বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার দুবাই প্রবাসীর ৪ নম্বর রোডের বাড়িটির ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। পুলিশের অভিযানে একত্রে ধরা পড়ে ৬৩ জন বিদেশী নাগরিক। যেখানে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনসহ ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার থেকেও বিদেশীদের দ্বারা পরিচালিত একই রকম আস্তানার সন্ধান পেয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী৷ ধারণা করা হচ্ছে পর্যটন কিংবা ব্যবসায়ী সেজে এসব বিদেশীরা বাংলাদেশ প্রবেশ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজস্ব প্রতারণার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে৷ আর এসব কর্মকান্ডের সাথে বাংলাদেশের একাধিক ব্যক্তি এমন কি প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকতে পারে৷
পুলিশ বলছে, এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তারা। এ কাজে তাদের সহায়তা করেছে দেশীয় একটি চক্র। গ্রেপ্তার ৬৩ জনের পাসপোর্ট ও ভিসা তাদের কাছে নেই। এসব নথি দেশীয় একটি চক্রের সদস্যদের কাছে রয়েছে। ওই চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে এসব বিদেশী নাগরিকরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন তাই তাদের ওপরের স্তরে থাকা চক্রের সদস্যদের কাছে পাসপোর্ট গুলো জমা দেয়া হয়ে থাকতে পারে।
গতকাল বিকালে নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মেদ। তিনি জানান, খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার যে ভবনটি থেকে তাদের আটক করা হয়েছে সে ভবনটির মালিক একজন প্রবাসী। দেড় মাস আগে তারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন। আটক ৬৩ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জন নারী রয়েছে।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খুলশী থানা এলাকার জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি ভবনে অভিযান চালানো হয়। সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একটি বিশেষায়িত দল খুলশী থানা পুলিশের সহায়তায় অভিযানটি পরিচালনা করে। যৌথ অভিযানে ওই ভবন থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপালের ১ জন ও ভিয়েতনামের ১ জন নাগরিক রয়েছেন। পুলিশ জানায়, তাদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল, ৫৭টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। যেগুলো প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হতো।
অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, চীন, লাউস, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অনলাইন প্রতারণা নিয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযান চলার কারণে প্রতারকরা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন। তাদের দেশি–বিদেশি আরো সহায়তাকারী রয়েছে এবং চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা অবস্থান করছে। আটক করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৬২ জনের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ভবনটির ১৪টি ইউনিটে সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ অনলাইন প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অন্য কোনো বৈধ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ দেখাতে পারেননি। তাদের কাছে পাসপোর্ট ও ভিসাও পাওয়া যায়নি। এসব নথি দেশীয় চক্রের সদস্যদের হাতে রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা আলামতগুলোতে দেখা গেছে তারা বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট ভিজিট করেছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক পর্যায়ে ধরে ফেলা হয়েছে এবং তাদের বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং জব্দ করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষা করানো হবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কীভাবে বাংলাদেশে এসেছেন এবং তাদের ভিসার ধরন কী, তা জানতে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে পরিচালনার জন্য চক্রটির সঙ্গে দেশীয় ও বিদেশি কয়েকজন সহযোগীও রয়েছেন। এসব সহযোগীর মধ্যে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বর্তমানে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করছেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাঁচটি পেনড্রাইভ ও বিভিন্ন কোম্পানির চারটি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়। অভিযানে তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ডও উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছে।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম বলেন, গ্রেপ্তার ৬৩ জনকে শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন প্রতারণার পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হবে। ইলেকট্রনিক ডিভাইসে যেভাবে প্রতারণা : গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মুঠোফোনসহ ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে। ১৩৪টি মোবাইল, ৫৭টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এগুলো প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হতো।
কী ধরনের প্রতারণা করা হতো, জানতে চাইলে ফয়সাল আহম্মদ বলেন, কখনো নিজেরা ওয়েবসাইট খোলে, আবার কখনো বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এছাড়া ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য হ্যাক করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এসব প্রতারণার সঙ্গে কারা কীভাবে যুক্ত এবং কী পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয় পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নগর পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার ৬৩ জনকে এই চক্রের মাঠপর্যায়ের সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কঙবাজারের ঘটনার সঙ্গে খুলশীর ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে
বিজ্ঞাপন