সারাদেশ

সেকেন্ডহ্যান্ড বোর্ড, চা-বনে ক্যালরি- তবু এশিয়ান গেমসে কক্সবাজারের দুই সার্ফার

b
bd24live অনলাইন ডেস্ক
1 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
সাগরের ঢেউ তখনো ভাঙছে লাবনী পয়েন্টে। ভোরের আলো সবে ফুটেছে, আর তার মধ্যেই বোর্ড কাঁধে নিয়ে জলে নামছেন দুই তরুণ-তরুণী- মো. মান্নান আর ফাতেমা আক্তার। প্রতিদিনের এই দৃশ্য আজ আর নিছক অনুশীলন নয়; এ যেন এক লড়াইয়ের প্রস্তুতি, যে লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ শুধু ঢেউ নয়, নিজেদের ফেডারেশনও। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি-নাগোয়ায় শুরু হচ্ছে ২০তম এশিয়ান গেমস। প্রথমবারের মতো এই আসরে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ সার্ফিং দল, আর দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন কক্সবাজারের দুই সার্ফার- মান্নান (২০) ও ফাতেমা (১৬)। কিন্তু ইতিহাস গড়ার এই মুহূর্তে তাদের মনে স্বস্তি নেই। কারণ, যার হাত ধরে তারা এতদূর এসেছেন, সেই কোচ রাশেদ আলম তাদের সঙ্গে জাপানে যেতে পারছেন না। গুরু-শিষ্যের বন্ধন যেখানে ভেঙে যায় প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে সার্ফিং করছেন মান্নান। শুরু থেকেই তার কোচ রাশেদ আলম। দেশ-বিদেশের নানা প্রতিযোগিতায় তার হাত ধরেই অংশ নিয়েছেন তিনি। মান্নান বলেন, তার উৎসাহতেই এখনো আমি সার্ফিং করছি। আর সেই কোচই যদি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতায় পাশে না থাকেন, সেটি আমার জন্য বেদনাদায়ক। ফাতেমার কণ্ঠেও একই হতাশা। সাত বছর ধরে রাশেদ আলমের কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তিনি। তার ভাষ্য, সার্ফিংয়ের সময় দিকনির্দেশনা, ঢেউ, আবহাওয়া ও পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে কোচই সবচেয়ে ভালোভাবে গাইড করতে পারেন। অথচ দলের সঙ্গে যে লাইফগার্ডকে বেছে নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে কখনো অনুশীলনই হয়নি তাদের। তিনি বলেন, রাশেদ ভাই না হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়া তো দূরের কথা, আমার লেখাপড়াই হতো না। যিনি সাত বছর ধরে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, আমার পড়াশোনার খরচও যিনি বহন করেন, তাকেই একরকম হঠকারী সিদ্ধান্তে বাদ দিয়েছে কয়েকজন লোভী মানুষ। রাশেদ আলমের জায়গায় দলের সঙ্গে যাচ্ছেন বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের ফোকাল পারসন সাইফুল্লাহ সিফাত, যিনি নিজেকে দাবি করছেন কোচ হিসেবেই। তার ভাষ্য, অ্যাসোসিয়েশন একজনকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই তিনি যাচ্ছেন। তার দাবি, এই সার্ফারদের তিনিই কোচিং করান। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। গত শুক্র ও শনিবার পরপর দুই দিন লাবনী পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশ সার্ফ গার্লস অ্যান্ড বয়েজ ক্লাবের সদস্যরা অনুশীলন করছেন, সঙ্গে ফাতেমা ও মান্নানও আছেন। তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন রাশেদ আলম নিজেই। আশপাশে কোথাও দেখা মেলেনি সাইফুল্লাহ সিফাতের। রাশেদ আলম বলেন, বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের কোচ হিসেবে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন তিনি। শুরুতে দলের সঙ্গে চারজন যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হঠাৎ জানানো হয়, যাবেন একজনই। এ কারণেই তার যাওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমি শুধু এদের কোচ নই, এদের ক্লাবেরই অভিভাবক। সীমিত সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির মধ্যেও সার্ফাররা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য দেশ যেখানে কোচসহ পূর্ণাঙ্গ দল নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের সার্ফারদের কোচ ছাড়াই পাঠানো হচ্ছে। এতে পারফরম্যান্স নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জম