
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলেও আপাতত ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে যৌথ বিমান হামলায় সৌদি আরবের সঙ্গে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে নিজের সামরিক লড়াইয়ে ট্রাম্পের সৌদি সহযোগিতা প্রয়োজন।

সৌদি আরবের আবেদনে সাড়া দিয়ে ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থানে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্ন টানা দুই সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বেশ ভাবিয়েছে।
হামলার সিদ্ধান্ত নিলে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুরু করা সেই যুদ্ধে আরও একটি নতুন ফ্রন্ট বা যুদ্ধক্ষেত্র খুলে দিতে পারে। ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ধাক্কা ছড়িয়ে দিলেও প্রায় সাত মাস ধরে চলমান এই সংঘাত তিনি শেষ করতে পারেননি।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি ইয়েমেন সৌদি–সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। তারা সৌদি আরবেও হামলা চালায়। এই পরিস্থিতিতে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা চেয়ে সৌদি আরবের করা আরজির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার বিষয়টি আবার ট্রাম্পের সামনে আসে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান সহযোগী এবং সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করে দ্রুত এগিয়ে আসার আবেদন জানান।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিক তার আগের দিনই উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছিলেন তিনি ইয়েমেন হুতিদের অবস্থানে হামলার পক্ষে নন। কিন্তু সৌদি যুবরাজের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টান। হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার প্রস্তুতি নিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনকে নির্দেশ দেন।
তবে গত রোববার দুপুরের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট আবারও তাঁর সিদ্ধান্ত বদলেছেন বলে মনে হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, অন্তত আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন বিমান হামলা হচ্ছে না। সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা এ কথা বলেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের বেশির ভাগ সদস্যই সৌদির এই হুতবিরোধী লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার বিষয়ে হয় তীব্র সংশয়ে ছিলেন, নাহয় সরাসরি বিরোধী ছিলেন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে যে চাপের মুখে রয়েছে, তা বিবেচনায় রেখেই এ অবস্থান তাদের।
হোয়াইট হাউসের প্রেস অফিস আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের এই আলোচনার বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কেবল এতটুকু বলেছেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং আমরা সব সময় আমাদের মিত্রদের রক্ষা করব।’
প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের বেশির ভাগ সদস্যই সৌদির এই হুতবিরোধী লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার বিষয়ে হয় তীব্র সংশয়ে ছিলেন, নাহয় সরাসরি বিরোধী ছিলেন। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে যে চাপের মুখে রয়েছে, তা বিবেচনায় রেখেই এ অবস্থান তাদের।

সংশ্লিষ্ট দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, হুতি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানো থেকে সরে আসা বা অন্তত তা পিছিয়ে দেওয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত এমন এক মুহূর্তে এল, যখন কমান্ডাররা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা অনুমোদন করে ফেলেছিলেন। এ অভিযানের জন্য নির্ধারিত মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোতে সেনারা বোমা তুলছিলেন। হামলা চালানোর প্রস্তুতি চলছিল।
গত রোববার সকালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিক ট্রেই ইয়িংস্টকে জানান, ইরানের সঙ্গে চলমান বড় আকারের যুদ্ধের ব্যাপারে কী করা যায়, সে বিষয়ে তিনি ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায়’ রয়েছেন। হুতিদের প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট জানান, আমেরিকা এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। একই সঙ্গে হুতিরা এ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে লড়াই না করার বিষয়ে সম্মত রয়েছে।
এই টালমাটাল পরিস্থিতি মূলত সেই গ্যাঁড়াকলকেই ফুটিয়ে তোলে—যার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন। তিনি যখন বলেন, হুতিরা মার্কিন জাহাজগুলোতে হামলা চালানো থেকে দূরে রয়েছে, তখন তিনি সঠিক। কিন্তু হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, যা ট্রাম্পের জন্য উভয়সংকট তৈরি করেছে।
আমেরিকান সামরিক বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা যুক্তি দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সৌদি রাজতন্ত্রের সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। আর সৌদি কর্মকর্তারাও দেখিয়ে দিয়েছেন যে মার্কিন সহযোগিতা না পেলে তাদের যতটুকু প্রভাব প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে, তা তারা ব্যবহারে প্রস্তুত। উদাহরণস্বরূপ, গত মে মাসে সৌদি আরব তাদের আকাশসীমা এবং দেশে থাকা আমেরিকান বিমানঘাঁটিগুলো ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক তেল ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করার যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন করেছিল, তা সেভাবে কার্যকর হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালনকারী বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও কমান্ডাররা অবশ্য মনে করছেন, একটি সীমিত মাত্রার মার্কিন অভিযান হুতিদের আলোচনায় বসাতে কিংবা কঠোর দাবি থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি সৌদির এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যোগ দিত, তবে তা হতো ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর একটি নতুন পরিকল্পিত স্থল অভিযানের সঙ্গে যৌথ অভিযান। কিন্তু সেই বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
সৌদি আরব ও আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে হুতিরা ২০১৪ সাল থেকে যুদ্ধ করে আসছে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সহিংসতা কমে এসেছিল, কিন্তু চলতি গ্রীষ্মে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে হুতিরা। সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়ে দলটি মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে তারা।
চলমান এই লড়াইয়ের মধ্যেই হুতিরা লোহিত সাগরের সংকীর্ণ নৌপথ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় নিয়ন্ত্রণ সংহত করেছে। যা ইরান যুদ্ধে কারণে এমনিতেই বিপর্যস্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আরও টালমাটাল করে তোলার হুমকি তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালনকারী বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও কমান্ডাররা অবশ্য মনে করছেন, একটি সীমিত মাত্রার মার্কিন অভিযান হুতিদের আলোচনায় বসাতে কিংবা কঠোর দাবি থেকে সরে আসতে বাধ্য করতে পারবে না। কারণ, হুতিরা গত বছর প্রায় আট সপ্তাহ ধরে চলা মার্কিন বোমাবর্ষণও সহ্য করে টিকে ছিল।

