বিজ্ঞাপন
ড. ইউসুফ কারযাভী
ইসলামে আত্মিক বা আধ্যাত্মিক জীবনের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত, ব্যাপক ও ধারাবাহিক হওয়া সত্ত্বেও তা এক সহজ জীবনধারা। এটি মানুষকে কোনো অসাধ্য সাধন করতে বলে না, সাধ্যের অতীত কোনো বোঝা চাপায় না এবং এমন কোনো কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে না যা মানুষের স্বাভাবিক জীবন নষ্ট করে দেয়। ইসলাম মানুষকে কেবল তার সক্ষমতা ও সাধ্যের ভেতরের বিষয়গুলোই পালন করতে বলে। মানুষকে প্রচণ্ড কষ্টে ফেলে কোনো বিধি-নিষেধ মানানোর দাবি ইসলামে নেই।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইসলামে যে কোনো ধরনের কাঠিন্য বা সংকীর্ণতাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠোরতা চাপিয়ে দেননি।’ (সুরা হজ: ৭৮) অজু ও তায়াম্মুমের বিধানসংক্রান্ত আয়াতের শেষে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো কষ্ট চাপিয়ে দিতে চান না; বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের ওপর তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা মায়েদা: ৬) আবার সিয়াম বা রোজা এবং অসুস্থ ও মুসাফিরের জন্য রোজা ভাঙা ও পরবর্তী সময়ে তা কাজা করার ছাড় সংক্রান্ত আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কোনো কঠোরতা চান না।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)
পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবধারীদের কাছে নবীজির (সা.) যে বিবরণ ছিল, কোরআনে তার উল্লেখ এসেছে এভাবে, ‘যাদের বিবরণ তারা তাদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়; যিনি তাদের সৎকাজের নির্দেশ দেন ও অসৎকাজে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন ও অপবিত্র বস্তু হারাম করেন এবং তাদের ওপর থেকে সেই ভার ও শৃঙ্খল দূর করেন যা তাদের ওপর চাপানো ছিল।’ (সুরা আরাফ: ১৫৭)
আহলে কিতাবদের কাছে নবীজির (সা.) দাওয়াতের এই মূল পরিচয়ই প্রমাণ করে যে, এই রিসালাতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো উদারতা, সহজতা এবং পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর থাকা কঠিন বিধানের বোঝা লঘুকরণ।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এই দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেমন কঠিন বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন, আমাদের ওপর তেমন বোঝা চাপাবেন না। হে আমাদের রব! এমন কোনো ভার আমাদের ওপর চাপাবেন না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই’ (সুরা বাকারা: ২৮৬)। সহিহ হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ তাআলা বান্দার এই দোয়া কবুল করেছেন।’
ইসলামের এই আত্মিক পরিধি সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত—চাই সে সর্বনিম্ন, মধ্যম বা সর্বোচ্চ মর্যাদার হোক না কেন। কোরআন কারিমে বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, তারপর আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে যাদের মনোনীত করেছি, তাদের এই কিতাবের উত্তরাধিকারী বানিয়েছি। তবে তাদের কেউ নিজের ওপর অত্যাচারী (জালিম লিনাফসিহি), কেউ মধ্যপন্থী (মুকতাসিদ) এবং কেউ আল্লাহর হুকুমে সৎকাজে অগ্রগামী (সাবিকুন বিল খয়রাত)। এটাই হলো মহা অনুগ্রহ।’ (সুরা ফাতির: ৩২)
এখানে প্রথম শ্রেণি হলো তারা, যারা কেবল ফরজ কাজগুলো আদায় করেই ক্ষান্ত হয়, মাঝে মাঝে তাতে ঘাটতিও করে ফেলে, এবং কেবল হারাম কাজগুলো ত্যাগ করে, মাঝে মাঝে তাতে জড়িয়েও পড়ে—এরা হলো \'নিজের ওপর অত্যাচারী\'।
দ্বিতীয় শ্রেণি হলো তারা, যারা পুরোপুরিভাবে ফরজ কাজগুলো পালন করে এবং কোনো ঘাটতি হতে দেয় না, আর হারাম কাজগুলো বর্জন করে এবং তাতে লিপ্ত হওয়ার বিষয়ে সামান্যতম অবহেলা করে না—এরা হলো \'মধ্যপন্থী\'।
আর তৃতীয় শ্রেণি হলো তারা, যাদের মন কেবল হারাম ত্যাগের মাধ্যমে তৃপ্ত হয় না; বরং তারা দ্বীন ও চরিত্রকে নিষ্পাপ রাখতে সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকেও দূরে থাকে। আরও একধাপ এগিয়ে তারা অপছন্দনীয় বা মাকরুহ কাজগুলো ত্যাগ করে, এমন কি কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে যেসব কাজে আপাতদৃষ্টিতে কোনো দোষ নেই, তা-ও বর্জন করে। তারা কেবল ফরজ আদায়েই তৃপ্ত হয় না; বরং তারা নফলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়।
হাদিসে কুদসিতে যেমনটি এসেছে, ‘বান্দা যেসব মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, তার মধ্যে আমার নির্ধারিত ফরজ আদায়ের চেয়ে প্রিয় আর কিছুই নেই। আর বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে ক্রমাগত আমার নৈকট্য লাভ করতেই থাকে, এমন কি এক পর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দিই; আর যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি তাকে আশ্রয় দিই।’
