চীনে চলছে আন্তর্জাতিক ‘রোবট অলিম্পিক’। মানব অলিম্পিকের মতো এখানেও প্রতিযোগিতা হচ্ছে। তবে প্রায় সব পদকই জিতে নিচ্ছে চীনের দল।
গত এক দশকে চীনে রোবটের বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা হচ্ছে, যা দেশটির দ্রুত বিকাশমান এই খাতের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে এই খাতের সাফল্য চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।
একসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দল ও শখের রোবট নির্মাতারা রোবট গেমসের আয়োজন করতে। একটা সময় পর্যন্ত তা কৌতূহল উদ্দীপক ছিল।
কিন্তু এখন তা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত জাতীয় প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও তা নিজেদের তৈরি পণ্যের বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর পরীক্ষা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শুধু প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য বাস্তবে কী কাজে লাগতে পারে, তা দেখানোর সুযোগ মিলছে এখানে।
গত শনিবার বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। এখন পর্যন্ত আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়।
কীভাবে এসব প্রতিযোগিতা এবং এতে অংশ নেওয়া প্রযুক্তি বিকশিত হয়েছে, তার একটি সময়রেখা নিচে তুলে ধরা হলো।
তুলনামূলকভাবে কম বাজেটের আয়োজনে চীনে রোবোটিকস প্রতিযোগিতার শুরুটা হয়েছিল। এসব প্রতিযোগিতায় শিল্প খাতের একটি সংগঠন ও ফুজিয়ান প্রদেশের স্থানীয় সরকার সহায়তা দিত। প্রতিযোগীদের বেশির ভাগই ছিল কলেজের দল। পরবর্তী সময়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জমকালো প্রদর্শনী হয়ে ওঠার আগে এসব আয়োজন ছিল অনেকটা বিজ্ঞান প্রকল্পের মতো।
এমনই একটি প্রদর্শনীতে ছোট চাকার রোবটগুলো ফুটবলের একটি প্রতিযোগিতামূলক সংস্করণে অংশ নিয়েছিল। সংঘর্ষ এড়ানো ও বল খুঁজে বের করার জন্য রোবটগুলোতে সীমিত পরিসরে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল।
২০১৫ সালে বেইজিংয়ে প্রথম ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে রোবোটিকস খাত জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়।
এর এক বছর আগে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং রোবোটিকসকে উন্নত উৎপাদন শিল্পের ‘মুকুটের রত্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
২০১৫ সালের প্রদর্শনীতে চলনশীল বিভিন্ন রোবট ব্যাডমিন্টন খেলার প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিল। রোবটগুলো শাটলকক (ব্যাডমিন্টনের বল) অনুসরণ করে তা ফিরিয়ে দিচ্ছিল। এ প্রদর্শনী দর্শকদের বেশ আকর্ষণ করেছিল। তবে এতে প্রযুক্তিগতভাবে বড় কোনো অগ্রগতি ছিল না।
এ ধরনের রোবটগুলো ২০১০-এর দশকে তৈরি দূরত্ব ও ছবিভিত্তিক সেন্সরের ওপর নির্ভর করত। পাশাপাশি কোনো বস্তুর গতিপথ অনুমান করার পুরোনো একটি প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হতো। ১৯৯০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গবেষকেরা এই প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছিলেন।

২০২৩ সালের মধ্যে ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর উদ্ভাবন তুলে ধরা ও নিজেদের পণ্য নিয়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি করার বড় একটি আয়োজনে পরিণত হয়।
একই সময়ে রোবট তৈরিতে কম খরচের কারণে চীনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার বিষয়টিও সামনে আসতে থাকে।
শাওমির রোবট কুকুর ‘সাইবারডগ’ দেখতে সেখানে ভিড় জমিয়েছিলেন দর্শকেরা। তাঁদের অনেকেই স্মার্টফোনে এর ভিডিও ধারণ করছিলেন।
শখের রোবট নির্মাতাদের জন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রথম বাজারে আনা সাইবারডগের দাম ছিল ১ হাজার ৫০০ ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকা)। এর বিপরীতে বোস্টন ডায়নামিকসের চার পা-ওয়ালা রোবট ‘স্পট’-এর দাম ছিল ৭৫ হাজার ডলারের বেশি (প্রায় ৯১ লাখ ৫০ হাজার টাকা)।
কম বাজেটের আয়োজনে চীনে রোবোটিকস প্রতিযোগিতার শুরু। ফুজিয়ান প্রদেশের স্থানীয় সরকার ও শিল্প সংগঠনের সহায়তায় কলেজের দলগুলো অংশ নিত। আয়োজন ছিল বিজ্ঞান প্রকল্পের মতো।
