বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি বছর আমার কাছে শুধু দুটি সাল নয়; দুটি গভীর অনুভূতির নাম। একটি ১৯৭১, অন্যটি ২০২৪।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানুষের মর্যাদার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল না, ছিল এমন একটি দেশের স্বপ্ন, যেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপদে বাঁচবে, যেখানে ত্যাগের মর্যাদা থাকবে এবং যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের।
সেই ইতিহাসের আমি শুধু একজন পাঠক নই, একজন ছোট প্রত্যক্ষদর্শী। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। সেই অল্প বয়সেই আমাকে যুদ্ধের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নিজের দেশেই কখনো শরণার্থী হয়ে, কখনো বন্যার পানিতে ভেসে, কখনো রাতের অন্ধকারে, আবার কখনো দিনের আলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মায়ের নেতৃত্বে পাঁচ ভাইবোনের দেখাশোনা করতে হয়েছে।
সেই কঠিন সময়ে শিশু বয়সেই আমার ওপর এসেছিল এক অপ্রত্যাশিত দায়িত্ব। পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও যুক্ত ছিলাম। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই দিনগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে আছে। স্বাধীনতার মূল্য, মানুষের ত্যাগ এবং একটি দেশের জন্য সাধারণ মানুষের অবদানের গভীরতা আমি তখনই অনুভব করতে শুরু করি।
আরও পড়ুন
বুকজুড়ে বাংলাদেশ: স্বপ্নের চেয়ে বড় সংগ্রাম
আজ ভাবলে মনে হয়, আমি ছিলাম সেই মুক্তিযুদ্ধের এক খুদে সহযাত্রী। আমার হাতে অস্ত্র ছিল না, কিন্তু ছিল দায়িত্ব, সাহস এবং নিজের দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। সেই শৈশবের অভিজ্ঞতা আমার জীবনের মূল্যবোধ, দেশপ্রেম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসের ভিত তৈরি করে দিয়েছে।
কিন্তু স্বাধীনতার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমার সেই স্বপ্নে ফাটল ধরতে শুরু করে। আজ পেছনে তাকিয়ে মনে হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমার মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা ১৯৭১-পরবর্তী হতাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, যাদের পরিবার ধ্বংস হয়েছে, তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে প্রাপ্য সম্মান ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অন্যদিকে, স্বাধীনতার সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না রাখা বা যুদ্ধকালীন বিতর্কিত অবস্থানে থাকা কিছু মানুষও পরবর্তীকালে ক্ষমতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার অংশীদার হয়েছেন। এই বৈপরীত্য অসংখ্য ত্যাগী মানুষের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
আমার উপলব্ধি হলো, সেখান থেকেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সেই মানুষগুলোর হাতছাড়া হতে শুরু করে, যারা একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। রাষ্ট্রের মালিক হওয়ার কথা ছিল জনগণের, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা সীমিত কিছু গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ধীরে ধীরে একটি বড় সংকটে পরিণত হয়।
১৯৭১ সালের সেই শিশুর চোখে স্বাধীনতা ছিল মানুষের মুক্তির প্রতীক। কিন্তু পরবর্তী জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শুধু একটি পতাকা ও মানচিত্র অর্জন করলেই একটি জাতির স্বপ্ন পূর্ণ হয় না। প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, সুশাসন এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।
১৯৭১-এর সেই শৈশবের অভিজ্ঞতা আমার জীবনের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। খুব ছোট বয়সেই বুঝেছিলাম, একটি দেশের স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত।
সেই কারণেই স্বাধীনতার পর যখন দেখলাম, মানুষের ত্যাগ আর রাষ্ট্রের বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, তখন কষ্ট পেয়েছি। কারণ আমার কাছে স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, এটি ছিল আমার শৈশবের স্মৃতি, আমার পরিবারের সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের সঙ্গে জড়িত এক গভীর অনুভূতি।
