বিজ্ঞাপন
নাজমুন নাহার
পৃথিবীর ভ্রমণের পথে মলডোভা আমার জন্য ছিল এক শান্ত, নির্মল এবং অন্যরকম অভিজ্ঞতা। পূর্ব ইউরোপের ছোট্ট এই দেশটিতে পা রাখতেই চারদিকে সবুজ গাছপালা, রঙিন ফুল আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করে।
রাজধানী কিশিনাউয়ের প্রশস্ত রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, শহরটি যেন প্রকৃতির বুকের ওপর খুব যত্ন করে গড়ে তোলা হয়েছে। ব্যস্ততা আছে, কিন্তু কোলাহল নেই, আধুনিকতা আছে, কিন্তু প্রকৃতিকে মায়ায় ভরা এই দেশ যেন স্বর্গীয় শান্তির দেশ।
চারদিকে চোখে পড়ে সোভিয়েত আমলের বিশাল বিশাল ভবন। এই ভবনগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়, বরং ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। একসময় মলডোভা সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটি নতুন পথচলা শুরু করলেও সেই সময়ের স্থাপত্য, স্মৃতিস্তম্ভ ও নগর পরিকল্পনার ছাপ আজও স্পষ্ট। পুরোনো ইতিহাস আর নতুন জীবনের এই মিলন মলডোভাকে অন্যরকম একটি পরিচয় দিয়েছে। রাজধানী পুরো কিশিনাউ শহরটাই অপূর্ব।
আরও পড়ুন
পর্তুগালে বাংলাদেশির মৃত্যু হলে লাশ দেশে পাঠাতে করণীয়
মলডোভা থেকে আমি সড়কপথে প্রিদনেস্ত্রোভিয়ার দিকে যাত্রা করি। পথে একের পর এক ছোট ছোট জনপদ আর গ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপ চোখে পড়ে। বুবুইয়েচি, ভারনিৎসা, পার্কানি এবং আরও অনেক ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে মনে হচ্ছিল, যেন সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে।
রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ, রঙিন ফুল, বিস্তীর্ণ আঙুরের বাগান, সূর্যমুখীর ক্ষেত আর সবুজ মাঠ আমার পুরো পথটাকে অসাধারণ সুন্দর করে তুলেছিল। সীমান্তের দিকে এগোতেই পরিবেশে এক ভিন্ন আবহ অনুভব করলাম। ইতিহাস, রাজনীতি আর বাস্তবতার এক অদ্ভুত মিশেল যেন এই পথের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে।
মলডোভা আয়তনে ছোট হলেও ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। রোমানিয়া ও ইউক্রেনের মাঝখানে অবস্থিত এই দেশটি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ওয়াইন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। বিস্তীর্ণ আঙুরের বাগান, উর্বর কৃষিজমি এবং শান্ত গ্রামীণ জীবন মলডোভাকে দিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য। মধ্যযুগের মহান শাসক স্তেফান চেল মারের বীরত্বগাথা আজও এই দেশের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর নেতৃত্ব ও দেশপ্রেম মলডোভার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
মলডোভায় ঘুরে বুঝলাম, ছোট্ট এই দেশের দেখার মতো জায়গারও কোনো কমতি নেই। রাজধানী কিশিনাউয়ের সবুজ উদ্যান, ঐতিহাসিক গির্জা, বিজয় তোরণ এবং জাদুঘরগুলো ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ সাক্ষ্য বহন করে। শহরের বাইরে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভূগর্ভস্থ ওয়াইন ভাণ্ডার মিলেশ্তি মিচি ও ক্রিকোভা। পাহাড় কেটে তৈরি প্রাচীন গুহা মঠের জন্য বিখ্যাত ওরহেইউল ভেকি এবং মধ্যযুগের ঐতিহাসিক সোরোকা দুর্গও দর্শনার্থীদের জন্য অসাধারণ আকর্ষণ।
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বিস্তীর্ণ আঙুরের বাগান, সূর্যমুখীর ক্ষেত এবং শান্ত গ্রামীণ প্রাকৃতিক দৃশ্য সত্যিই মনকে ছুঁয়ে যায়।
মলডোভার মানুষের আন্তরিকতা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। ছোট্ট এই দেশটি আমাকে নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে যে, একটি দেশের সৌন্দর্য শুধু উঁচু ভবন বা আধুনিক নগরায়ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সরলতা, প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য, ইতিহাসের স্মৃতি এবং সংস্কৃতির গভীরতাই একটি দেশের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
পৃথিবীর নানা দেশ ভ্রমণের স্মৃতির ভাণ্ডারে মলডোভা আমার কাছে এক শান্ত, সবুজ, ফুলে ঘেরা এবং ইতিহাসে সমৃদ্ধ এক অনন্য অধ্যায় হয়ে রইলো।
আর লাল সবুজের পতাকা এর প্রতি স্থানে নিয়ে যাওয়া সেতো আমার কাছে প্রিয় মাতৃভূমির পরিচয়কে পৃথিবীর মানচিত্রে ইতিহাস করে রাখা। এভাবেই চলছে আমার অভিযাত্রা পৃথিবীর এক দেশ থেকে আরেক দেশে। বিশ্ব অভিযাত্রার প্রতিটি স্টেপে আমি পৃথিবীকে বলছি বাংলাদেশ
এমআরএম
বিজ্ঞাপন