সুতরাং, ফরজ আমল যদি বান্দাকে আল্লাহর \'নৈকট্য\' পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, তবে নফল আমল তাকে পৌঁছে দেয় আল্লাহর \'ভালোবাসা\' পর্যন্ত। আর এটাই হলো আল্লাহর হুকুমে \'সৎকাজে অগ্রগামী\' হওয়ার মর্যাদা।
ইসলামের এই আত্মিক আঙিনা সেই সাধারণ বেদুইনকেও আপন করে নিয়েছে, যিনি নবীজির (সা.) কাছে এসে ইসলামের ফরজ কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। নবীজি (সা.) তাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ফরজ জাকাত ও রমজানের রোজার কথা জানান। বেদুইন ব্যক্তি প্রতিটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ‘আমার কর্তব্য কি এর বাইরেও কিছু আছে?’ নবীজি (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না, তবে তুমি যদি স্বেচ্ছায় কোনো নফল আমল করো।’ সব শুনে শেষপর্যন্ত সেই বেদুইন স্পষ্টভাবে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি এর চেয়ে একচুল বাড়াবও না, কমাবও না।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, ‘সে সফলকাম হবে যদি সত্য বলে থাকে’ অথবা ‘সে জান্নাতে প্রবেশ করবে যদি সত্য বলে থাকে।’
একদিকে এই সরল বেদুইন, অন্যদিকে আবু বকর, ওমর, আলী, আবু জার, আবু দরদা, সালমান ও আবদুল্লাহ ইবনে আমরের (রা.) মতো প্রখ্যাত ত্যাাগী ও জাহেদ সাহাবিদের আত্মিক সাধনা—সবাইকেই সমানভাবে ধারণ করেছে ইসলামের এই সুবিশাল পথ।
এমন কি পাপিষ্ঠ ও অনুতপ্ত বান্দাদের জন্যও ইসলামের এই আত্মিক দরজা সবসময় খোলা। তাদের অপরাধ যতই গুরুতর হোক না কেন, কিংবা নিজেদের ওপর তারা যতই সীমালঙ্ঘন করুক না কেন, রাহমানের দরবারের রহমতের দরজা কখনোই বন্ধ হয় না। কোরআনে এই বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার: ৫৩)
লক্ষ করুন, চরম পাপ ও সীমালঙ্ঘন সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে কত সুমিষ্ট আহবানে তাদের ডাকার নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘হে আমার বান্দারা!’ এতে করে তাদের মনে এই অনুভূতি জাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, রবের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়নি। শত অন্যায় করার পরও তারা তাঁরই বান্দা। সুতরাং আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ বা নিরাশ হওয়া তাদের সাজে না। কারণ, পথভ্রষ্টরা ছাড়া আর কেউ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না, আর কাফের সম্প্রদায় ছাড়া কেউ আল্লাহর দয়া থেকে হতাশ হয় না।
পবিত্র কোরআনে এমন এক সম্প্রদায়ের কথা এসেছে যারা শিরক করেছিল, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করেছিল এবং ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিল; কিন্তু পরবর্তীতে তারা তওবা করায় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যার হত্যা হারাম করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না—যে এগুলো করবে সে শাস্তির মুখোমুখি হবে। কেয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সেখানে সে লাঞ্ছিত অবস্থায় স্থায়ীভাবে থাকবে। তবে তারা ছাড়া, যারা তওবা করে, ইমান আনে ও সৎকর্ম করে; আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ফুরকান: ৬৮-৭০)
হজরত হাসান বসরী (র.) যখন সুরা বুরুজের এই আয়াতটি পাঠ করতেন: ‘নিশ্চয়ই যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং তারপর তওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আজাব ও দহন যন্ত্রণা’ (সুরা বুরুজ: ১০), তখন তিনি আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ ও ক্ষমার বিশালতায় অভিভূত হয়ে বলতেন, আল্লাহর কী অপূর্ব মেহেরবানি! তারা আল্লাহর প্রিয় ওলিদের পুড়িয়ে মারল, অথচ এরপরও আল্লাহ তাদের তওবার পথ থেকে নিরাশ করেননি!
গামেদ গোত্রের সেই নারীর কথাও স্মরণ করা যায়, যিনি বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি যত কঠিনই হোক না কেন, তা ভোগের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করার জন্য তিনি অবিচল ছিলেন। তার তওবা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘সে এমন তওবা করেছে, যা যদি মদিনার ৭০ জন অধিবাসীর মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো, তবে তাদের সবার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যেত।’
আরবি থেকে অনুবাদ: ওমর ফারুক ফেরদৌস
উৎস: আল হায়াতুর রাব্বানিয়্যাহ ওয়াল ইলম
ওএফএফ
বিজ্ঞাপন