স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশকে আমি সবসময় সেই স্বপ্নের আলোতেই বিচার করেছি। দেখেছি, দেশের মানুষ এগিয়ে যেতে চায়, পরিশ্রম করতে চায়, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চায়। সাধারণ মানুষ আজও দেশের উন্নয়নের মূল শক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে দেখেছি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহির অভাব বারবার সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
তারপর কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। প্রজন্ম বদলেছে, সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, পৃথিবী বদলেছে, কিন্তু কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এই দীর্ঘ পথচলার পর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আবারও আমার মনে নতুন আশার জন্ম দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, হয়তো এবার বাংলাদেশ এমন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে, যেখানে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির সূচনা হতে পারে।
প্রবাসে থেকেও সেই আশা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। মনে হয়েছিল, যেভাবে ১৯৭১ সালে সাধারণ মানুষ একটি স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, হয়তো ২০২৪ সালের নতুন প্রজন্মও একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশার মধ্যেও সংশয় তৈরি হতে শুরু করে। আমার দৃষ্টিতে, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং নৈতিক দুর্বলতা আবারও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলেছে।
তবুও আমি হতাশার কাছে নিজেকে সমর্পণ করিনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি জাতির ইতিহাস শুধু ক্ষমতাবানদের দ্বারা লেখা হয় না; ইতিহাস তৈরি হয় সাধারণ মানুষের ত্যাগ, সাহস এবং নীরব অবদানের মধ্য দিয়েও।
১৯৭১ সালে আমি ছিলাম একটি শিশু, যে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছিল। ২০২৪ সালে আমি ছিলাম একজন প্রবাসী, যার হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল কলম। কিন্তু উদ্দেশ্য একই ছিল, একটি ভালো বাংলাদেশের স্বপ্ন।
দূর প্রবাসে থেকেও আমি দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে অনুসরণ করেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছি, রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে মতামত দিয়েছি, শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছি।
আমার কাছে কলম শুধু লেখার মাধ্যম নয়, এটি ছিল দায়িত্ব পালনের একটি উপায়। কারণ আমি বিশ্বাস করি, চিন্তার পরিবর্তন ছাড়া কোনো স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। একটি জাতির রূপান্তর প্রথমে মানুষের বিবেক ও চিন্তার জগতে শুরু হয়।
রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো প্রবাসীর শ্রম, ত্যাগ, স্বপ্ন এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা। প্রবাসীরা শুধু অর্থ পাঠান না, তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, দক্ষতা এবং নতুন চিন্তাধারাও সঙ্গে নিয়ে আসেন।
আমার মতো অসংখ্য প্রবাসী বছরের পর বছর দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন। একই সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও ভালোবাসা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই বিশাল সম্ভাবনাকে সবসময় যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
আমি কখনো শুধু সমালোচনা করার জন্য লিখিনি। আমার উদ্দেশ্য ছিল প্রশ্ন তোলা, চিন্তার জন্ম দেওয়া এবং একটি ভালো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা খুঁজে বের করা।
কারণ প্রকৃত ভালোবাসা শুধু প্রশংসা করা নয়। প্রকৃত ভালোবাসা হলো ভুল দেখলে সততার সঙ্গে তা বলা এবং ভালো কিছুর জন্য পথ খোঁজা। পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থ: শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন। এই বিশ্বাস থেকেই আজও আমি একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছি, বাংলাদেশের মূল সমস্যাটা কোথায়?
কেন বারবার মানুষ আশা নিয়ে এগিয়ে আসে, ত্যাগ স্বীকার করে, একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু কিছুদিন পর সেই আশাই আবার হতাশায় পরিণত হয়?
