বিজ্ঞাপন
সকালে গোয়ালঘর পরিষ্কার করার পর যে গোবর একসময় ফেলে দিতে হতো, সেটিই এখন একটি পরিবারের রান্নার জ্বালানি। আবার সেই গোবর প্রক্রিয়াজাত করার পর পাওয়া যাচ্ছে জমির জন্য জৈব সার। অর্থাৎ একই সম্পদ থেকে মিলছে দুই ধরনের ব্যবহার। এতে কাঠ-খড় কেনা বা সংগ্রহের ঝামেলা কমছে, রান্নার খরচ বাঁচছে; পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতাও কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বগুড়ার গ্রামাঞ্চলে এমন ব্যবস্থার বিস্তার ঘটছে বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে। সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত এসব প্লান্টে গবাদিপশুর গোবর ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে গ্যাস উৎপাদন করা হচ্ছে। জেলার ১২টি উপজেলায় বর্তমানে চালু রয়েছে ৩৯৩টি প্লান্ট। এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৬১ হাজার ৯৬০ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। শুধু গ্যাসই নয়, একই প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার এবং ১৫ হাজার ৩০০ কেজি বায়ো-কেমিক্যাল উৎপাদনের তথ্য দিয়েছে জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর।
গোবরের ব্যবহার বদলে দিয়েছে সংসারের হিসাব
গাবতলী উপজেলার জামিরবাড়ীয়া গ্রামের গৃহবধূ শিমু বেগমের কাছে বায়োগ্যাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো রান্নার ঝামেলা কমে যাওয়া। তিনি বলেন, ‘আগে রান্নার জন্য কাঠ ও খড় সংগ্রহ করতে হতো। ধোঁয়ার কারণে রান্নাঘরে কাজ করাও কষ্টকর ছিল। এখন বায়োগ্যাসের চুলায় রান্না করায় সময় ও জ্বালানি দুটিই সাশ্রয় হচ্ছে।’
আরও পড়ুন
টঙ্গীর সাপ্তাহিক পশু-পাখির হাট থেকে যা যা কিনবেন
একই গ্রামের উদ্যোক্তা সাথী খাতুনের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তবে তার কাছে বায়োগ্যাসের সুবিধা শুধু রান্নার জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, ‘আগে গরুর গোবরের তেমন কোনো ব্যবহার ছিল না। এখন সেই গোবর থেকেই গ্যাস তৈরি হচ্ছে। আবার প্লান্ট থেকে পাওয়া জৈব সার জমিতে ব্যবহার করা যাচ্ছে। ফলে একটি সম্পদ থেকেই একাধিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।’
গ্রামের এই পরিবর্তনকে সংশ্লিষ্টরা দেখছেন গ্রামীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার নতুন সুযোগ হিসেবে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত গবাদিপশু পালন করে, তাদের জন্য গোবর এখন আর শুধু বর্জ্য নয়; বরং জ্বালানি ও কৃষি উপকরণের কাঁচামাল।
৩৯৩ প্লান্টে প্রতিদিন ৬২ হাজার ঘনফুট গ্যাস
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার ১২টি উপজেলায় বর্তমানে ৩৯৩টি বায়োগ্যাস প্লান্ট রয়েছে। এসব প্লান্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উপকারভোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৬৪০ জন। প্রকল্প শুরুর পর থেকে এসব উদ্যোগে ৫ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বায়োগ্যাস শুধু জ্বালানি ব্যবস্থার অংশ নয়, এর সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং আত্মকর্মসংস্থানের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
জেলায় তিনটি বায়োগ্যাস পল্লীও গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ধুনট উপজেলার পাঁচথুপী ও গোসাইবাড়ী এবং গাবতলী উপজেলার জামিরবাড়ীয়া রয়েছে। জামিরবাড়ীয়ায় ৩৬টি পরিবার নিজেদের গবাদিপশুর গোবর ব্যবহার করে রান্নার গ্যাসের চাহিদা মেটাচ্ছে।
গ্যাসের পর বাকি অংশও ফেলনা নয়
বায়োগ্যাস প্লান্টের ডাইজেস্টারে গোবর ও পানি দেওয়ার পর বায়ুশূন্য পরিবেশে জৈব পদার্থ পচে মিথেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি হয়। পাইপের মাধ্যমে সেই গ্যাস রান্নার চুলায় পৌঁছে যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী ভালভ দিয়ে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু এখানেই প্রক্রিয়া শেষ নয়। গ্যাস উৎপাদনের পর ডাইজেস্টারে যে অবশিষ্টাংশ থাকে, সেটিই ব্যবহার করা হয় জৈব সার হিসেবে।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বগুড়ার প্লান্টগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৩ কেজি জৈব সার পাওয়া যাচ্ছে। কৃষিতে এর ব্যবহার বাড়ানো গেলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিশেষজ্ঞ বজলুর রশিদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে অনেক জমির জৈবগুণ কমেছে। বায়োগ্যাস প্লান্টের জৈব সার মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, অণুজীবের কার্যক্রম সক্রিয় থাকে এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, গোবর খোলা জায়গায় পড়ে থাকলে দুর্গন্ধ, মাছি-মশার উপদ্রব ও পরিবেশ দূষণ বাড়ে। বায়োগ্যাস প্লান্টে ব্যবহারের মাধ্যমে সেই সমস্যাও অনেকাংশে কমানো যায়।’
