বিজ্ঞাপন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলে লিফট ও বিদ্যুৎ সমস্যাকে কেন্দ্র করে হল প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী ফিরোজ আহাম্মেদ পাপন প্রভোস্টের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন বলে জানা গেছে।
তবে এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অভিযোগ করেছে, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, হলের কোনো সমস্যা বা সংকট দেখা দিলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে হল প্রশাসনের সঙ্গে বসে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই প্রত্যাশিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি।
এদিকে, প্রভোস্টের কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত হল সূত্রে জানা যায়, গত রোববার দুপুর সাড়ে ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
হল প্রশাসনের দাবি, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়ে আগে থেকে হল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। ফলে আকস্মিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে প্রায় আধা ঘণ্টা জেনারেটর চালানো হয়।পরে জেনারেটরে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট সেটি বন্ধ থাকে।
হল প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময়ই পাপন কয়েকজন হল কর্মচারীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। পরে হল প্রভোস্টকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি জেনারেটর চালুর নির্দেশ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই জেনারেটর চালু হলেও এর মধ্যে পাপন প্রভোস্টের সঙ্গে আলোচনা না করেই হল অফিসে তালা দেন বলে দাবি প্রশাসনের।
তালা খোলেনি বৈঠকেও ঘটনার পর হলের সার্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল রাত ১০টার দিকে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। পাপনের উদ্যোগে আয়োজিত ওই বৈঠকে হল প্রভোস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. মো. আবদুছ সাত্তার, হলের সদ্য সাবেক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা পাপনকে প্রভোস্টের কক্ষের তালা খুলে দিতে বলেন, যাতে হল অফিসেই বসে আলোচনা করা যায়। তবে তিনি তালা খুলতে অস্বীকৃতি জানান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য।
পরে হলের কর্মচারীদের মাধ্যমে তালা ভেঙে অফিসে বসে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে লিফট, জেনারেটরসহ হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও দ্রুত সমাধানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বৈঠক শেষ হওয়ার পর আবারও প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়। ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া হয়নি’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, “পাপন যে বলছে দাবিদাওয়া না মানা পর্যন্ত তালা খুলবে না, কিন্তু দাবিগুলো কী? উদ্দেশ্য সৎ হোক, কিন্তু দাবিদাওয়া দেওয়ার আগে হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কি কোথাও মতামত নেওয়া হয়েছিল? তালা দেওয়ার আগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কি আলোচনা করা হয়েছিল? যদি না করা হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাম ব্যবহার করে কেন এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?” শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাদেরও দীর্ঘদিনের দাবি রয়েছে। তবে সেসব বিষয়ে সমন্বিতভাবে আলোচনা না করে এককভাবে প্রশাসনিক কক্ষে তালা দেওয়া সমস্যার সমাধানের বদলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
‘দলীয় কোনো এজেন্ডা নেই’ অভিযোগের বিষয়ে হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ আহাম্মেদ পাপন সময়ের আলোকে বলেন, “আমার এখানে দলীয় কোনো এজেন্ডা নেই। আমি শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়ার প্রেক্ষিতে তালা লাগিয়েছি। আজ স্যার আবার আমাদের সঙ্গে বসবেন। প্রভোস্ট স্যার যদি আমাদের দাবি মেনে নেন, তাহলে তালা খুলে দেওয়া হবে।”
‘কাউকে কিছু না বলে তালা দেওয়া হয়’
ঘটনার বিষয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক লুৎফুল এলাহী সময়ের আলোকে বলেন,“কারেন্ট চলে যাওয়ার পর জেনারেটরে ত্রুটির কারণে কানেকশন দিতে ১০-১৫ মিনিট দেরি হয়। এ সময় কাউকে কিছু না বলে রোববার দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে হল অফিসে তালা দেওয়া হয়। হলের অফিসারের মাধ্যমে বিষয়টি আমি জানতে পারি। এর মধ্যেই জেনারেটর চালু হলেও তালা খোলা হয়নি।”
তিনি বলেন, “গতকাল রাত ১০টার দিকে পাপন আলোচনার জন্য আমাকে হলে ডাকেন। আমি এবং প্রক্টরের প্রতিনিধি হিসেবে সহকারী প্রক্টর ড. মো. আবদুছ সাত্তার হলে যাই। হলের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন। সবাই পাপনকে তালা খুলতে বললেও তিনি তা করেননি। পরে তিনি তালা না খুলেই চলে যান।”
প্রভোস্ট আরও বলেন, “উপস্থিত সবাই তখন তালা ভাঙতে বললেও আমি তাদের থামিয়ে দিয়ে গেস্ট রুমে বসি। পরে তারা তালা ভেঙে আমাদের অফিসে নিয়ে আসে এবং সেখানে আলোচনা হয়। জেনারেটর, লিফটসহ হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয় এবং দ্রুত সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সবাই চলে যাওয়ার পর জানতে পারি, আবারও অফিস কক্ষে তালা দেওয়া হয়েছে। এটি শৃঙ্খলাবিরোধী এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত স্বার্থের পরিপন্থী।”
সমাধানের উদ্যোগের দাবি প্রশাসনের অধ্যাপক লুৎফুল এলাহী বলেন, “আজ সকালেই জেনারেটর কোম্পানির লোকজন ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এনে জেনারেটরের সমস্যা সমাধান করেছে। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মোটরসাইকেল ধোয়ার জন্য পানির পাইপ লাগানো হয়েছে। মাঠ নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত নেট দিয়ে হলের ভেতরে সীমিত জায়গায় ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থাপিত অন্যান্য সমস্যাগুলো সমাধানের পদক্ষেপও চলমান রয়েছে।”
তবে এসব উদ্যোগের মধ্যেও প্রভোস্টের কক্ষে তালা দেওয়ার ঘটনায় হলের প্রশাসনিক কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের মতামত ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান কতটা কার্যকরভাবে হবে তা নিয়ে হলজুড়ে আলোচনা চলছে।
বিজ্ঞাপন