বিজ্ঞাপন
আর্থিক সংকটে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থীর পরবর্তী ধাপের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার অসম্ভব হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে তাদের বড় ভরসা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তি। এটি কেবল শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বা বই-খাতা কেনার খরচই মেটাচ্ছে না, বরং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, শিক্ষাবৃত্তি শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে আর্থিক চাপ অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। ফলে তরুণ প্রজন্ম ব্যাংক ঋণ বা পারিবারিক দেনার বোঝা ছাড়াই শিক্ষা জীবন শেষ করার সুযোগ পাচ্ছে। এটি একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মানসিক দুশ্চিন্তা দূর করে পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করছে, অন্যদিকে তাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। তাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা শিক্ষাবৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এসব শিক্ষাবৃত্তির আবেদনের বিজ্ঞপ্তি ফলাফল প্রকাশের পরপর, আবার কিছু আবেদন কয়েক মাস পর প্রকাশিত হয়। এসব আবেদন বেশির ভাগই অনলাইন নেওয়া হয়ে থাকে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর বৃত্তি
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এবং মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মেধাবৃত্তি ও সাধারণ বৃত্তি দিয়ে থাকে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর মাধ্যমে ফলাফলের ভিত্তিতে এ বৃত্তি দেওয়া হয়। সাধারণত ফলাফল প্রকাশের কয়েকমাস পর এ বৃত্তির কার্যক্রম শুরু হয়। এজন্য বৃত্তিপ্রত্যাশীদের অধিদপ্তর ও শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইটে নিয়মিত ভিজিট করতে হবে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তি
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার পরপরই ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের শিক্ষাবৃত্তির আবেদনের সময় ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। মেধাবী ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য এ শিক্ষাবৃত্তি। যোগ্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করেছে ব্যাংকটি। আবেদন করা যাবে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত প্রার্থীদের তালিকা ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
বৃত্তির জন্য এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় চতুর্থ বিষয় বাদে সিজিপিএর নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হবে। সিটি করপোরেশন এলাকার স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ থাকতে হবে। একইভাবে জেলা শহর এলাকার স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও জিপিএ-৫ পেতে হবে। তবে গ্রামীণ ও অনগ্রসর অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম জিপিএ ৪ দশমিক ৮৩ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বৃত্তির আওতায় এইচএসসি পর্যায়ে দুই বছর শিক্ষার্থীদের সহায়তা দেওয়া হবে। প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে বৃত্তি দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি পাঠ্য উপকরণের জন্য বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য বছরে এক হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হবে।
বৃত্তির ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নীতিমালাও নির্ধারণ করেছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। সরকারি বৃত্তি ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা এ বৃত্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। এছাড়া গ্রামীণ ও অনগ্রসর এলাকায় অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য মোট বৃত্তির ৯০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট বৃত্তির ৫০ শতাংশ ছাত্রীদের দেওয়ার কথা জানিয়েছে ব্যাংকটি।
যোগ্য ও আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আবেদনের জন্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে (https://app.dutchbanglabank.com/DBBLScholarship) এ প্রবেশ করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবির স্ক্যান কপি, বাবা-মায়ের পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবির স্ক্যান কপি এবং এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার নম্বরপত্র ও প্রশংসাপত্রের স্ক্যান কপি সংযুক্ত করতে হবে।
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন বৃত্তি
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয় শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন। সাধারণত এইচএসসি বা সমমান পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য এ বৃত্তির আবেদন আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অনলাইনে আবেদন করতে হবে।
সম্প্রতি ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের শিক্ষা বৃত্তি কার্যক্রমের আওতায় ‘শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন’ এ বৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা করা হয়। এ জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পুনর্বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
বৃত্তির জন্য বিভাগীয় শহর বা সিটি করপোরেশন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম জিপিএ-৫ থাকতে হবে। একই এলাকার অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম জিপিএ-৪.৮০ থাকতে হবে।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম জিপিএ-৪.৮০ এবং অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম জিপিএ-৪.৫০ থাকতে হবে।
বৃত্তির জন্য আগ্রহী প্রার্থীকে অনলাইনে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও অনলাইনে আপলোড করতে হবে। সরাসরি বা অন্য কোনো মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ নেই।
বৃত্তির ক্ষেত্রে আবেদনকারীর পরিবারের আর্থিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোনো আবেদনকারীর বাবা, মা বা অভিভাবকের বার্ষিক আয় দুই লাখ টাকার বেশি হলে তার আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
২০২৫ সালে এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং বর্তমানে এইচএসসি বা সমমান পর্যায়ে অধ্যয়নরত যোগ্য শিক্ষার্থীদের আগামী ২৭ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। বৃত্তির জন্য আবেদন করা যাবে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে (https://scholarship.sjiblbd.com/)। আবেদনকারীদের নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র আপলোড করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক ও সমমান শ্রেণিতে (একাদশ ও আলিম ১ম বর্ষে) ভর্তিকৃত আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হয়ে থাকে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃতদের ইতোমধ্যে আবেদন শেষ হয়েছে। আবেদনকারী অভিভাবকের বার্ষিক আয় তিন লাখ টাকা বা তার কম হতে হবে।
সোনালী ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তি
সোনালী ব্যাংক পিএলসি শিক্ষা বৃত্তি দিয়ে থাকে। এইচএসসি বা সমমান পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে দেশের দরিদ্র, মেধাবী এবং অনগ্রসর গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের এই বৃত্তি দেওয়া হয়।
সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচি
সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সরকার উপবৃত্তি দিয়ে থাকে। তবে শিক্ষার্থী অন্য কোনো সরকারি উৎস থেকে উপবৃত্তি অথবা অভিভাবক কর্তৃক শিক্ষা ভাতা গ্রহণ করলে উপবৃত্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। এ ছাড়া শিক্ষা বোর্ড থেকে মেধা বা সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী উপবৃত্তি প্রাপ্তির জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড
প্রবাসীকর্মীদের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি দেয় সরকার। বাংলাদেশ ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে এ শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়।
মেঘনা গ্রুপের শিক্ষাবৃত্তি
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড নাম্বার ওয়ান-এর উদ্যোগে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের চা-দোকানি বাবা-মায়ের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সন্তানদের সম্মান জানাতে আবারও শুরু হয়েছে ‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান সংবর্ধনা ২০২৬’-এর আবেদন। নির্বাচিতরা এককালীন শিক্ষা বৃত্তিসহ এইচএসসি অল সাবজেক্ট অনলাইন কোর্স, সনদ-ক্রেস্ট, সংবর্ধনা মেডেল এবং বিশেষ উপহার পাবে।
এই উদ্যোগের আওতায় দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের চা-দোকানি বাবা-মায়ের এসএসসি ও সমমান ২০২৬ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সন্তানসহ পুরো পরিবারকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পাবে এককালীন শিক্ষা বৃত্তি, এইচএসসি অল সাবজেক্ট অনলাইন কোর্স, সনদ, ক্রেস্ট এবং বিশেষ উপহার।
জিপিএ-৫ প্রাপ্ত আগ্রহী শিক্ষার্থীরা www.no1family.com ওয়েবসাইটে গিয়ে আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত বিনামূল্যে আবেদন করতে পারবে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচিত কৃতী সন্তান এবং তাদের বাবা-মাকে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তি
গত বছর এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক দাতব্য সংগঠন মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তিতে সহায়তা ও মাসিক বৃত্তি দিতে মেধাবী ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদনপত্র গ্রহণ করেছিল।
এএএইচ/এমএমএআর
বিজ্ঞাপন