আরও পড়ুন
কম খরচে আগাম শিম চাষ, এক কৃষকেরই ২ লাখ টাকা বিক্রির আশা
শুধু চুলা নয়, বিদ্যুতের কাজেও ব্যবহারযোগ্য
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদিত বায়োগ্যাস শুধু রান্নার কাজেই ব্যবহার করতে হবে এমন নয়। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এ বিদ্যুৎ দিয়ে বাতি, ফ্যানসহ ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো যায়।
তবে বাস্তবে বগুড়ার অধিকাংশ প্লান্টের প্রধান ব্যবহার রান্নার জ্বালানি হিসেবে। পরিবারের নিজস্ব গবাদিপশুর গোবর ব্যবহার করে গ্যাস উৎপাদনের কারণে বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের প্রয়োজন কমে যায়।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘বায়োগ্যাসকে শুধু জ্বালানি প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর পুরো সুবিধা বোঝা যাবে না। এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি উৎপাদন ও আত্মকর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।’
একটি প্লান্ট চলতে পারে ৩৫ বছর
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সঠিকভাবে পরিচালনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট ৩৫ বছর পর্যন্ত কার্যকর রাখা সম্ভব। এর জন্য নিয়মিত নির্দিষ্ট পরিমাণ গোবর ও পানি ডাইজেস্টারে দিতে হয়। গোবরের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাস উৎপাদনও কমে যায়। ফলে গবাদিপশু পালনকারী পরিবারগুলোর জন্য এ প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।
তবে প্লান্ট স্থাপনের পর নিয়মিত কারিগরি সহায়তা না পাওয়া, প্রশিক্ষিত কারিগরের সংকট এবং প্রাথমিক বিনিয়োগের বিষয়টি এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের পর্যাপ্ত গবাদিপশু নেই, তাদের জন্য আলাদাভাবে গোবর সংগ্রহের ব্যবস্থা না থাকলে প্লান্ট চালু রাখা কঠিন হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সহজ শর্তে ঋণ, ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ এবং ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে আরও পরিবারকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব। বায়োগ্যাস প্লান্টের আরেকটি সুবিধা পরিবেশগত। জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার এসব প্লান্ট প্রতিদিন প্রায় ৪৭ হাজার ৬৫৩ ঘনফুট কার্বন নির্গমন কমাতে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে গোবর খোলা জায়গায় না রেখে ডাইজেস্টারে ব্যবহারের ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে কাঠ ও খড়কুটো পোড়ানোর প্রবণতা কমলে স্থানীয় পর্যায়ে ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ
বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কোনো একক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয় এবং বিকল্প প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন।’
তার মতে, বগুড়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করেও একই সঙ্গে জ্বালানি, কৃষি ও পরিবেশের সুফল পাওয়া সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে বায়োগ্যাস সম্প্রসারণ করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘ইমপ্যাক্ট-৩য় পর্যায় প্রকল্পের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, জৈব সার উৎপাদন ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কাজ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষকে এই প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।’
বগুড়ার গ্রামগুলোতে বায়োগ্যাসের গল্পটা শুধু বিকল্প চুলার গল্প নয়। একটি পরিবারের গোবর থেকে তৈরি হচ্ছে রান্নার জ্বালানি, সেই প্রক্রিয়ার অবশিষ্টাংশ যাচ্ছে জমিতে সার হিসেবে। ফলে একই সম্পদ থেকে কমছে সংসারের জ্বালানি ব্যয়, কমছে বর্জ্য, আবার কৃষিতেও ফিরছে জৈব উপাদান। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই বহুমুখী ব্যবহারই বায়োগ্যাসকে ধীরে ধীরে একটি সম্ভাবনাময় স্থানীয় ব্যবসা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা মডেলে পরিণত করছে।
এল.বি/কেএসকে
বিজ্ঞাপন