হাসানুর রহমান
বাংলাদেশে বহু পরিবারে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির যদি শুধু কন্যাসন্তান থাকে এবং কোনো পুত্রসন্তান না থাকে, তাহলে তিনি জীবদ্দশায় হেবা (Heba) বা রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে নিজের সম্পত্তি কন্যাদের নামে লিখে দেন। এর অন্যতম কারণ হলো, ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের বিধান অনুযায়ী কন্যারা নির্ধারিত অংশ পাওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি আসাবা (Residuary Heirs) হিসেবে নিকটতম পুরুষ আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টিত হতে পারে। অনেকের আশঙ্কা থাকে, মৃত্যুর পর তাঁদের কষ্টার্জিত সম্পত্তির একটি অংশ ভাই, ভাতিজা বা অন্যান্য আসাবা উত্তরাধিকারীদের কাছে চলে যাবে। তাই জীবদ্দশায় হেবার পথ বেছে নেওয়াই তাঁদের কাছে অধিক নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত মনে হয়।
ইসলামি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, একজন মাত্র কন্যা থাকলে তিনি মোট সম্পত্তির ১/২ অংশের অধিকারী হন। দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে ২/৩ অংশের অধিকারী হন। অবশিষ্ট অংশ, যদি কোনো পুত্রসন্তান না থাকে, তাহলে আসাবাদের মধ্যে বণ্টিত হয়। প্রথমে নিকটতম আসাবা উত্তরাধিকারী অগ্রাধিকার পান। যেমন: সহোদর ভাই, সহোদর ভাই না থাকলে সহোদর ভাইয়ের ছেলে, এরপর চাচা—এভাবে শরিয়তের নির্ধারিত ক্রম অনুযায়ী উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়। নিকটবর্তী আসাবা থাকলে দূরবর্তী আসাবা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ইসলামি উত্তরাধিকার ব্যবস্থার এই কাঠামো কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই বাস্তবতায় অনেক বাবা-মা চান তাদের অর্জিত সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে কন্যাদের কাছেই থাকুক। তাই মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার বণ্টনের অপেক্ষা না করে জীবিত অবস্থায় হেবার মাধ্যমে সম্পত্তি কন্যাদের নামে হস্তান্তর করে দেন। আইনগতভাবে সঠিকভাবে সম্পন্ন হেবা সম্পত্তির মালিকানা তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহীতার কাছে স্থানান্তর করা হয়। ফলে পরবর্তীতে সেই সম্পত্তি আর উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টনের আওতায় আসে না।
তবে এর একটি বাস্তব সমস্যাও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সম্পত্তি হেবা পাওয়ার পর কিছু সন্তান সেই সম্পত্তি বিক্রি করে দেয় অথবা বাবা-মায়ের প্রতি পূর্বের মতো দায়িত্ব পালন করে না। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা আর্থিক ও সামাজিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। যদিও এটি সব ক্ষেত্রে ঘটে না, তবুও সমাজে এমন ঘটনার নজির একেবারে কম নয়। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই হেবা-সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তনের দাবি সময়ে সময়ে সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান হেবা-সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তনের একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। আলোচিত প্রস্তাব অনুযায়ী, হেবার মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করা হলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত গ্রহীতা সেই সম্পত্তি বিক্রি বা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে পারবেন না। উল্লেখ্য, এটি এখনো একটি প্রস্তাব মাত্র; এটি আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বিস্তৃত আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।
এই প্রস্তাবের পক্ষে যেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রয়েছে, তেমনি বিপক্ষেও রয়েছে গুরুতর আইনগত ও শরিয়াহভিত্তিক প্রশ্ন।
পক্ষে যুক্তি হলো, এতে বাবা-মায়ের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেতে পারে। সম্পত্তি পাওয়ার পর বাবা-মাকে অবহেলা করার প্রবণতা কমতে পারে। প্রতারণা, প্রলোভন বা আবেগের বশবর্তী হয়ে সম্পত্তি বিক্রির ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ ও অসহায় বাবা-মায়ের স্বার্থ রক্ষায় এটি একটি সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
অন্যদিকে বিপক্ষের যুক্তিগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইসলামি আইনে বৈধভাবে হেবা সম্পন্ন হলে গ্রহীতা সম্পত্তির পূর্ণ মালিক হয়ে যান। ফলে সেই সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে হেবার মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। বৈধ মালিকের সম্পত্তি ভোগ, ব্যবহার ও হস্তান্তরের অধিকার সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামি হেবা এবং প্রচলিত সম্পত্তি আইনের মধ্যে নতুন ধরনের আইনি জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু আসাবা উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় কন্যাদের নামে সব সম্পত্তি হেবা করে দেওয়ার প্রবণতাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয়। ইসলামি আইনে জীবদ্দশায় হেবা বৈধ হলেও অনেক আলেম ও ইসলামি আইনবিদের মতে, যদি হেবার মূল উদ্দেশ্যই হয় আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে কার্যত অকার্যকর করা বা নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করা, তাহলে তা শরিয়তের উদ্দেশ্য, ন্যায়বিচার এবং উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মূল চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। কারণ কোরআনে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং মুসলিম সমাজে তা একটি মৌলিক বিধান হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে, আরেকটি শক্তিশালী মতও রয়েছে। অনেক ইসলামি আইনবিদের মতে, জীবদ্দশায় হেবা উত্তরাধিকার নয়; এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র আইনগত ব্যবস্থা। তাই একজন ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি যাকে ইচ্ছা বৈধভাবে হেবা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে কোনো আসাবা উত্তরাধিকারী সম্পত্তি না পেলেও কেবল সেই কারণে হেবা অবৈধ হয়ে যায় না। অর্থাৎ বিষয়টি ইসলামি আইনেও ইজতিহাদ ও মতপার্থক্যমূলক আলোচনার মধ্যে রয়েছে।
আমার দৃষ্টিতে, আলোচিত প্রস্তাবটি শুধু একটি আইনি সংশোধনের বিষয় নয়; এটি ধর্মীয় বিধান, সম্পত্তির মালিকানা, পারিবারিক মূল্যবোধ, প্রবীণ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা এবং ইসলামি উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বরং আইন, শরিয়ত এবং সামাজিক বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।
একদিকে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে ইসলামি শরিয়ত নির্ধারিত উত্তরাধিকার ব্যবস্থার মূল দর্শন এবং হেবার স্বীকৃত নীতিমালাও সমানভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তাই এ ধরনের আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের আগে ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, বিচারক, সমাজবিজ্ঞানী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
পরিশেষে, শুধু আইন পরিবর্তন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধ, বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধ এবং ইসলামি উত্তরাধিকার ও হেবা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে আইন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের যথাযথ চর্চা।
লেখক: অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা
ওএফএফ