বিজ্ঞাপন
পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে যখন জানুয়ারি দিয়ে নতুন বছর শুরু হয়, তখন ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়ার মানুষ নতুন বছরকে স্বাগত জানায় সেপ্টেম্বর মাসে। আরও অবাক করার মতো বিষয়—তাদের ক্যালেন্ডারে আছে ১৩টি মাস! আর নববর্ষের দিন শিশুরা নতুন পোশাক পরে ফুল হাতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে গান গায়।
ইরিত্রিয়া পূর্ব আফ্রিকার একটি দেশ। এর পূর্বে রয়েছে লোহিত সাগর, পশ্চিমে সুদান, দক্ষিণে ইথিওপিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্বে জিবুতি। রাজধানী আসমারা। দেশটির সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যবহৃত Ge'ez বা Ethiopian calendar গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে প্রায় ৭–৮ বছর পিছিয়ে। এই ক্যালেন্ডারে ১২টি মাসের প্রতিটিতে ৩০ দিন করে থাকে। এরপর আসে ১৩তম মাস—Pagume। এতে সাধারণত ৫ দিন এবং লিপ ইয়ারে ৬ দিন থাকে। ফলে আমাদের ক্যালেন্ডারে যখন ২০২৬, তাদের ক্যালেন্ডারে নতুন বছর শুরু হচ্ছে ২০১৯ দিয়ে। ২০২৬ সালের Geez New Year বা Enkutatash পড়েছে ১১ সেপ্টেম্বর।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—এই ক্যালেন্ডার ইথিওপিয়ায় সরকারি ক্যালেন্ডার হলেও ইরিত্রিয়ায় এর ব্যবহার মূলত সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।
নববর্ষের নাম ‘Enkutatash’ কেন?
নামটির অর্থই বেশ চমৎকার—‘রত্নের উপহার’ বা ‘Gift of Jewels’। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইথিওপিয়ার ঐতিহ্যবাহী রানী শেবা রানি-কে ঘিরে একটি কিংবদন্তি। কথিত আছে, জেরুজালেম থেকে রাজা সলোমনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি নিজ দেশে ফিরে এলে তাকে মূল্যবান রত্ন দিয়ে স্বাগত জানানো হয়েছিল। সেই ‘রত্নের উপহার’ থেকেই Enkutatash নামটির প্রচলন। এটি অবশ্য ঐতিহ্যগত কাহিনি, প্রামাণ্য ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে নয়।
জানুয়ারিতে নয়, সেপ্টেম্বরে নতুন বছর। এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে ক্যালেন্ডারের দারুণ এক সম্পর্ক। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পূর্ব আফ্রিকার দীর্ঘ বর্ষাকাল শেষের দিকে আসে। আকাশ পরিষ্কার হয়, চারদিকে সবুজ প্রকৃতি এবং মাঠে ফুটতে শুরু করে উজ্জ্বল হলুদ ফুল। এই পরিবর্তনকে নতুন জীবন ও নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ, এখানে নতুন বছর শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়—বর্ষা শেষে প্রকৃতির নতুন রূপও নববর্ষের অংশ।
হলুদ ফুলই যেন নতুন বছরের প্রতীক
Enkutatash-এর অন্যতম আকর্ষণ Adey Abeba নামে পরিচিত হলুদ বুনোফুল। নতুন বছরের সময় ইথিওপিয়ার উঁচু অঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলে এই ফুল ফুটে চারপাশকে হলুদ করে তোলে। তাই নতুন বছরের শুভেচ্ছায় ফুলের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা নতুন পোশাক পরে হাতে ফুল নিয়ে বাড়ি বাড়ি যায়। গান গায়, শুভেচ্ছা জানায় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিনিময়ে ছোট উপহার বা টাকা পায়।
ভাবুন তো—আমাদের দেশে ঈদের সময় শিশুরা যেমন নতুন পোশাক পরে আনন্দ করে, তেমনই সেখানে নতুন বছর মানেই শিশুদের নতুন পোশাক, গান আর ফুলের উৎসব।
নববর্ষের আগের রাতে জ্বলে আগুন
