বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক হামলার ৮১তম বার্ষিকী পালন করছে জাপান। এ উপলক্ষে হিরোশিমা ও নাগাসাকির বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা দেশটির সামরিক শক্তি বৃদ্ধির নীতির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমায় এবং তিন দিন পর নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। হিরোশিমায় প্রথম বিস্ফোরণেই প্রায় ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পরবর্তী সময়ে বিকিরণের কারণে আরও বহু মানুষ প্রাণ হারান।
জাপান কনফেডারেশন অব এ-অ্যান্ড এইচ-বোমা সারভাইভার্স অর্গানাইজেশনস (নিহন হিদানকিও)-এর সহকারী মহাসচিব মাসাকো ওয়াদা বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান শান্তিবাদী সংবিধান গ্রহণ করেছিল এবং আর কখনও যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করেছিল।
নাগাসাকি হামলার সময় মাত্র এক বছর বয়সী ওয়াদা অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সেই আস্থা নষ্ট করছে। তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে, অস্ত্র রপ্তানির বিধিনিষেধ শিথিল করেছে এবং সামরিক বাহিনীর ভূমিকা আরও বিস্তৃত করেছে।
হিরোশিমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ৮৪ বছর বয়সী মাসাশি ইয়েশিমা বলেন, জাপানের বর্তমান সামরিক প্রস্তুতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা দেশটিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি।
মাত্র তিন বছর বয়সে হিরোশিমার বিস্ফোরণের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন ইয়েশিমা। বিস্ফোরণে তার বাড়ির সব জানালার কাচ ভেঙে যায় এবং তার মা আহত হন। পরে তিনি থাইরয়েড ক্যানসারে আক্রান্ত হন, যা পারমাণবিক বিকিরণজনিত রোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তার বাবাও কণ্ঠনালীর ক্যানসারে মারা যান।
তিনি বলেন, তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের অজুহাতে জাপান যেভাবে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে এবং অস্ত্র রপ্তানির নিয়ম শিথিল করছে, তা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। তার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে এবং সেটি পারমাণবিক যুদ্ধেও রূপ নিতে পারে।
বর্তমানে জাপানের পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের গড় বয়স প্রায় ৮৭ বছর। তারা নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও শান্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।
নাগাসাকি হামলার দ্বিতীয় প্রজন্মের উত্তরসূরি তাকাকো নাকামুরা অবসরের পর থেকে পারিবারিক স্মৃতিচারণের মাধ্যমে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে অনেক মানুষের দেহের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকেনি।
মাসাকো ওয়াদা বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি অতীতের বিষয় নয়, এটি এখনও বাস্তব। তিনি বলেন, মানুষ যেন কেবল সহানুভূতি নয়, বরং এটিকে নিজেদের সমস্যা হিসেবে অনুভব করে।
অন্যদিকে, জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেছেন, চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীনের সামরিক সম্প্রসারণ, পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান তৎপরতার কারণে জাপানকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার প্রতিরক্ষা খাত জোরদারে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির অনুমতিও দেওয়া হয়। পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র না রাখা, না তৈরি করা এবং জাপানের ভূখণ্ডে পারমাণবিক অস্ত্র প্রবেশ করতে না দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতিও পুনর্বিবেচনার আলোচনা চলছে।
তবে টোকিওর সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক কোইচি নাকানো মনে করেন, চীন জাপান বা তাইওয়ানে হামলা চালাতে পারে—এই যুক্তিতে সামরিক শক্তি বাড়ানোর বিষয়টি সাধারণ জাপানিদের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, জাপানের উচিত অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে নিরস্ত্রীকরণ ও সংলাপকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চীনের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা অব্যাহত রাখা।
এদিকে, সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিরোধিতায় জাপানেও আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। গত ১০ জুলাই টোকিওতে সংসদ ভবনের বাইরে প্রায় ২৭ হাজার মানুষ যুদ্ধবিরোধী সমাবেশে অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল ‘যুদ্ধ নয়’ লেখা প্ল্যাকার্ড এবং শান্তির বার্তা।
আয়োজকদের একজন রেইনা তাশিরো বলেন, তারা এমনভাবে আন্দোলন করছেন যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই এতে অংশ নিতে উৎসাহিত হয়। আরেক সংগঠক নাহোকো হিশিয়ামা জানান, সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে তরুণ-তরুণী ও নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
এমএসএম
বিজ্ঞাপন