আমার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে। শুধু সরকার পরিবর্তন করে একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করা যায় না। শুধু নতুন মুখ এনে পুরোনো ব্যবস্থার ওপর বসিয়ে দিলেই নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি হয় না।
কারণ সমস্যা যদি শুধু ব্যক্তির হতো, তাহলে ব্যক্তি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমস্যারও সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যক্তি বদলেছে, দল বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, রাজনৈতিক ভাষা বদলেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতির কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটেনি।
আমার উপলব্ধিতে, বাংলাদেশের বড় সংকট কোনো একক ব্যক্তি বা একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংকট আরও গভীরে, রাষ্ট্র পরিচালনার সেই সংস্কৃতিতে, যেখানে অনেক সময় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থ প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করার সুযোগ পায়। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান বড় হয়।
সেখানে আদালত ন্যায়বিচারের প্রতীক, প্রশাসন জনগণের সেবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংবিধান ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধ, নির্বাচন জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন এবং সংবাদমাধ্যম সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করে।
যখন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, তখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে না। আর যখন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, তখন ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
আমার কষ্ট কোনো ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে নয়। আমার কষ্ট এই কারণে যে, যে দেশের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে, যে দেশের জন্য অসংখ্য পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে, সেই দেশে এখনো সৎ, দক্ষ, নীতিবান ও দেশপ্রেমিক মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন করার সংস্কৃতি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অনেক সময় দেখা যায়, যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য, সততার চেয়ে সম্পর্ক এবং জনকল্যাণের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়। এর ফলে সমাজে একটি ভুল বার্তা তৈরি হয়, যেখানে নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ ভাবতে শুরু করে, পরিশ্রম ও সততার চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা হয়তো বেশি কার্যকর।
কারণ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা অবকাঠামোর মধ্যে নয়। প্রকৃত শক্তি তৈরি হয় মানুষের মূল্যবোধ, শিক্ষার মান, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ওপর। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু আরেকটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন।
এমন একটি পরিবর্তন, যেখানে দুর্নীতিকে আর বুদ্ধিমত্তা হিসেবে দেখা হবে না, চাটুকারিতাকে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হবে না এবং ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা অর্জন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, কিন্তু স্বাধীনতার আদর্শ বাস্তবায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া।
১৯৭১ সালে আমরা একটি পতাকা পেয়েছি, একটি মানচিত্র পেয়েছি। কিন্তু সেই পতাকা ও মানচিত্রের ভেতরে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ এখনো চলমান।
স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু বিদেশি শাসনের অবসান নয়, বরং মানুষের ভয়মুক্ত জীবন, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের কাছে সমান মর্যাদা পাওয়া। এই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীনতার স্বপ্ন সম্পূর্ণ হয় না।
তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব শুধু কোনো একটি সরকার বা রাজনৈতিক দলের নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ স্বাধীনতার আদর্শ রক্ষা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়।
এই কারণেই আজকের প্রজন্মের কাছে আমার সবচেয়ে বড় আহ্বান, একটি ভালো বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু ক্ষমতার করিডরে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়ে।
আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাধারণ মানুষ। এই মানুষগুলো বারবার প্রমাণ করেছে, প্রয়োজন হলে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, ত্যাগ স্বীকার করতে পারে এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে পারে।
ভাষার জন্য জীবন দেওয়া, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা এবং অধিকার ও মর্যাদার জন্য সংগ্রাম করা এই জাতির মানুষের সাহসেরই প্রমাণ।
