একটি নির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ রয়েছে। তিন বছরের মধ্যে প্রথম ২৪ মাসে আমরা যাবতীয় প্রস্তুতি, কমপ্লায়েন্স ও প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংশোধন সম্পন্ন করব। আর ছয় মাস রাখা হয়েছে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য।
প্যানেল আলোচনায় পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, শুধু জাতীয় স্বার্থ হিসাব করলেই চলবে না, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বজায় রাখতে বৈশ্বিক মানদণ্ড ও প্র্যাকটিসের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আইনের সমতা রক্ষা করাও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের পছন্দ ও শর্তকে প্রাধান্য না দিলে ভবিষ্যতে রপ্তানি খাত বাধার মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার এস এম আরশাদ ইমাম বলেন, প্রযুক্তি বিকাশের ফলে অননুমোদিত স্ট্রিমিং, কনটেন্ট ডাউনলোড ও রিপ্রোডাকশনের মাধ্যমে ডিজিটাল পাইরেসি বাড়ছে। এর ফলে প্রকৃত স্বত্বাধিকারী ও বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবস্থাপনার জোরদার সমন্বয় প্রয়োজন।
বিজিএমইএ মহাসচিব মেজর জেনারেল (অব.) মো. শাহেদুল ইসলাম বলেন, এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ ও উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা সহায়তা প্রদান জরুরি। বিজিএমইএ ইতিমধ্যে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্থাপন করেছে, যেখানে তৈরি পোশাক খাতে নতুন পণ্যের ডিজাইন ও মেধাস্বত্ব নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের উপমহাব্যবস্থাপক ফায়েজ আহমেদ বলেন, ওষুধ খাতে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে দেশীয় বাজারে আন্তর্জাতিকভাবে মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ করলে ওষুধের দাম বেশ বাড়বে, ফলে দেশের জনগণ ভুক্তভোগী হবে। তাই বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে।
অ্যাগ্রোকেমিক্যাল খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে কার্যকর ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করার আহ্বান জানান অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান।
নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় বাড়ানোর পরামর্শ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক আবুরেজা এম মুজারেবা।
ব্রেন স্টেশন ২৩ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল কবির বলেন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর প্রাধান্য না দিয়ে শুধু আউটসোর্সিংয়ের জন্য কাজ করলে ভবিষ্যতে সফল হওয়া যাবে না। তাই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উদ্ভাবনের ওপর বেশি হারে নজর দিতে হবে।
এ ছাড়া ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নিজস্ব পণ্যের ব্র্যান্ড তৈরি, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহারের ওপর জোরারোপ করেন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক মো. আজিজুর রহমান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এসএসজিপি প্রকল্পের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আবদুল বাকী, এসএসজিপির প্রকল্প পরিচালক ও ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম জাহাঙ্গীর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সাইফ উদ্দিন আহম্মদ প্রমুখ।