Enkutatash-এর আগের রাতেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। অনেক পরিবার শুকনো কাঠ জড়ো করে Chibo নামে মশাল বা আগুন জ্বালায়। আগুন ঘিরে চলে গান ও নাচ। পুরোনো বছরের দুঃখ-কষ্ট পেছনে ফেলে নতুন বছরকে আলো ও আশার সঙ্গে স্বাগত জানানোর প্রতীক হিসেবে এই আগুনকে দেখা হয়। অর্থাৎ, তাদের নববর্ষের আগের রাতটা অনেকটা আমাদের বিভিন্ন উৎসবে প্রদীপ বা আগুন জ্বালিয়ে নতুন সূচনার প্রতীক তৈরির মতো।
মেয়েদের গান, ফুল আর ছোট্ট উপহার
নববর্ষের সকালে একটি মিষ্টি ঐতিহ্য দেখা যায়। ছোট মেয়েরা দল বেঁধে নতুন পোশাক পরে বাড়ি বাড়ি যায়। তারা Abebayehosh নামে পরিচিত নববর্ষের গান গায় এবং হাতে থাকে হলুদ ফুল। বাড়ির মানুষ তাদের স্বাগত জানান এবং অনেক সময় ছোট উপহার বা টাকা দেন। ছেলেদেরও কিছু অঞ্চলে নববর্ষ উপলক্ষে গান ও নিজেদের আঁকা ছবি উপহার দেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে।
নতুন বছর মানেই জমজমাট খাবার
উৎসব মানেই খাবার—এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। পরিবার ও আত্মীয়স্বজন একত্র হন। জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে Injera—এক ধরনের টক স্বাদের নরম ফারমেন্টেড রুটি—এবং Doro Wat, মসলা দিয়ে রান্না করা মুরগির ঝোল, যা সাধারণত ডিমের সঙ্গেও পরিবেশন করা হয়। আর আছে আরেকটি বিশেষ ব্যাপার—কফি।
কফি এখানে শুধু পানীয় নয়, সামাজিক অনুষ্ঠান
ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়ায় কফি সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ অনুষ্ঠানে কাঁচা কফির দানা ভেজে, গুঁড়া করে ঐতিহ্যবাহী পাত্র Jebena-তে কফি তৈরি করা হয়। অতিথিদের সামনে কফি পরিবেশন করাও এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার। তাই Enkutatash-এর সময় পরিবারের মানুষ ও অতিথিদের সঙ্গে বসে কফি পান করাও উৎসবের অন্যতম আনন্দ।
সবচেয়ে মজার বিষয়—তাদের ‘এক বছর’ও আমাদের মতো নয়! ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়ার Geez calendar-এর সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো ১৩তম মাস। ১২ মাস শেষ হওয়ার পর তারা হঠাৎ আরেকটি ছোট মাসে ঢুকে পড়ে—Pagume। এই মাসে থাকে মাত্র পাঁচ দিন। আর লিপ ইয়ারে ছয় দিন। অর্থাৎ, যেখানে আমরা ভাবি—১২ মাসে এক বছর, সেখানে তাদের ক্যালেন্ডার বলে—১২ মাস + আরও একটি ছোট মাস = এক বছর!
শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়
Enkutatash-এর সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মীয় ঐতিহ্যের সম্পর্ক থাকলেও এটি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়। সরকারি ও সাংস্কৃতিক সূত্রগুলো একে নতুন বছর, পারিবারিক মিলন, প্রকৃতির নবজাগরণ এবং সামাজিক শুভেচ্ছার উৎসব হিসেবেও বর্ণনা করে। ধর্মীয় আয়োজনে প্রার্থনা, স্তোত্র ও শোভাযাত্রা হতে পারে; আবার অন্যদিকে সাধারণ পরিবারে চলে খাবার, গান, ফুল, উপহার ও শুভেচ্ছা বিনিময়।
পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন নতুন বছর মানেই আতশবাজি, কাউন্টডাউন আর জানুয়ারির প্রথম দিন, তখন পূর্ব আফ্রিকার এই অঞ্চলে নতুন বছর আসে বর্ষা শেষে পরিষ্কার আকাশ, হলুদ ফুল, নতুন পোশাক, শিশুদের গান আর ১৩ মাসের ক্যালেন্ডার নিয়ে। এটাই Geez New Year-এর সবচেয়ে সুন্দর দিক—এখানে নতুন বছর শুধু সময়ের পরিবর্তন নয়; প্রকৃতি, পরিবার, সংস্কৃতি ও নতুন আশাকে একসঙ্গে বরণ করার উৎসব।
সূত্র: এলাবোট ইথোপিয়া
বিজ্ঞাপন