হোসেন চৌধুরী রোকনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়, আর তিনি দেশের বাইরে থাকায় হোয়াটসঅ্যাপে শুক্র ও শনিবার একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি। নেই ব্যায়ামাগার, নেই চেঞ্জিং রুম, নেই উন্নতমানের সার্ফবোর্ড, নেই সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। তবু খেলাটিকে ভালোবেসেই বাংলাদেশের সার্ফিংকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কক্সবাজারের সার্ফাররা। বিদেশি সার্ফারদের দান করা পুরোনো বোর্ড দিয়েই চলে তাদের অনুশীলন। ফাতেমা বলেন, বিদেশি সার্ফাররা কাস্টোমাইজড বোর্ডে অনুশীলন করেন, আর আমরা শিখি পুরোনো বোর্ডে। তাই শুরু থেকেই আমরা অনেকটা পিছিয়ে থাকি। যে বোর্ড নিয়ে তিনি প্রতিদিন সাগরে নামেন, সেটিও সেকেন্ডহ্যান্ড। একটি বোর্ড দিয়ে চলে দুই বছরের সার্ফিং। বিদেশের বন্ধুদের কাছ থেকে এসব বোর্ড ও সরঞ্জাম জোগাড় করেই কোচ রাশেদ গড়ে তুলেছেন ক্লাবটি। গত বছর চেন্নাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাপে অংশ নেওয়া কক্সবাজারের আরেক নারী সার্ফার মহিমা আক্তার মিলি বলেন, ভারতে তিনি দেখেছেন, সার্ফারদের জন্য জিমসহ নানা সুবিধা আছে। অথচ আমাদের কাপড় পাল্টানোর জায়গাও নেই। খুব কষ্ট করে আন্তর্জাতিক মঞ্চের জন্য নিজেদের তৈরি করি, কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বারবার হেরে যাই। এভাবেই হারিয়ে যান কক্সবাজারের সার্ফাররা। মান্নানের কথাতেও একই আক্ষেপ- সেকেন্ডহ্যান্ড সরঞ্জাম নিয়েই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে তাদের, যেখানে অন্য দেশের প্রতিযোগীরা নামছেন নতুন ও আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে। রাশেদ আলমের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো, ভালো মানের সরঞ্জাম সরবরাহ, পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা ও একটি আধুনিক সার্ফিং ক্লাব গড়ে তুলতে পারলে এই খেলায় বাংলাদেশ আরও অনেক দূর এগোতে পারত। এই বৈষম্যই আজ দেশের সার্ফারদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চা-বনেই যাদের শক্তির উৎস কক্সবাজার শহরের বাদশাঘোনা এলাকায় থাকেন ফাতেমা ও মিলি। সেখান থেকে সমুদ্রসৈকতের লাবনী পয়েন্টের দূরত্ব প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার। এই পথ প্রতিদিন সকালে হেঁটেই পাড়ি দেন তারা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢেউয়ের সঙ্গে লড়ে লোনা জলে রপ্ত করেন সার্ফিং। এরপর তীরের ধারের ক্লাবে ফেরেন দুই বান্ধবী। ক্লাবের পাশের চায়ের দোকান থেকে কখনো চা-বন, কখনো দু-একটা সিঙাড়া- এটুকুই তাদের বিশ্রামের উপকরণ। বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে এশিয়ান গেমসে নামার আগে এভাবেই নিজেকে গড়ে তুলছেন ফাতেমা। বছরের পর বছর এমন সাদামাটা খাবার খেয়েই বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা তোলার প্রস্তুতি নেন কক্সবাজারের সার্ফাররা- যা ক্ষুধা মেটালেও পূরণ করতে পারে না প্রয়োজনীয় ক্যালরি। শনিবার সকালে সার্ফিং শেষে ক্লান্ত ফাতেমা তখনো ড্রেস বদলাননি, চা-বন ভিজিয়ে খাচ্ছিলেন। স্মিত হেসে বলেন, সার্ফিং শেষে খাবার বলতে চা-বন, রুটি কিংবা দু-একটা সিঙাড়া। আমাদের তো কোনো স্পনসর নেই, সরকারের কোনো সহায়তাও নেই। মান্নান জানান, এই খাবারের টাকাটাও দেন কোচ রাশেদ। তার চাকরির আয়ে প্রায় ত্রিশজন ছেলেমেয়ে সার্ফিং শেখেন। তাই ক্যালরি পূরণের চিন্তা তাদের কাছে বিলাসিতাই। রাশেদ আলম বলেন, তিনি একটি এনজিওতে চাকরি করেন। সেই আয়েই তার পরিবার চলে, আর যা অবশিষ্ট থাকে তা ব্যয় করেন ক্লাবের পেছনে। তবে ফোকাল পারসন সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়া দুজনের প্রস্তুতির খরচ অ্যাসোসিয়েশন বহন করবে, তবে তাতে সময় লাগবে। প্রত্যেককে খরচের টাকা দেওয়া হবে বলে জানালেও কবে নাগাদ দেওয়া হবে, তা বলতে পারেননি তিনি।
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>