সারাদেশ

উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৭ চমকপ্রদ উদ্ভাবন, যা বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে

b
bd24live অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
বিদ্যুৎ নেই? সূর্যের আলোই হতে পারে সমাধান। ব্যাংক নেই? মোবাইল ফোনেই হতে পারে টাকা লেনদেন। দুর্গম পাহাড়ে রক্ত পৌঁছাতে রাস্তা লাগে না—ড্রোনও পারে। উন্নয়নশীল বিশ্বের এসব উদ্ভাবন দেখাচ্ছে, বড় সমস্যার সমাধান সবসময় বড় বাজেটের প্রযুক্তি দিয়ে করতে হয় না। বিশ্বে উদ্ভাবন বলতে আমরা সাধারণত সিলিকন ভ্যালি, জাপান, জার্মানি বা ইউরোপের কথা ভাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যেখানে অর্থ ও অবকাঠামো সীমিত, সেখানেও প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিচ্ছে অসাধারণ সব সমাধান। এই ধরনের উদ্ভাবনকে অনেক সময় বলা হয় Frugal Innovation—কম খরচে, সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে বড় সমস্যার কার্যকর সমাধান। উন্নয়নশীল বিশ্বের এই ‘কম দিয়ে বেশি করার’ সংস্কৃতিকে BRAC-ও Global South-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করে। এবার দেখা যাক এমন সাতটি উদ্ভাবন, যেগুলোর প্রভাব নিজ নিজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। ১. কেনিয়ার মোবাইল টাকা—ব্যাংক ছাড়াই আর্থিক বিপ্লব: M-Pesa একসময় টাকা পাঠাতে ব্যাংক, এজেন্ট বা নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু কেনিয়া দেখিয়ে দিল—একটি সাধারণ মোবাইল ফোনও ব্যাংকের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। ২০০৭ সালে চালু হওয়া M-Pesa মোবাইল ফোনভিত্তিক অর্থ লেনদেনকে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে। ব্যবহারকারীরা মোবাইলের মাধ্যমে টাকা পাঠানো, গ্রহণ, সঞ্চয় ও বিভিন্ন পেমেন্ট করতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কেনিয়া ২০০৭ সালে M-Pesa চালুর পর আফ্রিকার মোবাইল মানি খাতের অন্যতম অগ্রদূত হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালের মধ্যেই দেশটিতে ৩৭.৪ মিলিয়ন মোবাইল ওয়ালেট ছিল। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এমন মানুষের ওপর, যাদের কাছে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা সহজলভ্য ছিল না। অর্থাৎ—ব্যাংক সবার ঘরে যায়নি, কিন্তু মোবাইল ফোন গেছে। সেই মোবাইলকেই আর্থিক ব্যবস্থার দরজা বানানো হয়েছে। বাংলাদেশেও bKash-সহ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। BRAC-এর তথ্য অনুযায়ী, মোবাইল মানি বিশেষ করে নারীদের সঞ্চয় ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।  ২. ভারতের UPI—টাকা পাঠানো যেন মেসেজ পাঠানোর মতো: ডিজিটাল পেমেন্টের নতুন মডেল ভারতের UPI বা Unified Payments Interface ডিজিটাল লেনদেনের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মোবাইলভিত্তিক একটি সহজ অবকাঠামো যুক্ত করে UPI মানুষকে দ্রুত টাকা পাঠানো ও গ্রহণের সুযোগ দিয়েছে। ছোট দোকান থেকে বড় ব্যবসা—সবখানেই QR কোড স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। বিশ্বব্যাংক Digital Public Infrastructure বা DPI-এর উদাহরণ হিসেবে ভারতের Aadhaar ও UPI-কে উল্লেখ করেছে। একই কাঠামোর উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের Pix ও থাইল্যান্ডের PromptPay-এর কথাও বলা হয়েছে। এর গুরুত্ব শুধু একটি অ্যাপ বা পেমেন্ট পদ্ধতিতে নয়। এটি দেখিয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো মিলিয়ে এমন ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যার