সারাদেশ

আয়না ভাঙলে সাত বছরের দুর্ভাগ্য—এর উৎস কোথায়?

b
bd24live অনলাইন ডেস্ক
6 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
একটি আয়না হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কেউ বলল, ‘সাত বছর দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়বে না!’ এমন কথা হয়তো আমরা অনেকেই ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, এই বিশ্বাসের শুরু কোথায়? সত্যিই কি আয়না ভাঙলে সাত বছরের দুর্ভাগ্য নেমে আসে, নাকি এটি কেবল শতাব্দীপ্রাচীন একটি কুসংস্কার? আয়নাকে কেন রহস্যময় মনে করা হতো? আজকের দিনে আয়না আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ বস্তু। কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে বিষয়টি ছিল ভিন্ন। প্রাচীন গ্রিস, মিশর ও রোমে মানুষ বিশ্বাস করত, আয়না শুধু মানুষের মুখই দেখায় না, বরং তার আত্মার প্রতিচ্ছবিও ধারণ করে। তাই আয়না ভেঙে যাওয়াকে আত্মার ক্ষতি বা অশুভ ঘটনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হতো। অনেক সংস্কৃতিতে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে আয়না কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার রীতিও ছিল। বিশ্বাস করা হতো, খোলা আয়নায় মৃতের আত্মা আটকে যেতে পারে। সাত বছরের দুর্ভাগ্যের ধারণা এলো কীভাবে? ‘সাত বছরের দুর্ভাগ্য’ ধারণাটির উৎস মূলত প্রাচীন রোমান সভ্যতা। রোমানদের বিশ্বাস ছিল, মানুষের শরীর ও আত্মা প্রতি সাত বছর অন্তর নতুনভাবে পুনর্জীবিত বা নবায়ন হয়। তাই যদি কারও আয়না ভেঙে যায়, তবে তার আত্মার ক্ষতি পূরণ হতে পরবর্তী সাত বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সেখান থেকেই জন্ম নেয়—আয়না ভাঙলে সাত বছরের দুর্ভাগ্য। এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও স্থান করে নেয়। আয়না একসময় ছিল অত্যন্ত দামি, মধ্যযুগে কাচের আয়না ছিল বিলাসবহুল পণ্য। বিশেষ করে ইতালির ভেনিসের মুরানো দ্বীপে তৈরি আয়নার দাম এত বেশি ছিল যে, একটি আয়নার মূল্য অনেক সময় একটি বাড়ির সমান হতো। ফলে কেউ যদি অসাবধানতাবশত আয়না ভেঙে ফেলত, তাকে সতর্ক করতে এবং মূল্যবান জিনিস রক্ষা করতে ‘অমঙ্গল’ বা ‘দুর্ভাগ্যের’ গল্প প্রচার করা হতো বলে ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করেন। বিভিন্ন দেশে নানা বিশ্বাস শুধু সাত বছরের দুর্ভাগ্য নয়, আয়না নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে নানা লোকবিশ্বাস।চীনের কিছু অঞ্চলে বিশ্বাস করা হয়, ভাঙা আয়না সম্পর্কের ভাঙনের প্রতীক। রাশিয়ায় অনেকে মনে করেন, ভাঙা আয়না ঘরে নেতিবাচক শক্তি নিয়ে আসে। মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার কিছু অঞ্চলে আয়না ভাঙাকে পারিবারিক অশান্তির পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়।আবার ইউরোপের অনেক দেশে বিশ্বাস করা হয়, ভাঙা আয়নার টুকরো দ্রুত সরিয়ে ফেললে অমঙ্গল কেটে যায়। বিজ্ঞানের চোখে কী বলে? বিজ্ঞান বলছে, আয়না ভাঙা আর দুর্ভাগ্যের মধ্যে কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক নেই। এ পর্যন্ত এমন কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা পাওয়া যায়নি, যা দেখায় যে আয়না ভাঙার কারণে মানুষের জীবনে সাত বছর বা অন্য কোনো সময়ের জন্য দুর্ভাগ্য নেমে আসে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ যখন কোনো কুসংস্কারে বিশ্বাস করে, তখন সেটিকে সত্যি মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। একে বলা হয় Confirmation Bias। অর্থাৎ আয়না ভাঙার পর যদি কোনো খারাপ ঘটনা ঘটে, মানুষ সেটিকেই বেশি মনে রাখে। কিন্তু ভালো ঘটনা ঘটলে সেটিকে আর আয়না ভাঙার সঙ্গে যুক্ত করে না। তাহলে এত দিন ধরে বিশ্বাসটি টিকে আছে কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, লোককথা, পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্প ছড়িয়ে পড়ার কারণেই এই বিশ্বাস আজও টিকে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগেও এমন অনেক কুসংস্কার নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে, কারণ মানুষ রহস্যময় গল্প শুনতে ও শেয়ার করতে ভালোবাসে। মজার কিছু তথ্য: বিশ্বের প্রাচীনতম আয়না তৈরি হয়েছিল পালিশ করা অবসিডিয়ান (আগ্নেয় কাচ) দিয়ে, প্রায় ৮ হাজার বছর আগে। আধুনিক কাচের আয়না জনপ্রিয় হয় ১৬শ শতকে ইতালির ভেনিসে। জাপানে আয়না তিনটি পবিত্র রাজকীয় প্রতীকের একটি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি জ্ঞান ও সততার প্রতীক। আয়না ভাঙলে সাত বছরের দুর্ভাগ্য নেমে আসে—এমন বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে প্রাচীন রোমানদের আত্মা ও পুনর্জন্ম-সংক্রান্ত ধারণা, বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। তবু শত শত বছর ধরে প্রচলিত এই কাহিনি আজও মানুষের কৌতূহল জাগায়। হয়তো পরেরবার আয়না ভেঙে গেলে আপনি ভয় পাবেন না। বরং মনে পড়বে—এটি ইতিহাসের এক চমকপ্রদ কুসংস্কার, যার গল্প টিকে আছে মানুষের বিশ্বাসে, বাস্তবতায় নয়।
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>