বিজ্ঞাপন
সার সংকট দ্রুত নিরসন এবং ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নে কৃষকের স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় কৃষক শক্তি।
বুধবার (১২ আগস্ট) সংগঠনটির আহ্বায়ক সাঈদ উজ্জ্বল ও সদস্য সচিব কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান। সার সংকট নিরসনে ৮ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন তারা।
বিবৃতিতে বলা হয়, কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে, নির্ধারিত মূল্যে ও সহজলভ্যভাবে সার পৌঁছে দেওয়া কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম পূর্বশর্ত।অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫’ বর্তমান সরকার সংশোধন করেছে। নতুন ব্যবস্থায় একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপের সুযোগ বাতিল এবং ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডিলার ইউনিট পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে জাতীয় কৃষক শক্তি। তাদের দাবি, এ ব্যবস্থা বাতিল হলে ডিলারকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে পারে এবং কৃষকরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বেন। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ডিলারশিপ কেন্দ্রীভূত হলে একটি ইউনিয়ন বা পৌরসভার তিনজন ডিলারও স্থানীয় সিন্ডিকেটে পরিণত হতে পারেন। তাই ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সুপারিশের পরিবর্তে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতাকে একমাত্র ভিত্তি করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
আরও পড়ুন
সার ডিলার সংক্রান্ত সংশোধিত নীতিমালা প্রকাশ
সৌদি-মরক্কো থেকে ৯০৩ কোটি টাকার সার আমদানি করবে সরকার
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সার সংকট ও সরবরাহ ঘাটতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় কৃষক শক্তি বলেছে, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার দ্রুত সরবরাহ করতে হবে। পাশাপাশি মজুত ও বিতরণ ব্যবস্থার তদারকি জোরদার এবং কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি ওয়ার্ডের চলমান ফসলের চাহিদার ভিত্তিতে সার বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কৃষকদের ওই ওয়ার্ডের ডিলার পয়েন্ট থেকে সার দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে তারা।
সংগঠনটি সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা পুরোপুরি ডিজিটালাইজড করার আহ্বান জানিয়েছে। স্মার্ট কৃষি কার্ডে কৃষকের জমির পরিমাণ ও সারের চাহিদার তথ্য থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তারা বলেছে, নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে কোন ডিলার কত সার পেয়েছেন, কতটুকু মজুত রয়েছে এবং কোন কৃষক কত সার কিনছেন—এসব তথ্য দৃশ্যমান করা হলে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির সুযোগ কমবে।
দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে সার বিক্রি করে আসা খুচরা বিক্রেতাদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনার দাবি জানিয়েছে জাতীয় কৃষক শক্তি। যোগ্য পুরনো খুচরা বিক্রেতাদের নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া, অন্যদের স্বল্পসুদে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং তাদের দোকান ও অবকাঠামোকে ‘কৃষক সেবাকেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
আরও পড়ুন
সার সিন্ডিকেটের পকেটবন্দি প্রশাসন?
সার কিনতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা, মহাসড়কে কৃষকদের বিক্ষোভ
জাতীয় কৃষক শক্তির ৮ দফা দাবি
যৌথ বিবৃতিতে আটটি দাবি তুলে ধরেন জাতীয় কৃষক শক্তির নেতারা। দাবিগুলো হলো—
অভিযোগ কেন্দ্র: কৃষকের অভিযোগ জানানোর জন্য সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
কঠোর তদারকি ও শাস্তি: নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি, মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা কৃষকের প্রতি যেকোনো হয়রানির বিরুদ্ধে নীতিমালায় কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ডিলারশিপ বাতিল: ডিলার কর্তৃক সংঘটিত অনিয়ম প্রমাণিত হলে অবিলম্বে ডিলারশিপ বাতিলের বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
সাব-ডিলার নিয়োগে কৃষকদের অগ্রাধিকার: সাব-ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহী কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি বন্ধ: ডিএপি সারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আরও পড়ুন
সারের কোনো সংকট নেই: কৃষিমন্ত্রী
মিয়ানমারে পাচারের সময় ২৪৫০০ কেজি সার জব্দ, আটক ৬ পাচারকারী
আমন মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকটের শঙ্কা: ডিলারশিপ পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র সারের বাজারে অরাজকতার আশঙ্কা করছে জাতীয় কৃষক শক্তি। যা আমন মৌসুম মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ডিলারশিপ পুনর্বণ্টন যেন আসন্ন আমন মৌসুমে সারের সরবরাহ যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সে লক্ষ্যে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য সরকারকে আহ্বান করছি।
জৈব সারে প্রণোদনা: রাসায়নিক সারের বেশিরভাগ আমদানি করতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচ অনেকাংশে বেড়ে যায়। সেইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় করতে হয় এর পেছনে। আমরা যদি রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারি জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি করার মাধ্যমে তাহলে কৃষি উৎপাদন খরচ কমবে। সেইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমবে। তাই জৈবসার ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে কৃষককে প্রণোদনা প্রদানের আহ্বান করছি।
কৃষক ভর্তুকি বহাল: দেশি ও আন্তর্জাতিক নানা মহল কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভর্তুকি হ্রাস করার জন্য সরকারকে চাপ প্রয়োগ করছে বলে জানা যাচ্ছে। সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, কৃষকের উৎপাদন খরচ ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো মহলের চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে কৃষি সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ভর্তুকি যেন বহাল রাখা হয়।
আরও পড়ুন
ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা / ৬৮ ধরনের অনিয়ম, হিসাব মিলছে না ৪ হাজার কোটি টাকার
নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ / ডিলারশিপ বহাল ও কমিশন দ্বিগুণ করার দাবি বিএফএ’র
জাতীয় কৃষক শক্তি মনে করে, সার কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের সম্পদ নয়; এটি কৃষকের উৎপাদনের অপরিহার্য উপকরণ। তাই নতুন নীতিমালার বাস্তবায়ন হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।
ডিলার সিন্ডিকেট নয়, কৃষকের সরাসরি সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিমালার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত খুচরা বিক্রেতাদের পুনর্বাসন করতে হবে এবং চলমান সার সংকট দ্রুত দূর করতে হবে।
এনএস/এমএমএআর
বিজ্ঞাপন