বিজ্ঞাপন
রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মামলার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে কারাগারের গেটে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। আদালতের অনুমতি নিয়ে মঙ্গলবার রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) তাদের দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে।
আদালতে দেওয়া দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পুলিশের কাছে দায় স্বীকার করে দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকায় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। তাদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেও এখন পর্যন্ত হত্যার সুনির্দিষ্ট মোটিভ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে নগরীর দাসপাড়া (মাছুয়াপাড়া) এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পিসতুতো ও মামাতো ভাই। তাদের মধ্যে সিদ্ধার্থকেই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সন্দেহ করছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাসের বাড়ি ছিল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশেই। হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে তারা প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় বাড়িটি বিক্রি করেন। এ নিয়ে বায়না চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছিল। বাড়ির দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর সপরিবারে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
স্থানীয় একটি সোনার দোকানের মালিক বিধান চন্দ্র দাস জানান, প্রায় দেড় মাস আগে বায়না সূত্রে তিনি ওই জমি কিনেছেন।
১২ ঘণ্টায় ৩০ বার ফোন
এদিকে তদন্তকারীরা দুই আসামির মোবাইল ফোনের অস্বাভাবিক কলরেকর্ডের তথ্যও পেয়েছেন। ১৯ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৮০ ঘণ্টার কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মধ্যে মোট ৮০ বার ফোনে কথা হয়েছে।
এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ তাঁর দুটি নম্বর থেকে মুগ্ধের একটি নম্বরে ৩০ বার ফোন করেন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব কলের প্রতিটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১১ থেকে ১৭ সেকেন্ড। আবার কয়েকটি কলে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত থাকায় সন্দেহভাজনের তালিকাও আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
ফোনকলের এই অস্বাভাবিক তথ্য সামনে আসার পর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। তদন্তকারীরা এখন ওই ফোনালাপগুলোর সময়, অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করছেন।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, চারজনকে হত্যার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। এটি নিছক নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অতর্কিত হত্যাকাণ্ড—এমনটা মনে করছেন না তারা। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে ৩০ বার ফোনালাপের বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিন্নাত আলী বলেন, বুধবার দুই আসামিকে দ্বিতীয় দফায় কারাগারের গেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাঁর ধারণা, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ এখনো অনেক তথ্য গোপন করছেন।
যেভাবে ঘটেছিল হত্যাকাণ্ড
উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় বাইরে থেকে তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছোট ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)।
বিজ্ঞাপন