ওপর হাজারো সেবা দাঁড়াতে পারে। ৩. বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সূর্যের আলো: Solar Home System বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় একসময় বিদ্যুৎ পৌঁছানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারগুলোর জন্য গ্রিডের বিদ্যুৎ পাওয়া কঠিন ছিল। সেখানে সমাধান হিসেবে জনপ্রিয় হয় Solar Home System। ছোট সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, LED বাতি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম—এই ছোট্ট ব্যবস্থা দিয়ে একটি পরিবার বিদ্যুৎবিহীন অবস্থাতেও আলো ও কিছু বৈদ্যুতিক সুবিধা পেতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা IEA-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে Solar Home Systems-এর মাধ্যমে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছিল। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রযুক্তির আকার নয়, ব্যবহারের উপযোগিতা। একটি বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি না করেও একটি গ্রামের প্রত্যন্ত বাড়িতে আলো পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি বড় শিক্ষা: কখনো কখনো ছোট প্রযুক্তিই বড় অবকাঠামোর বিকল্প হতে পারে। ৪. রাস্তায় যানজট? রক্ত নিয়ে আকাশপথে আসছে ড্রোন: রুয়ান্ডার ড্রোন বিপ্লব রুয়ান্ডার দুর্গম এলাকায় রক্ত পৌঁছানো একসময় বড় সমস্যা ছিল। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও খারাপ রাস্তার কারণে অ্যাম্বুলেন্সে করে দ্রুত রক্ত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ত। সমাধান? ড্রোন। ২০১৬ সালে রুয়ান্ডা জাতীয় পর্যায়ে ড্রোনের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহের ব্যবস্থা চালু করে। ড্রোনে রক্তের প্যাকেট তুলে দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তা আকাশপথে পাঠানো হয়। WHO-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ড্রোনের মাধ্যমে রক্ত পৌঁছানোর সময় চার ঘণ্টা থেকে মাত্র ১৫ মিনিটে নেমে আসে। ভাবুন—রাস্তা নেই, কিন্তু আকাশ আছে। তাই রাস্তাকে এড়িয়ে আকাশপথকেই সরবরাহ ব্যবস্থা বানিয়ে ফেলা হলো। আজ চিকিৎসা সরঞ্জাম, রক্ত ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছাতে ড্রোন ব্যবহারের ধারণা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আলোচনার বিষয়। ৫. বাংলাদেশের ORS—এক গ্লাস পানিতে জীবন বাঁচানোর প্রযুক্তি: Oral Rehydration Solution উদ্ভাবনের গল্পে সবচেয়ে অবমূল্যায়িত বিষয়গুলোর একটি হলো—জটিল প্রযুক্তি ছাড়াও অসাধারণ উদ্ভাবন হতে পারে। ডায়রিয়ায় শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। গুরুতর পানিশূন্যতা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট অনুপাতে পানি, লবণ ও গ্লুকোজের দ্রবণ মুখে খাওয়ানো গেলে পানিশূন্যতা মোকাবিলা করা যায়। বাংলাদেশে ডায়রিয়া মোকাবিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মৌখিক পুনঃপানীয়ন বা ORS ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। BRAC-এর Oral Rehydration Therapy বা ORT কর্মসূচি ঘরে ঘরে এই ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে পরিচিত। এর সৌন্দর্য এখানেই—একটি স্যালাইন বানাতে অত্যাধুনিক হাসপাতাল দরকার নেই। সঠিক উপাদান ও সঠিক অনুপাত জানা থাকলেই ঘরেও তা প্রস্তুত করা সম্ভব। এ ধরনের সহজ স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। ৬. ভারতের ‘জয়পুর ফুট’—কৃত্রিম পা, কিন্তু জীবনের গতি স্বাভাবিক: কম খরচে চলাফেরার নতুন সুযোগ কৃত্রিম অঙ্গ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে—এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে ভারতের Jaipur Foot। ভারতে তৈরি এই কৃত্রিম পা তুলনামূলক কম খরচে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারী হাঁটা, বসা, এমনকি ভারতীয় জীবনযাপনের কিছু সাধারণ ভঙ্গিও করতে পারেন। এটি শুধু একটি চিকিৎসা-প্রযুক্তি নয়; বরং ব্যবহারকারীর বাস্তব জীবনকে কেন্দ্র করে নকশা করা উদ্ভাবন। উন্নত দেশের ব্যয়বহুল প্রযুক্তিকে হুবহু অনুকরণ না করে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি তৈরি করা—এটাই Frugal Innovation-এর মূল দর্শনের একটি উদাহরণ। ৭. বাংলাদেশের ভাসমান স্কুল—বন্যার পানিতেও বন্ধ নয় পড়াশোনা: যেখানে স্কুল ডুবে যায়, সেখানে স্কুলই ভেসে ওঠে বাংলাদেশের নদী ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে বর্ষাকালে অনেক জায়গায় স্কুলে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও রাস্তা ডুবে যায়, কোথাও স্কুলঘর পানিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সমস্যার অভিনব সমাধান হিসেবে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে ভাসমান স্কুল ও শিক্ষা কার্যক্রম। নৌকা বা ভাসমান কাঠামোকে শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার জন্য পানির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় না—স্কুলই তাদের কাছে চলে আসে। এটি হয়তো Silicon Valley-এর কোনো চকচকে প্রযুক্তি নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার মতো বাস্তব সমস্যার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কেনিয়ার মোবাইল মানি, ভারতের UPI, বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ, রুয়ান্ডার ড্রোন, ORS, Jaipur Foot কিংবা ভাসমান স্কুল—দেখতে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু গভীরে গেলে একটি মিল পাওয়া যায়। সমস্যা আগে, প্রযুক্তি পরে। উন্নত বিশ্বের অনেক উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সম্ভাবনা থেকে ব্যবহার তৈরি হয়। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক উদ্ভাবনে দেখা যায় উল্টো চিত্র— একটি বাস্তব সমস্যা সামনে এসেছে → প্রচলিত সমাধান ব্যয়বহুল বা অসম্ভব → তাই কম খরচে নতুন পথ তৈরি হয়েছে। BRAC-এর ভাষায়, সীমিত সম্পদের পরিস্থিতিতে সমাধানকে হতে হয় সহজ, শক্তিশালী ও সহজে গ্রহণযোগ্য—এটাই frugal innovation-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভবিষ্যতের উদ্ভাবন কি আসবে ‘Global South’ থেকেই? সম্ভাবনাটা যথেষ্ট বড়। কারণ আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষ এমন সমস্যার মুখোমুখি হন, যেগুলোর সমাধান প্রচলিত পদ্ধতিতে খুব ব্যয়বহুল। বিদ্যুৎ নেই—তাই সৌরবিদ্যুৎ। ব্যাংক নেই—তাই মোবাইল মানি। রাস্তা নেই—তাই ড্রোন। স্কুলে যাওয়া যায় না—তাই ভাসমান স্কুল। ব্যয়বহুল কৃত্রিম অঙ্গ কেনা সম্ভব নয়—তাই কম খরচের স্থানীয় নকশা। অর্থাৎ, অভাব কখনো কখনো উদ্ভাবনের শত্রু নয়; বরং উদ্ভাবনের চাপ তৈরি করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্ভাবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো প্রযুক্তি নয়, দৃষ্টিভঙ্গি। বিশ্বকে বদলে দিতে সবসময় সবচেয়ে দামি যন্ত্র দরকার হয় না। কখনো একটি মোবাইল ফোন, কখনো একটি সৌর প্যানেল, কখনো একটি ড্রোন, আবার কখনো কয়েকটি কাঠের টুকরো ও একটি নৌকাই যথেষ্ট হতে পারে। যে উদ্ভাবন মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন।
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>