বিজ্ঞাপন
রাকিব ও সাকিব (ছদ্মনাম) দুই বন্ধু। দুজনই ভালো ফলাফলের জন্য তুমুল আলোচিত নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলে ২০২৪ সালে নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে বছর বোর্ডের অধীনে একসঙ্গে রেজিস্ট্রেশন করে তারা। একসঙ্গেই এ বছর তাদের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। রাকিব পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার মুখে হাসি, পরিবারে উচ্ছ্বাস।
কিন্তু ভিন্ন চিত্র সাকিবের পরিবারে। সেখানে এখন শুধুই চাপা কান্না। কারণ, সাকিব এবার পরীক্ষাতেই বসতে পারেনি। একই বিদ্যালয়ে পড়ে, একসঙ্গে রেজিস্ট্রেশন করেও ‘নির্বাচনি পরীক্ষা’ নামক কাঁটা পায়ে বিঁধে থমকে গেছে সাকিবের পথচলা। শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে গেছে একটি বছর। মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছে এ শিক্ষার্থী।
অথচ শিক্ষা বোর্ড বলছে, নির্বাচনি পরীক্ষায় পাস ও ফেল বলে কিছু নেই। শুধু অংশগ্রহণ করলেই তাকে এসএসসির বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করাতে বাধ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
কিন্তু ভালো ফল দেখানোর নেশায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে ‘নামি’ বলে পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তার মধ্যে অন্যতম নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল। এ স্কুল থেকে শুধু সাকিব নয়, একইভাবে ২১৯ জন শিক্ষার্থী ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। স্কুলটির সাফল্যের খবর নিয়ে তুমুল উচ্ছ্বাসের মধ্যেই সামনে আসছে অন্ধকার দিকটিও।
ঢাকা বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলসহ বেশ কিছু স্কুলের বিরুদ্ধে টেস্ট পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তারা। প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নবম থেকে এসএসসি, ঝরে গেছে ২১৯ শিক্ষার্থী
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস্ থেকে মোট ৬০১ জন শিক্ষার্থী নবম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন করে। অথচ এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে ৩৮২ জন। অর্থাৎ, নবম থেকে দশম শ্রেণি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় বসার আগেই ঝরে পড়েছে ২১৯ শিক্ষার্থী।
এসএসসির ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্বসিত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা/ফাইল ছবি
প্রশ্ন উঠেছে—ফলাফলের দিক থেকে এতো ভালো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেন ২১৯ জন শিক্ষার্থী ঝরে যাবে? দুই বছরে এতো শিক্ষার্থী ঝরে গেলে সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে শ্রেষ্ঠ হয়?
অভিভাবক ও বোর্ড কর্মকর্তার অভিযোগ, মূলত নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল কৌশলী নিয়ম অনুসরণ করে। তারা প্রথমত—টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন অস্বাভাবিক কঠিন ও জটিল করে। দ্বিতীয়ত—খাতা মূল্যায়নের সময় উত্তর লিখলে বোর্ড পরীক্ষায় যেখানে ১০ নম্বর দেওয়া হয়, টেস্টের খাতায় সেখানে স্কুলের শিক্ষকরা ৫ নম্বর দেন। এতে যারা টেস্টে পাস করে, তারা বোর্ডের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার উপযোগী ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছুটা দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা ঝরে যায়। এতে বোর্ড পরীক্ষায় স্কুলের শতভাগ পাস ও শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জন হয় এবং নামমাত্র খ্যাতি বাড়ে।
আরও পড়ুন
নাছিমা কাদির মোল্লায় ৩৮২ শিক্ষার্থীর সবাই পেলো জিপিএ-৫
জানা যায়, এ কৌশল অবলম্বন করে চার বছর শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের খ্যাতি কামিয়েছে স্কুলটি। ২০১৭, ২০২২, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে শতভাগ জিপিএ-৫ পায় স্কুলটির শিক্ষার্থীরা। প্রত্যেকবারই নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল কর্তৃপক্ষ একই কৌশল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যদিও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন স্কুলটির সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীরা এসব কথা বলেন। এটা নতুন নয়, আমাদের বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে এ ষড়যন্ত্র চলছে। এসব কথা সত্য নয়।’
