এখন চলো আমরা একটি রুশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করব। যে কোন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঢুকতে গেলে প্রত্যেককে মাথায় হেলমেট পরে নিতে হয় এবং পরিদর্শনকারীর প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ডকুমেন্ট পরীক্ষা করা হয়। আমরা একটি চালু এনার্জি ব্লক দেখব। কি দেখতে পাচ্ছি আমরা? বিশাল একটি কমপ্লেক্স, বৃহদাকার বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার, পাম্প স্টেশন, অসংখ্য ফোয়ারাসহ শীতলীকরণ জলাধার, বিভিন্ন গ্যাস ভর্তি বড় বড় সিলিন্ডার, বিভিন্ন ধরনের পাইপের নেটওয়ার্ক ইত্যাদি! দেখে নিশ্চই তাক লেগে যাচ্ছ। প্রথমেই যে জিনিসটি চোখে পড়ে তা হলো এনার্জি ব্লকটির পরিচ্ছন্নতা, সবকিছু যেন ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে নতুন করে রং করা হয়েছে।
বিল্ডিংগুলোর মাঝে মাঝে রয়েছে বিভিন্ন ফুলের বাগান, রাস্তাগুলো যেন নতুন করে কার্পেটিং করা হয়েছে। সবকিছু এত সাজানো-গুছানো যে মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। বাতাসটাও অনেক নির্মল, শ্বাস নেয়ার সময় তা অনুভব করা যাচ্ছে।

চোখে পড়ছে রেললাইন দিয়ে সারিবদ্ধভাবে চলাচলকারী রেলের ওয়াগন। ওয়াগনের প্লাটফর্মে পারমাণবিক জ্বালানি বোঝাই কনটেইনার। পারমাণবিক চুল্লিতে একবার জ্বালানি ভরলে বহু বছর চলে যায়। ব্যবহারের পর জ্বালানি বিশেষ জলাধারে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার লক্ষ্যে বিশেষ কারখানায় পাঠানো হয়ে থাকে।
বিশাল একটি কমপ্লেক্স, বৃহদাকার বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার, পাম্প স্টেশন, অসংখ্য ফোয়ারাসহ শীতলীকরণ জলাধার, বিভিন্ন গ্যাস ভর্তি বড় বড় সিলিন্ডার, বিভিন্ন ধরনের পাইপের নেটওয়ার্ক ইত্যাদি!
পারমাণবিক জ্বালানির পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ খুব একটা সহজ কাজ নয়, এ জন্য বিভিন্ন আধুনিক ও জটিল যন্ত্রপাতির ব্যবহার করতে হয় ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যেদিয়ে যেতে হয়।
পারমাণবিক এনার্জি ব্লক একটি বিশাল স্থাপনা। এ জাতীয় কিছু তুমি হয়তো পূর্বে দেখার সুযোগ পাওনি। রিঅ্যাক্টর স্থাপনাটির উচ্চতা ৬৭ মিটার। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল অংশ হচ্ছে এনার্জি ব্লক; এখানে অবস্থান করে পারমাণবিক চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর, যেটি পানিকে গরম করে, বাষ্প টার্বাইন এবং বিদ্যুৎ জেনারেটর।
পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরঞ্জাম একটি আরসিসি নির্মিত দৃঢ়, নিশ্চিদ্র শেলের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। এটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ভূমিকম্প, হ্যারিকেন, টর্নেডো, ধূলিঝড়, এয়ারওয়েভ শকসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতায়ও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এমনকি একটি বড় উড়োজাহাজ উপরে এসে পড়লেও এটির কোন ক্ষতি হবে না।
তোমার পরমাণু শক্তিচালিত জাহাজটির মতোই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের হার্ট হচ্ছে রিঅ্যাক্টর। এর মূল কাজ হলো নিরবচ্ছিন্নভাবে বিপুল পরিমাণে তাপ উৎপাদন। তুমি কি সেই পানির কথা কল্পনা করতে পার-যার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডেরও বেশি (আমরা জানি যে, ১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পানি ফুটে বাষ্পে পরিণত হয়)। হ্যা এটা সম্ভব, যদি এই পানিকে উচ্চ চাপের মধ্যে ধরে রাখা হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল অংশ হচ্ছে এনার্জি ব্লক; এখানে অবস্থান করে পারমাণবিক চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর, যেটি পানিকে গরম করে, বাষ্প টার্বাইন এবং বিদ্যুৎ জেনারেটর।
রিঅ্যাক্টর থেকে যে পানি বের হয়ে আসে তার তাপমাত্রা ৩২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড! এই পানি বাষ্প জেনারেটরে গিয়ে তার নিজস্ব তাপ অন্য পানিতে স্থানান্তর করে এবং ঐ পানিটি তাপের প্রভাবে বাষ্পে রূপান্তরিত হয়। এই বাষ্প প্রচণ্ড চাপের সাহায্যে বাষ্প টার্বাইনে পাঠানো হয়। বাষ্প টার্বাইনটির অবস্থান একটি বিশেষ হলের ভিতর।
এখন আমরা এই হলটি পরিদর্শন করব। এর দৈর্ঘ্য একটি ফুটবল মাঠের চাইতেও বেশি! বাষ্প যে টার্বাইনটিতে প্রবেশ করে তার ব্লেডগুলোকে ঘুরতে বাধ্য করে তার আকার একটি দ্বিতল ভবনের সমান। এই টার্বাইনের ঘূর্ণায়মান ব্লেডগুলো জেনারেটরের অক্ষদণ্ডটিকে ঘুরাতে থাকে, ফলে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ। চারদিকের পরিবেশ তাক লাগানোর মতো; কারণ আমরা প্রত্যক্ষ করছি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনন্য একটি প্রক্রিয়া।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, আমাদের আশপাশে একটি লোকও দেখা যাচ্ছে না। পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হয় কম্পিউটারের সাহায্যে, একটি বিশেষ কক্ষ থেকে। আমরা এখন এ নিয়ন্ত্রণ কক্ষটি ঘুরে দেখব।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রবেশ করাটা খুব কঠিন একটি ব্যাপার। যাই হোক, আমরা এখন নিয়ন্ত্রণ কক্ষে প্রবেশ করলাম; যেখান থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়। চারদিকে শত শত বাল্ব, সুইচ, কম্পিউটার...। রিঅ্যাক্টরকে যদি এনার্জি ব্লকের হৃৎপিণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয় তবে কন্ট্রোল প্যানেলটি হচ্ছে এর মস্তিস্ক বা ব্রেইন।
বাষ্প টার্বাইনটির অবস্থান একটি বিশেষ হলের ভিতর। এখন আমরা এই হলটি পরিদর্শন করব। এর দৈর্ঘ্য একটি ফুটবল মাঠের চাইতেও বেশি!
কাজে যাতে কোন বিঘ্ন না ঘটে সে জন্য আমাদের এখানে মাত্র কয়েক মিনিট থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে। শব্দ করে কথা বলতেও নিষেধ করা হয়েছে।
তুমি কি জানো একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি এনার্জি ব্লক থেকে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়? একটি আধুনিক এনার্জি ব্লকের উৎপাদন ক্ষমতা কয়েকশত মেগাওয়াট (১ মেগাওয়াট = ১,০০০ কিলোওয়াট)। আর এই পরিমাণ বিদ্যুৎ কয়েক লাখ লোকের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সক্ষম।

বাংলাদেশের পাবনা জেলার রূপপুরে স্থাপিত হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। চাইলে বড় হয়ে তুমিও সেখানে কাজ করতে পারবে!