
ইকবাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (কেআইএসটি) পিএইচডি করবেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে কোরিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন তিনি। পিএইচডি করাকালীন তাঁর টিউশন ফি, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় খরচ বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া তাঁকে মাসে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা স্টাইপেন্ড দেওয়া হবে।
স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে সিজিপিএ ছিল ২ দশমিক ৮৯। তখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন ইকবাল হোসেন। তবে তিনি থেমে যাননি। এর পর থেকেই গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন। আইইএলটিএস দিয়ে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছেন। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
ইকবাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (কেআইএসটি) পিএইচডি করবেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে কোরিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন তিনি। পিএইচডি করাকালীন তাঁর টিউশন ফি, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় খরচ বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া তাঁকে মাসে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা স্টাইপেন্ড দেওয়া হবে।
ইকবালের বেড়ে ওঠা ঢাকার আজিমপুরে। তাঁর স্কুল ও কলেজজীবন কেটেছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ রাইফেলস স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ইকবালের সিজিপিএ ছিল ৩ দশমিক শূন্য ১। দ্বিতীয় বর্ষে তা নেমে আসে ২ দশমিক ৮৯-এ। তবে পুনঃপরীক্ষায় ফলের উন্নতি হয়। শেষ পর্যন্ত ৩ দশমিক ৩০ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করেন তিনি। পরে বুয়েট থেকে ৩ দশমিক ৫০ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকোত্তর পাস করেন।
ইকবাল জানান, শুরুর সমস্যাটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। নতুন ধরনের পদ্ধতির সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি। ফলে তাঁর ফলাফল প্রত্যাশিত হয়নি।
দ্বিতীয় বর্ষের ফল হাতে পাওয়ার পর ইকবালের মনে হয়েছিল, এত কম ফল নিয়ে সামনে এগোনোর পথ হয়তো বন্ধ। চাকরি হবে কি না, ব্যাংকের চাকরিতে আবেদন করা যাবে কি না—এসব প্রশ্ন তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম সিজিপিএ নিয়েও বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া শিক্ষার্থীদের গল্প দেখতে শুরু করেন তিনি। বন্ধুদের সঙ্গে আইইএলটিএস ও গবেষণা নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি। এ ছাড়া শিক্ষকদের সঙ্গেও তিনি বৃত্তি নিয়ে আলোচনা করতেন।
দ্বিতীয় বর্ষের পর ইকবাল যুক্ত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডিজ সোসাইটির (সিইউসিএসএআর) সঙ্গে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যও ছিলেন তিনি। ইকবাল বলেন, ‘সাংগঠনিক কার্যক্রম মূলত আমাকে সহায়তা করেছে। সংগঠনের কাজ করতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলা, নেটওয়ার্কিং ও নতুন কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। সে সময় মানুষের কাজে লাগতে পারার অনুভূতি আমাকে আরও কাজ করতে উৎসাহিত করেছে। সেখান থেকেই নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা বদলাতে শুরু করে।’
তৃতীয় বর্ষে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিম জাবিদ হোসাইনের ক্লাস থেকে গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ইকবালের। পরে তাঁর কাছে গবেষণায় যুক্ত হওয়ার আগ্রহের কথা জানান। জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আদনান মান্নানও গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে তাঁকে দিকনির্দেশনা দেন।
তৃতীয় বর্ষ থেকেই বাংলাদেশের প্রচলিত খাবার, বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্যে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ইকবাল। তাঁর তিনটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি স্নাতকে থাকাকালীন দুটি রিভিউ পেপারও প্রকাশিত হয়।
স্নাতক শেষে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে বায়োকেমিক্যাল টেকনোলজিতে মাস্টার্সে ভর্তি হন ইকবাল। সেখানে ২০২৫ সালে প্রথমে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। একই বছরে অর্জন করেন পোস্টগ্র্যাজুয়েট ফেলোশিপ। তখন বায়োকেমিস্ট্রি, মলিকুলার বায়োলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ওয়ান হেলথ ও ওমিক্সভিত্তিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।
তৃতীয় বর্ষ থেকেই বাংলাদেশের প্রচলিত খাবার, বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্যে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ইকবাল। তাঁর তিনটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি স্নাতকে থাকাকালীন দুটি রিভিউ পেপারও প্রকাশিত হয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার চেষ্টা শুরু করেন ইকবাল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। তবে সুযোগ পাননি।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়রের পরামর্শে কোরিয়ায় সুযোগ খুঁজতে শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন অধ্যাপকের গবেষণার সঙ্গে নিজের কাজের মিল খুঁজছিলেন। এভাবেই কেআইএসটির এক অধ্যাপকের গবেষণার সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। পরে তিনি তাঁকে ই–মেইল করেন। ইকবাল ই-মেইল করার প্রায় দুই মিনিটের মধ্যেই উত্তর পান। পরে কোরিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসটি) কেন্দ্রীয় স্কলারশিপ ব্যবস্থায় আবেদন করেন তিনি। দেশটির ৩২টি সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটি। সর্বশেষ চলতি বছর ১ জুলাই স্কলারশিপের জন্য তিনি নির্বাচিত হন।
খবরটি পাওয়ার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ করছিলেন ইকবাল। তিনি বলেন, ‘যখন ই-মেইল আসে, তখন আমি বসে খাবার খাচ্ছিলাম। আগে বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সুযোগ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। তাই খবরটি পাওয়ার অনুভূতি ছিল অন্য রকম।’

ইকবালের বাবা প্রায় তিন বছর ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিতে হয় তাঁকে। বাবার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাতায়াত করতে গিয়ে কিডনি রোগীদের দেখেছেন ইকবাল। চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভবিষ্যৎ গবেষণার ভাবনাতেও প্রভাব ফেলেছে। তিনি কিডনি রোগসহ বিভিন্ন রোগ দ্রুত শনাক্ত করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চান।
বিদেশে পিএইচডি করলেও সেখানে থাকতে চান না ইকবাল। পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে গবেষণা করতে চান তিনি। বাংলাদেশের নিজস্ব অণুজীবসম্পদ কীভাবে শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। উপকারী অণুজীব কীভাবে দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদন করা যায়, সেটিও তাঁর আগ্রহের বিষয়। এসব জীবসম্পদ ব্যবহার করে ওষুধ ও অন্যান্য উপকারী পণ্য তৈরির সম্ভাবনাও খুঁজতে চান তিনি।
যাঁরা কম সিজিপিএ নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন, তাঁদের উদ্দেশে ইকবাল বলেন, ‘একসময় আমার মনে হতো সিজিপিএ অনেক বড় বিষয়। তবে এখন শিক্ষার্থী কী পরিমাণ তাঁর কাজের প্রতি অনুগত, এ বিষয়ে গুরুত্ব অনেক বেশি। আর শুধু অনেক বেশি পড়লেই সিজিপিএ ভালো করা যায় না। এর জন্য শিক্ষকের পড়ানোর ধরন, পরীক্ষায় কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়—এসব বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এ রকম না হলে ভালো ফলাফল নিয়ে সুনিশ্চিতভাবে বিদেশে যাওয়া কষ্টকর।’