২০২৫ সালের এপ্রিলে বেইজিংয়ে বিশ্বের প্রথম রোবট হাফ ম্যারাথনে মানব দৌড়বিদদের পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায় হিউম্যানয়েড রোবট।
প্রকৌশলীরা রোবটগুলোর পাশে পাশে দৌড়াচ্ছিলেন, যাতে প্রয়োজন হলে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। দৌড় শুরু করা রোবটগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি শেষ পর্যন্ত দৌড় শেষ করতে পেরেছিল। কিছু রোবট শুরুর লাইনে পড়ে যায়। অন্যগুলো কয়েক মিটার এগিয়ে রেলিংয়ে ধাক্কা খায়।
এক বছরের মধ্যে রোবটগুলো অনেক উন্নত হয়। দ্বিতীয় বেইজিং হাফ ম্যারাথনে ইউনিট্রির ‘এইচ১’ রোবট কোনো মানুষের সহায়তা ছাড়াই ফিনিশিং লাইনের দিকে ছুটে যায়। এ সময় তাকে দেখাশোনা করার জন্য পাশে কেউ ছিল না।
২০২৬ সালের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ১০০টির বেশি রোবট দলের মধ্যে ৪৭টি দৌড় শেষ করেছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

সবচেয়ে নজরকাড়া ঘটনা ছিল চীনের স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অনারের তৈরি ‘ফ্ল্যাশ’ নামের একটি হিউম্যানয়েড রোবটের পারফরম্যান্স। রোবটটি নিজে নিজেই ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হাফ ম্যারাথন শেষ করে। মাত্র এক মাস আগে মানুষের করা বিশ্ব রেকর্ডের চেয়ে এই সময় প্রায় ৭ মিনিট কম।
বিশ্লেষক ও প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীদের মতে, সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি সরকারি ভর্তুকির কারণে রোবট তৈরির উপকরণের দাম কমে যাওয়ায় এই দ্রুত ও ব্যাপক উন্নতি সম্ভব হয়েছে।
এই অগ্রগতির পেছনে সরকারের সরাসরি ভূমিকা ছিল।
রোবোটিকস খাত নিয়ে বেইজিংয়ের ২০২১ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ভর্তুকি, গবেষণায় করছাড় ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ওই পরিকল্পনায় চীনকে ‘রোবোটিকস প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বৈশ্বিক উৎস’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
রোবোটিকস খাত নিয়ে বেইজিংয়ে ২০২১ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ভর্তুকি, গবেষণায় করছাড় ও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। চীনকে রোবোটিকস প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বৈশ্বিক উৎস হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য।
২০২৬ সালে ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে রোবটের হাত নিয়ে একটি নতুন প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়েছে।
এতে রোবট কতটা দ্রুত ও নিখুঁতভাবে বিভিন্ন কাজ করতে পারে, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। যেমন স্ক্রু শক্ত করে লাগানো, বোতল খোলা এবং চিমটি দিয়ে ছোট ছোট পুঁতি তুলে নেওয়া।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মানুষের মতো নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে এমন হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির ক্ষেত্রে হাত তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গেমসে কাজভিত্তিক এসব প্রতিযোগিতা যুক্ত করার পেছনে আরেকটি কারণও আছে। দ্রুত বাড়তে থাকা এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হলো রোবটের তৈরি প্রোটোটাইপগুলো বাস্তব জীবনেও কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তা প্রমাণ করা।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি গত শনিবার জানিয়েছে, অনারের তৈরি ‘লাইটনিং’ নামের হিউম্যানয়েড রোবট ১০০ মিটার দৌড়েছে ৯ দশমিক ৩২ সেকেন্ডে। গতকাল বেইজিংয়ে দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস শুরুর দিন আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষায় এই দৌড় দেয় রোবটটি। এর মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে বার্লিনে বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে উসাইন বোল্টের করা ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় লাইটনিং।
সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b>
|
নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>