বিজ্ঞাপন
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা দিতে চিকিৎসকদের সরাসরি কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। তবে বিভিন্নভাবে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন।
তার দাবি, আহত শিক্ষার্থীদের প্রতি অতিরিক্ত সহমর্মিতা দেখানো কিংবা চিকিৎসাসেবায় বেশি আন্তরিকতার অভিযোগ তুলে তাকে ঢামেক থেকে বিশেষজ্ঞ বিষয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পদে দূরবর্তী মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়।
তিনি বলেন, ১৮ থেকে ২০ জুলাইয়ের নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে ঢামেক হাসপাতালের সব অপারেশন থিয়েটার জরুরি ভিত্তিতে চালু রাখা হয়েছিল। নির্ধারিত অস্ত্রোপচার স্থগিত করে হাজারো আহতের চিকিৎসা নিশ্চিত করেন চিকিৎসকরা। ওই সময় সবচেয়ে বেশি আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা দেওয়া হয় ঢামেকে, যেখানে চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছিল।
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢামেক হাসপাতালের তৎকালীন চিকিৎসক শহিদুল ইসলাম আকন সেই সময়ের চিকিৎসাসেবা, প্রশাসনিক পরিবেশ, চিকিৎসকদের ওপর থাকা পরোক্ষ চাপ এবং নিজের বদলির অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইয়াসির আরাফাত রিপন।
জাগো নিউজ: জুলাই আন্দোলনের সময় আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকদের কোনো ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল কি?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: সরাসরি চিকিৎসা দিতে কোনো বাধা ছিল না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন। তবে একটি পরোক্ষ চাপ বা মানসিক বাধা ছিল। কেউ কেউ আহত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলতেন কেন তারা আন্দোলনে গিয়েছিলেন, সরকার পতনের আন্দোলনে কেন অংশ নিয়েছিলেন। এসব মন্তব্য চিকিৎসকদের ওপরও প্রভাব ফেলত।
জাগো নিউজ: এই পরোক্ষ চাপের বিষয়টি কীভাবে অনুভব করেছেন?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: ১৮, ১৯ ও ২০ জুলাইয়ের ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার কয়েক দিন পর উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন। রোগীদের দেখার পর এক বৈঠকে বলা হয়েছিল, আহতদের চিকিৎসা দিতে হবে, তবে অতিরিক্ত সহানুভূতি বা আগ্রহ দেখানোর প্রয়োজন নেই। এটিকে আমি চিকিৎসকদের প্রতি একটি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে দেখেছি।
জাগো নিউজ: চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: কিছু রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি অভিযোগ করেছিলেন, কয়েকজন চিকিৎসক আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পক্ষে মত প্রকাশ করছেন। এটিকে তারা সমর্থনযোগ্য মনে করেননি।
জাগো নিউজ: আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কী ছিল?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: টানা দায়িত্ব পালনের সময় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের জন্য আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু সেটিকেও ‘অতিরিক্ত আগ্রহ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এরপর ২৫ জুলাই আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি) পদ থেকে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে বায়োকেমিস্ট্রি পদের বিপরীতে বদলি করা হয়। আমার বিশেষজ্ঞ বিষয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। একইভাবে আরও কয়েকজন চিকিৎসককে দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছিল। আমার কাছে এটি শাস্তিমূলক বদলি বলেই মনে হয়েছে।
আরও পড়ুন
জুলাই আন্দোলনে কয়েকজনকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না
জাগো নিউজ: এই বদলির মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে আপনি মনে করেন?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: আমার ধারণা, বার্তাটি ছিল—চিকিৎসা দেওয়া যাবে, কিন্তু আহত শিক্ষার্থীদের প্রতি অতিরিক্ত সহমর্মিতা বা সমর্থন দেখানো যাবে না। তা না হলে বদলির মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের শান্তি সমাবেশে অংশ নেওয়ার বিষয়েও চাপ ছিল। অংশ না নিলে দূরবর্তী স্থানে বদলির আশঙ্কা দেখানো হয়েছিল।
জাগো নিউজ: ১৮ থেকে ২০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতি কেমন ছিল?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: ওই সময়ের পরিস্থিতি ছিল নজিরবিহীন। শুরুতে প্যালেট ইনজুরির রোগী বেশি এলেও ১৮ জুলাই বিকেল থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত বুলেট ইনজুরির রোগী দ্রুত বাড়তে থাকে। নিহত ও গুরুতর আহতের সংখ্যাও তখন অনেক বেশি ছিল। সাধারণ সব নির্ধারিত অস্ত্রোপচার বন্ধ রেখে হাসপাতালের সব অপারেশন থিয়েটার শুধুমাত্র জরুরি আহতদের চিকিৎসার জন্য চালু রাখা হয়েছিল। এতে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
জাগো নিউজ: হাসপাতালে রোগীর চাপ কতটা ছিল?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: রোগীর চাপ এতটাই বেশি ছিল যে কোথাও পা রাখার জায়গা ছিল না। জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, বারান্দা, সিঁড়ি-সব জায়গা আহতদের দিয়ে পূর্ণ ছিল। পরে রোগীদের বার্ন ইউনিট, সার্জারি ও অর্থোপেডিকসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। ২০ জুলাই সবচেয়ে বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছিল।
আরও পড়ুন
পাঁচ আগস্টের দুই বছর: অর্জনের স্বীকৃতি, অপূর্ণতার প্রশ্ন
জাগো নিউজ: চিকিৎসকদের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: আমি মনে করি, সেই সময় চিকিৎসকদের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেউ বেশি আগ্রহ নিয়ে, কেউ কম আগ্রহ নিয়ে—সবাই মিলে দায়িত্ব পালন করেছেন। হাসপাতালের সব অপারেশন থিয়েটার একসঙ্গে চালু রেখে যেভাবে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়েছে।
জাগো নিউজ: বর্তমানে আপনার দায়িত্ব কী?
অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন: বর্তমানে আমি অধ্যাপক, স্পাইন সার্জারি; ওএসডি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পাশাপাশি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সংযুক্ত আছি। সেখানে স্পাইন সার্জারির কোনো নির্দিষ্ট পদ নেই; ওএসডি হিসেবে আমাকে সেখানে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ইএআর/এমআইএইচএস/
বিজ্ঞাপন