বিজ্ঞাপন
সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনকে (৫৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকায় ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও থানা পুলিশ।
র্যাব বলছে, এই ঘটনায় জড়িতরা মাদকাসক্ত ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিল। বিচ্ছিন্ন এক ঘটনায় অটোরিকশার গ্যারেজ মালিক বৃদ্ধকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশের ওই সদস্য সাদা পোশাকে এগিয়ে এলে তার ওপর হামলা করে হত্যা করা হয়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মুন্সিগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেফতার করে র্যাব-১০। গ্রেফতারকৃতরা হলো- আলাউদ্দিন (২৬), আপন (৩০), জিহাদ (২০) ও ইমরান (২৬)।
একই দিন রাতে সাভারের আমিনবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চারজনকে গ্রেফতার করে র্যাব-৪। গ্রেফতারকৃতরা হলো, নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪), মো. রাকিব মিয়া (২৮), ছাব্বির আহম্মেদ (২৪), ও মো. ওয়াসিম (৪০)।
এছাড়াও রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) ভোরে সাভারের আমিনবাজা এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি প্রাইভেটকার চালক জহিরুল ইসলামকে (৩০) গ্রেফতার করে সাভার মডেল থানা পুলিশ।
মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের একটি টিম রাজধানীর সদরঘাট থেকে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অনুসরণ করতে থাকে। একপর্যায়ে মুন্সিগঞ্জের লঞ্চঘাটে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। লঞ্চ থেকেই প্রথমে দুজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হই। এরপর প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে বাকি দুজনসহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আমরা তাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছি বলেও জানান তিনি।
একই ঘটনায় জড়িত আরও চার আসামিকে র্যাব-৪-এর একটি অভিযানিক দল গ্রেফতার করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এজাহারে নাম থাকা মোট ১৫ আসামির মধ্যে র্যাব-১০ চারজন এবং র্যাব-৪ চারজনসহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া স্থানীয় থানা পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত আপন ও জিহাদ বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠেছে। তাদের পিসিপিআরও অত্যন্ত খারাপ। তারা ওই এলাকায় কিশোর গ্যাং পরিচালনা করে এবং মাদকের সঙ্গে চরমভাবে সম্পৃক্ত।
এসময় পুলিশ সদস্যকে হত্যার কার জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলতাফ হোসেনকে পুলিশ হিসেবে টার্গেট করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়নি। আলতাফ হোসেন এসবিতে চাকরি করতেন। ঘটনার সময় তিনি সিভিল (সাদা) পোশাকে ছিলেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একই সঙ্গে একজন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকে তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষকে যখন মারধর করা হচ্ছিল, তখন মানবিক কারণে সেটি প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। ওই বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন অটোরিকশা গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদ। প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে আলতাফ হোসেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও সমঝোতার চেষ্টা করেন। কিন্তু হামলাকারীরা কোনোভাবেই তার কথায় কর্ণপাত করেনি। একপর্যায়ে তারা তাকে ধাওয়া করে। তখন আলতাফ হোসেন দৌঁড়ে ঘটনাস্থলের পাশে তার ছেলের কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে আসামিরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে তিনি নিজের পুলিশ পরিচয় দেন। তারপরও তাকে দেশিয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
আসামিদের বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এজাহারভুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে অধিকাংশেরই কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। হামলার সময় তারা মাদকাসক্ত ছিল। র্যাব-১০ এর হাতে গ্রেফতারকৃত চারজনের মধ্যে আলাউদ্দিন সরাসরি আলতাফ হোসেনের ওপর হামলা করে। জিহাদ চাকু দিয়ে তাকে আঘাত করে এবং গুরুতর জখম করে। আরেকজন গ্রেফতারকৃত আসামি আপন ওই এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের মূল হোতা। তার বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে তিনটি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। সে এসএস পাইপ দিয়ে আলতাফ হোসেনের মাথায় গুরুতর আঘাত করে। অপর আসামি ইমরানও হামলায় অংশ নেয়। যখন ওই সন্ত্রাসী দলটি গণপিটুনি দিচ্ছিল, তখন ইমরানও তাদের সঙ্গে ছিল। ওই দলের সদস্যসংখ্যা আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন ছিল বলেও জানানো হয়।
ঘটনার সূত্রপাত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটেছে এমনটা মনে হচ্ছে না। ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হয়। সেখানে একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। হামলাকারীরা একটি প্রাইভেটকারে ৫ জন ছিল। অটোরিকশাটি সেখানে কেন দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়েই প্রথমে তাদের সঙ্গে গ্যারেজের মালিকের বিরোধের সূত্রপাত হয়। ওই পাঁচজনই তখন মাদকাসক্ত ছিল। তারা গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে গ্যারেজের বৃদ্ধ মালিক আবুল কালাম আজাদকে থাপ্পড় ও মারধর করে। তখন একজন মানবিক মানুষ হিসেবে আলতাফ হোসেন এগিয়ে গিয়ে বিষয়টি প্রতিহত ও সমঝোতার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তার কথায় কর্ণপাত করেনি। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে হামলাকারীরা তার ওপরও আক্রমণ শুরু করে। পরিস্থিতি বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়েছে বুঝতে পেরে আলতাফ হোসেন নিজেকে বাঁচানোর জন্য দৌড় দেন। এরপর তিনি তার ছেলের একটি ছোট পোশাক কারখানায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। এরই মধ্যে ওই পাঁচজন এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ফোন করে সেখানে ডেকে নেয়। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে আরও লোকজন যুক্ত হলে সেখানে আনুমানিক ২৫ জনের মতো লোক জড়ো হয়। পরে তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর প্রথমে আলতাফ হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়। তার চিৎকার শুনে তার ছোট ছেলে আরিফুল পেছন দিক থেকে এসে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। তখন তাকেও ফেলে দেওয়া হয় এবং মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। হামলায় এসএস পাইপসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র, চাকু এবং অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়েই আলতাফ হোসেনকে হত্যা এবং তার ছেলেকে গুরুতর জখম করা হয়।
কেআর/এসএনআর
বিজ্ঞাপন