বিজ্ঞাপন
নগদ টাকার পাশাপাশি দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের ব্যবহার বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে এসব কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে প্রিপেইড কার্ডে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশের নাগরিকরা বিদেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি লেনদেন করেছেন। এসব লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে গত পাঁচ বছরে দেশে কার্ডের বিস্তার, অভ্যন্তরীণ লেনদেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের ব্যয় এবং দেশে বিদেশিদের কার্ড ব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১ সালের আগস্টে দেশে ডেবিট কার্ড ছিল ২ কোটি ৩৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৮টি। ওই সময় ক্রেডিট কার্ড ছিল ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯ লাখ ৮১ হাজার ১৫৮টি। সব মিলিয়ে কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসে মোট কার্ডের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টি। এর মধ্যে ডেবিট কার্ড ৪ কোটি ৬ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৫টি, ক্রেডিট কার্ড ২৭ লাখ ২ হাজার ৬৯৩টি এবং প্রিপেইড কার্ড ৯০ লাখ ৮১ হাজার ৩২৯টি। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে মোট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ।
কার্ডের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে তিন ধরনের কার্ডে মোট লেনদেন হয়েছিল ২২ হাজার ৭৮৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ফলে পাঁচ বছরে কার্ড লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ।
কার্ডের ধরন অনুযায়ী প্রবৃদ্ধিতেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ড ২৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ।
জুলাইয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে মোট ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের মাস জুনে এর পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক মাসে ক্রেডিট কার্ড লেনদেন কমেছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
দেশীয় ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। জুলাইয়ে এ খাতে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা মোট লেনদেনের ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
দেশীয় ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের ৯০ দশমিক ৬৯ শতাংশই হয়েছে পণ্য ও সেবা কেনাকাটায়। নগদ উত্তোলনের অংশ ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং অর্থ স্থানান্তরের অংশ ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
কার্ডের ধরন অনুযায়ী দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ভিসার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। জুলাইয়ে ভিসা কার্ডে ৩ হাজার ২৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে, যা মোটের ৭৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। মাস্টারকার্ডে ৬৬৫ কোটি ৯০ লাখ এবং অ্যামেক্সে ৩৪৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। অন্য কার্ডগুলোর অংশ ছিল ১ শতাংশের কম। জুলাইয়ে বিদেশে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের মোট লেনদেন হয়েছে ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ, ডেবিট কার্ডে ৪০১ কোটি ১০ লাখ এবং প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। জুনে বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে—১৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
দেশভিত্তিক হিসাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে শীর্ষে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। জুলাইয়ে দেশটিতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডে ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে, যা মোটের ১৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। থাইল্যান্ডে ৬১ কোটি ৪০ লাখ, যুক্তরাজ্যে ৫৪ কোটি ৪০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ৩৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
বিদেশে বাংলাদেশিদের ডেবিট কার্ড ব্যবহারেও যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় গন্তব্য। জুলাইয়ে দেশটিতে ৫৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। যুক্তরাজ্যে ৫১ কোটি ৬০ লাখ, ভারতে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ, চীনে ৩৫ কোটি ৯০ লাখ এবং আয়ারল্যান্ডে ৩৫ কোটি ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। ডেবিট কার্ডে মোট ৪০১ কোটি ১০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। প্রিপেইড কার্ডে ৫৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
কার্ডের সংখ্যার দিক থেকেও প্রিপেইডের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এ কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১৬৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে ৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ। একই সময়ে দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড লেনদেন বেড়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের ব্যয় বেড়েছে ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
গত এক বছরে দেশীয় ক্রেডিট কার্ড লেনদেনে ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে লেনদেন ছিল ৩ হাজার ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। গত জুনে তা সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকায় ওঠে। জুলাইয়ে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ড লেনদেন ২০২৫ সালের আগস্টে ৮৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকায় ওঠে। জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে ৯৮৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৮টি তপশিলি ব্যাংক ও একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে অনুমোদিত মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বকেয়া বা স্থিতি রয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা।
বিজ্ঞাপন