বিনোদন

মহাদেব সাহার কবিতায় নারী ও প্রেম

j
jagonews24 অনলাইন ডেস্ক
8 বার পঠিত
বিজ্ঞাপন Ad
মহাদেব সাহার (৫ আগস্ট ১৯৪৪) কবিতায় নারী কিংবা প্রেমের কোনো নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে ওঠেনি। এতে বিচিত্র সব আবেগ ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। যেন কবি নিজেই কবিতার মধ্য দিয়ে প্রেমবিষয়ক নিজস্ব অভিজ্ঞতার সংজ্ঞা খোঁজার চেষ্টা করছেন। শরীর কিংবা আত্মা অথবা উভয়েরই অভিজ্ঞতা হতে পারে প্রেম। এটি যেমন আধ্যাত্মিক হতে পারে; তেমনি হতে পারে নিছক ইন্দ্রিয়জ। আবার এর ফলে পরম পুলক থেকে শুরু করে গভীর হতাশা পর্যন্ত নানা ধরনের আবেগেরও সৃষ্টি হতে পারে। ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’ (১৯৭২) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই আলোচনায় আসেন কবি মহাদেব সাহা। স্বাধীনতা পরবর্তী কবিপ্রতিভার নাম। সমাজের আশেপাশের শব্দাবলির প্রয়োগ তাকে করেছে জনপ্রিয়। কবিতায় উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহারে তাকে আলাদা করা যায় সহজেই। জীবিত বাঙালি কবিদের মধ্যে তার কবিতায় পাওয়া যায় ভিন্ন ধরনের আমেজ। কবির কবিতায় ভিত্তি তৈরি করেছিলেন মূলত ষাট দশকেই। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯০-এর অধিক। এই গৃহ এই সন্ন্যাস (১৯৭২), মানব এসেছি কাছে (১৯৭৩), এসো তুমি পুরাণের পাখি (১৯৭৩), চাই বিষ অমরতা (১৯৭৫), সুন্দরের হাতে আজ হাতকড়া গোলাপের বিরুদ্ধে হুলিয়া (১৯৭৫), তোমার পায়ের শব্দ (১৯৮২), ধুলো মাটির মানুষ (১৯৮২), মানুষ বড়ো ক্রন্দন জানে না (১৯৮৯), আমূল বদলে দাও আমার জীবন (১৯৯৩), কোথায় যাই কার কাছে যাই (১৯৯৪) উল্লেখযোগ্য। তার কবিতায় নারী এসেছে ঘুরেফিরে। নদী, প্রকৃতি ও বৃষ্টির বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণে নারীকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। প্রেম অন্ধ। এ কথা সর্বজনবিদিত। যদিও প্রেম পবিত্র একটা জিনিস। প্রেমে পড়লে নিজের স্বাভাবিকতা থাকে না। তারপরেও আমরা প্রেমে আবদ্ধ হই। বরং এটাই স্বাভাবিক। প্রেমে সময় নষ্ট করি। আবার প্রেমের মধ্যেই সুখ খুঁজি। প্রেম থেকেই বেঁচে থাকার ঘ্রাণ পাই, শক্তি পাই। মহাদেব সাহা বলেন, ‘কিছুদিন শোকে ছিলাম, মোহে ছিলাম, কিছুদিন নারীতে/ শোকাচ্ছন্ন ছিলাম’ (কিছুদিন শোকে ছিলাম, মোহে ছিলাম: চাই বিষ অমরতা)’। তিনি আরও বলেন: ‘তোমার শরীরে হাত আকাশ নীলিমা স্পর্শ করেভূমণ্ডল ছেয়ে যায় মধ্যরাতে বৃষ্টির মতনমুহূর্তে মিলায় দুঃখ, দুঃখ আমাকে মিলায়জলের অতল থেকে জেগে ওঠে মগ্ন চরাচরদেশ হয় দেশ, নদী হয় পূনর্বার নদীনৈঃশব্দ্য নিরুণ হাতে করতালি দেয়’(স্পর্শ, মানব এসেছি কাছে) আরও পড়ুন জাকির জাফরানের কবিতার শিল্পরূপ প্রেমিকার জন্য আমরা অনেক কিছুই করি বা করতে পারি। সম্রাট শাহজাহান যেমন প্রিয়তমা মমতাজ-স্মরণে তাজমহলের মতো সৌধ নির্মাণ করেছেন; তেমনি কবি মহাদেব সাহাও প্রেমের শক্তি নিয়ে অনেক কিছুই অর্জন করতে চান। জয় করতে চান সবকিছু। এমন একটি শক্ত উচ্চারণের কবিতাংশ:‘কী করে বলো না করি অস্বীকার এখনো আমার কাছেএকটি নারীর মুখই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দর্শনীয়,তার চেয়ে অধিক সুন্দর কিছু অদ্যাবধি দেখিনি কোথাও;...এখনো নারীর মুখের দিকে চেয়ে হতে পারি প্রকৃত তন্ময়সময়ের গতিবিধি, প্রয়োজন একমাত্র নারীর মুখের দিকে চেয়েভুলে যেতে পারি;...