সেই কর্মকর্তারা ইয়েমেনের অকার্যকর বাহিনীকে সহায়তা করার কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কারণ, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের সঙ্গে প্রথম বড় ধরনের সংঘর্ষের মুখে পড়েই ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো গ্রেগরি জনসেনের মতে, ইয়েমেনের হুতি-বিরোধী জোট মূলত দেশটির এমন সব বেঁচে যাওয়া বা বিচ্ছিন্ন অংশগুলোর সমন্বয়ে তৈরি এক জোড়াতালির জোট, যাদের একমাত্র মিল হলো তারা হুথি নয়। তাঁর মতে, ওই জোটের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরস্পরের থেকে অনেকটাই আলাদা। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। ফলে তারা হুতিদের সঙ্গে লড়াই করার চেয়ে নিজেদের মধ্যেই মারামারি করে বেশি সময় পার করে।
২০২৫ সালের বসন্তে, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে এবং বাণিজ্যিক ও মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হুতিদের হামলা বন্ধ করতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে হুতিদের ওপর বোমাবর্ষণ করেছিল।
সেই অভিযানের সময়, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। যার মধ্যে ছিল রাডার সিস্টেম, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি, ড্রোন উৎক্ষেপণ এলাকা এবং ইয়েমেনের রাজধানী সানার কাছাকাছি একটি ড্রোন তৈরির কেন্দ্র।

ওই সময় হুতিরা পাল্টা লড়াই করে কয়েকটি আমেরিকান ড্রোন গুলি করে নামিয়েছিল। হুতি যোদ্ধারা লোহিত সাগরে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরিসহ অন্যান্য নৌজাহাজে গুলি অব্যাহত রেখেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাগুলোর প্রথম মাসেই প্রায় এক শ কোটি ডলারের অস্ত্র ও গোলাবারুদ খরচ হয়ে যায়। অভিযান চলাকালে, হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর দায়িত্বে থাকা ৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার মূল্যের দুটি ‘এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট’ যুদ্ধবিমান ভুলবশত আমেরিকার মূল বিমানবাহী রণতরি থেকে সাগরে পড়ে যায়।
সেই অভিযান শুরু হওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুতিদের সঙ্গে হঠাৎ করেই এক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। তখন ট্রাম্প প্রচার করেন, ‘হুতিরা কথা দিয়েছে যে তারা আর কোনো জাহাজে গুলি চালাবে না এবং আমরা তা সম্মান করি।’
হুতিরা আমেরিকান জাহাজে গুলি চালানো বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও বিমান হামলা শুরু করে, তবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরও সতর্ক করে দিয়েছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি যেখানে এখনো অস্থির অবস্থায় রয়েছে, সেখানে বিশ্ব হয়তো শীঘ্রই বাব আল-মানদেবে তেল ও গ্যাসের পরিবহন রুটে নতুন করে আরও বিঘ্ন ঘটার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
গত বছরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে হুতিরা তাদের সক্ষমতার অনেকটাই পুনর্গঠন করে নিয়েছে এবং নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও নকশা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে। বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে মার্কিন সামরিক বাহিনী সৌদিদের সহায়তা করলেও হুতিদের পরাজিত করা কঠিন হবে।