তাই আমি বাংলাদেশের মানুষকে কখনো ব্যর্থ মনে করি না। ব্যর্থতা যদি কোথাও থাকে, তবে তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং ক্ষমতাকে যথাযথ জবাবদিহির মধ্যে রাখতে না পারার ব্যর্থতায়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক নেতা, কোনো পরিবার বা কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, যেখানে যোগ্যতা ও সততা মূল্যায়িত হয়, যেখানে নাগরিকের অধিকার কোনো শাসকের দয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক নিশ্চয়তা।
এই পরিবর্তনের পথে শিক্ষার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শুধু পরীক্ষার নম্বর নয়, বরং চিন্তা করার ক্ষমতা, সত্য বলার সাহস, ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু সংসদ ভবনে তৈরি হয় না; ভবিষ্যৎ তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষে, পরিবারে এবং মানুষের বিবেকের মধ্যে। প্রবাসীদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর উৎস নয়। তারা বাংলাদেশের এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি দেশের উন্নয়নের বড় সম্পদ হতে পারে।
রাষ্ট্র যদি এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার নয়, জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং নীতি নির্ধারণের অংশীদারও হতে পারে।
আমার নিজের জীবনের দিকে তাকালে দেখি, আমি কোনো পদ, ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত স্বীকৃতির জন্য লিখিনি। আমি চেয়েছি সেই বাংলাদেশ, যার স্বপ্ন ১৯৭১ সালে মানুষ দেখেছিল এবং ২০২৪ সালে নতুন প্রজন্ম আবার দেখতে চেয়েছিল।
আমি রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখার চেষ্টা করেছি। আর কলম দিয়ে দেশের চিন্তার জগতে নিজের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি।
কখনো প্রশ্ন করেছি, কখনো সমালোচনা করেছি, আবার কখনো সম্ভাবনার কথা বলেছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, নীরবতা সব সময় শান্তি নয়; অনেক সময় নীরবতা অন্যায়কে শক্তিশালী করে।
জীবনের এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন আমার চোখে ভেসে ওঠে দুটি বছর, ১৯৭১ এবং ২০২৪। দুটি ভিন্ন সময়, দুটি ভিন্ন প্রজন্ম, কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল একই, একটি স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক, মর্যাদাপূর্ণ এবং মানবিক বাংলাদেশ।হয়তো আমরা এখনো সেই স্বপ্নের পুরোপুরি কাছে পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়নি।
কারণ ইতিহাসে কোনো সত্যিকারের পরিবর্তন এক দিনে আসে না। প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে থাকে কিছু মানুষের ত্যাগ, কিছু মানুষের সাহসী প্রশ্ন এবং কিছু মানুষের অবিচল বিশ্বাস।
১৯৭১ সালে যে শিশুর চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন জন্ম নিয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই একই মানুষ প্রবাসের মাটি থেকে কলম হাতে আবারও একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে।
আমি জানি, আমার লেখা একা কোনো রাষ্ট্র পরিবর্তন করতে পারবে না। আমার কলম হয়তো ক্ষমতার সব প্রাচীর ভেঙে দিতে পারবে না। কিন্তু আমি এটাও বিশ্বাস করি, একটি সত্য কথা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
একটি চিন্তা একজন মানুষকে বদলাতে পারে। একজন মানুষ একটি পরিবারকে বদলাতে পারে। একটি পরিবার একটি সমাজকে বদলাতে পারে। আর একটি সচেতন সমাজ একদিন একটি রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন করতে পারে।
আজ যারা তরুণ, আগামীকাল তারাই বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। তাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ:
কোনো ব্যক্তি, কোনো পরিবার, কোনো দল বা কোনো মতাদর্শকে দেশের চেয়ে বড় মনে করো না। দেশ বড়, মানুষ বড়, সত্য বড়।
প্রশ্ন করতে শেখো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখো, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখো। মনে রেখো, রাষ্ট্র কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের।
আমার জীবনের বড় অংশ পেরিয়ে এসেছে। এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, হয়তো আমি সেই পূর্ণ বাংলাদেশ দেখে যেতে পারব না, যার স্বপ্ন ১৯৭১ সালে মানুষ দেখেছিল, কিংবা ২০২৪ সালে নতুন করে অনেকে দেখতে শুরু করেছিল।
তবুও আমি লিখে যাব। কারণ আমি বিশ্বাস করি, একটি সৎ চিন্তা কখনো বৃথা যায় না। আজ যে বীজ রোপণ করা হয়, তার ফল হয়তো আগামী প্রজন্ম ভোগ করবে।
একদিন হয়তো আমার নাম কেউ মনে রাখবে না, আমার লেখা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি এই লেখার কোনো একটি বাক্যও একজন তরুণকে ভাবতে শেখায়, একজন নাগরিককে সাহস দেয়, অথবা একজন দায়িত্বশীল মানুষকে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড় করায়, তাহলেই আমার এই পথচলা সার্থক হবে।
কারণ রাষ্ট্র শুধু ক্ষমতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। রাষ্ট্র গড়ে ওঠে মানুষের বিবেক, সততা, সাহস এবং দায়িত্ববোধের ওপর। আর যতদিন একজন মানুষও সত্য বলার সাহস রাখবে, ততদিন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের আলো নিভে যাবে না।
রহমান মৃধাগবেষক ও লেখকসাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
এমআরএম
বিজ্ঞাপন