মনে হয় এই যেন পৃথিবীতে প্রথম দেখেছি আমি একটি নারীর মুখ;নয়ন জুড়ানো এতো শোভা আর কোনো পত্রপুষ্পে নেই(নারীর মুখের যোগ্য শোভা নেই: ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস) কবি মহাদেব সাহা আজীবন প্রেমিক, প্রেমের কবি। সাথে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতি ও মানবতাবোধ। মানবতাবোধ আধুনিক কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে তাকে। জন কীটস বা লং ফেলোর মতো নান্দনিকতাকে কবিতার মাধ্যমে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কোনো ক্ষেত্রে পাবলো নেরুদাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। প্রকৃতিকে রবার্ট হ্যারিককেও ছাড়িয়ে গেছেন। সৌন্দর্য আর প্রেম মিলে নতুন কণ্ঠ সৃষ্টি হয়েছে বাংলা কবিতায়। অনেক কবিই বিচ্ছিন্নভাবে নান্দনিক কবিতা রচনা করলেও মান ও পরিমাণে একক হিসাবে কবি মহাদেব সাহা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। ষাটের দশকের কবিরা চল্লিশের দেশভাগ-পরবর্তী বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে লিখেছেন। পঞ্চাশের ভাষা আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রভৃতি হয়েছে কবিতার অনুসঙ্গ। এসব থেকে এড়িয়ে যাননি কবি মহাদেব সাহা। তিনি সচেতনভাবে প্রেমিক ও দ্রোহী। তার কবিতায় সামাজিক, রাজনৈতিক মানবিক মুখ্য বিষয় হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। কবির প্রতিটি কবিতা নতুন স্বর, বক্তব্য ও উপমার ওপর ভিত্তি করে রচিত। কোথাও কোথাও জীবনানন্দীয় গন্ধ পাওয়া যায়। তবে মহাদেব সাহা নতুন স্বর সৃষ্টি করতে পেরেছেন। কবিতার মধ্যে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ, ফুলের সৌরভ, মাটির স্পর্শ লেগে থাকে। প্রেম, রাজনীতি, মানুষ ঘিরে তার কবিতা আবর্তিত হয়েছে। নদী, মা, বৃক্ষ, পাখি, কল্লোলিত জীবন, জন্মগ্রাম, মৃত্তিকা, মানুষ তার কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। মেঘ-বৃষ্টি-পাহাড়-নদী নিয়ে উপভোগ করেছেন। এসবই তার কবিতায় উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে:‘হঠাৎ সেদিন হাতে পেয়ে চিরকুটনিমিষে সময় হয়ে গেলো যেন লুট;পার হয়ে বহু বছরের ব্যবধানকানে ভেসে এলো হারানো দিনের গান।...এই বয়সেও একখানি চিরকুটতোলে শিহরন, কম্পিত করপুট।’(চিরকুট: অস্তমিত কালের গৌরব) আরও পড়ুন খৈয়াম কাদেরের কবিতার তাত্ত্বিক পাঠ ভালোবাসার অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করা অত্যন্ত কঠিন কাজগুলোর একটি, তবে কবিতা হতে পারে তা প্রকাশের এক চমৎকার মাধ্যম। প্রথম প্রেম কিংবা চিরস্থায়ী ভালোবাসার রোমান্টিকতাকে শব্দের জাদুতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। এমন অনেক কবিতা আছে, যা পড়ার সময় আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো বিশেষ মানুষ বা সেই বিশেষ মুহূর্তের কথা; যখন ভালোবাসার তীব্রতা আমাদের শিরা-উপশিরায় শিহরণ জাগিয়েছিল। নারীর স্পর্শ পুনর্জীবন দিতে পারে। কবি-লেখকদের জীবনকর্ম বদলে দিতে পারে। বিখ্যাত ওপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে চারজন ভিন্ন নারীর স্পর্শে এসে চারটি উপন্যাস লেখেন। যা বিশ্বসাহিত্যে কালজয়ী উপন্যাস হিসাবে মর্যাদা পাচ্ছে। মহাদেব সাহাও নারীর সান্নিধ্যে এসে নতুন নতুন সাহিত্যকর্ম লিখতে চান:‘এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি নাএকবার তোমাকে দেখতে পাবোএই নিশ্চয়তাটুকু পেলে-বিদ্যাসাগরের মতো আমিও সাঁতরে পার হবো ভরা দামোদরকয়েক হাজার বার পাড়ি দেবো ইংলিশ চ্যানেল’(এক কোটি বছর তোমাকে দেখি না: আমূল বদলে দাও আমার জীবন) নারী কিংবা ভালোবাসা একাধারে সুন্দর ও জটিল এক অনুভূতি, যা প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে একান্তই নিজস্ব ও অনন্য। সৌভাগ্যবশত, আমাদের এই কমিউনিটিতে এমন অনেক প্রতিভাবান কবি রয়েছেন, যারা ভালোবাসার এই অসাধারণ অনুভূতিকে অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করতে পেরেছেন। মহাদেব সাহা তাতেও অগ্রগামী থাকবেন। এসইউ
বিজ্ঞাপন Ad
পাঠকের মতামত
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বিজ্ঞাপন Ad
বিজ্ঞাপন Ad

সম্পাদক ও প্রকাশক: <b>ডি. হাসান. খান</b> | নির্বাহী সম্পাদক: <b>এ. এইচ. সুমন</b>
<div><b>বেলভিউ টাওয়ার ৭১ বীর উত্তম সিআর দত্ত রোড, হাতিরপুল, ঢাকা-১২০৫</b></div>