ঝরে পড়লো কেন, নির্বাচনি পরীক্ষায় কী ঘটেছিল
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলে ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৬০১ জন। তাদের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে দশম শ্রেণিতে ওঠে ৪৮৩ জন। এতে নবম থেকে দশমে উঠতেই ১১৮ জন ঝরে যায়। দশম শ্রেণিতে যে টেস্ট বা নির্বাচনি পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে ৩১৪ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। বাকি ১৬৯ জন বাদ পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, নাছিমা কাদের মোল্লা স্কুলে নির্বাচনি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পেলে সেসব শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না। তারা এসএসসির বোর্ড পরীক্ষায়ও অংশ নিতে দেওয়া হয় না।
আরও পড়ুন
এসএসসিতে জিপিএ-৩-এর নিচে ৫০.৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী
যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছিম কাদির মোল্লা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি দাবি করেন, প্রথম দফায় টেস্ট পরীক্ষায় ১৬৯ জন এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করে। ফেল করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওই শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষা (রিটেক) নেওয়া হয়। তাতে ৬৮ জন উত্তীর্ণ হয়। বাকি ১০১ জন নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি বলে বাদ দেওয়া হয়।
নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল/ফাইল ছবি
কামাল হোসেনের দাবি, বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকরা তৎকালীন নরসিংদী জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছেও গিয়েছিলেন। সেখানেও একটি টেস্ট নেওয়া হয়। তাতেও ওই শিক্ষার্থীরা ফেল করেছিল।
তিনি বলেন, ‘ডিসি একটি কমিটি করে দিয়েছিলেন। তারা আমাদের স্কুলে এসেও তদন্ত করে গেছেন। খাতা দেখে গেছেন। আমাদের কোনো ফল্ট (ত্রুটি) ধরা পড়েনি। কারণ অভিভাবকরা অঙ্গীকার করেই ভর্তি করেছিলেন যে, তাদের সন্তান এক বা একাধিক বিষয়ে ৩৩ শতাংশ নম্বর না পেলে তাদের আমরা পরীক্ষা দিতে দেবো না।’
নির্বাচনি পরীক্ষায় ‘টেনেটুনে’ পাস করেও বোর্ডে জিপিএ-৫!
স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি—তাদের ৩১৪ ছাত্র-ছাত্রী নির্বাচনি পরীক্ষায় পাস করেছিল। রিটেক বা পুনরায় নেওয়া পরীক্ষায় আরও ৬৮ জন পাস করে। তাহলে টেনেটুনে পাস করা শিক্ষার্থীরা তিনমাসের ব্যবধানে কীভাবে সবাই জিপিএ-৫ পেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে শিক্ষকদের বিশেষ পরিচর্যা ও শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের কারণে পিছিয়ে পড়ারাও জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে দাবি করছেন সহকারী প্রধান শিক্ষক কামাল হোসেন। তার ভাষ্য, ‘নির্বাচনি পরীক্ষার পরের তিনমাস স্কুলে সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাস নেওয়া হয়েছিল। প্রতি শিফটে তিনজন করে শিক্ষক সেখানে সার্বিক তত্ত্বাবধান করে শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। সেজন্যই এমন অভাবনীয় সাফল্য এসেছে।’
অভিভাবকদের অভিযোগের অন্ত নেই
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রেশন করেও এসএসসি পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের অভিযোগের শেষ নেই। পরীক্ষা দিতে না পারা দুজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছে জাগো নিউজ। তারা কেউ নাম-পরিচয় প্রকাশ করে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি।
এক ছাত্রের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে ক্লাস ফাইভ (পঞ্চম) শ্রেণি থেকে নাছিমা কাদির মোল্লায় পড়ছে। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতেও পড়লো, প্রতিবছর পাস করলো। অথচ টেস্ট পরীক্ষায় ফেল! তাহলে এর দায় শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের নাকি শিক্ষার্থীর?’
আরও পড়ুন
১৫ শিক্ষকের পাঁচ শিক্ষার্থী, তবুও পাস করেনি কেউ
তিনি আরও প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘যে ছেলেটা নবম শ্রেণিতে ভালো নম্বর নিয়ে পাস করে দশম শ্রেণিতে উঠলো, সে কেন টেস্টে ফেল করলো? কী ধরনের প্রশ্ন হলো আর কীভাবে খাতা দেখা হলো—এটা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম। কিন্তু তাদের ক্ষমতা অনেক বেশি। ডিসিও তাদের পক্ষে থাকেন। আমরা নিরূপায়।’
আরেক ছাত্রের বাবা বলেন, ‘স্কুলের শিক্ষকদের কৌশল হলো—তারা দুর্বল ছাত্র রাখবে না। শুধু ভালো ছাত্র রাখবে। ভালো ছাত্রকে পড়িয়ে জিপিএ-৫ পেলে তাতে শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের ক্রেডিট (অবদান) কোথায়? আর সবাইকে জিপিএ-৫ পেতে হবেই বা কেন? কেউ কি এর চেয়ে কম পেয়ে পাস করে জীবনে ভালো করতে পারে না। তাহলে জিপিএ-৫ না পেলে তাকে কেন টেস্টে বাদ দেওয়া হবে, এটাই আমাদের প্রশ্ন। কেন একটি বছর নষ্ট করে দেওয়া হলো?’
নির্বাচনি পরীক্ষায় ফেল করলেই বাদ, কী বলছে শিক্ষা বোর্ড
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল কর্তৃপক্ষ নির্বাচনি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি বলে স্বীকার করেছে। যদিও অভিযোগ রয়েছে, তারা শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের এসএসসির ফরম পূরণ করতে দিয়েছে। এক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি ধরলেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে জানিয়েছন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান।
এসএসসির ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্বসিত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা/ফাইল ছবি
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নির্বাচনি বা টেস্ট পরীক্ষায় পাস বা ফেল হিসাব কষা হবে কেন? সেখানে তো পাস বা ফেলের কিছু নেই। শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেবে, তাহলেই সে ফরম পূরণ করতে পারবে। বাছাই করার কোনো নিয়ম বা সুযোগ নেই। এ বাছাই শুধু নিজেদের স্কুলের কথিত ভালো ফল জাহির করতে করা হয়।’
ঢাকা বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা খুব শিগগির শতভাগ পাস ও শতভাগ ফেল—দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদেরই ডাকবো, মতবিনিময় করবো। জানতে চাইবো কীভাবে তাদের শতভাগ পাস হলো? তারা শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষার নামে বাদ দিলো কেন? আবার যারা শতভাগ ফেল করলো, তাদেরও এটা কেন ঘটলো, তা জানতে চাইবো। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পথে আমরা হাঁটছি।’
ফেলের জন্য শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক দায়ী
শিক্ষার্থীর ফেল করার দায় কোনোভাবেই শিক্ষার্থীর কাঁধে নয়, শিক্ষককে নিতে হবে বলে মনে করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শতভাগ পাস ও শতভাগ জিপিএ-৫ পেলেই সেই প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমরা লাফালাফি করি। ভেতরে প্রবেশ করে কিন্তু দেখি না। নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলের মতো আরও এমন স্কুল আছে, যাদের এমন ফলাফলের পেছনে হাজারও শিক্ষার্থীর কান্না লুকিয়ে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ফেল করা শিক্ষার্থীর দায় শিক্ষকের কাঁধে যায়। কাউকে আপনি পাঁচ বছর পড়ালেন, তাকে টেস্টে ফেল করিয়ে বললেন তুমি এসএসসির ফরম পূরণ করতে পারবে না। কারণ তুমি ভালো করোনি। এ ভালো না করার দায় শিক্ষকের এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের। একই সঙ্গে শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা প্রশাসনেরও দায় রয়েছে। তাদেরও নজরদারির অভাব স্পষ্ট।’
‘এ ধারা বদলে ফেলতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বদল আনতে হবে। যেখানে ফেল বলে কিছু থাকবে না। শুধু শেখা ও না শেখার মাত্রা নির্ণয় করা হবে’—যোগ করেন ড. মনজুর।
এএএইচ/এমকেআর
বিজ্ঞাপন