বিজ্ঞাপন
নতুন মৌসুম শুরুর আগেই বড় এক কৌশলগত ধাঁধার সামনে দাঁড়িয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হোসে মরিনহো। দলের আক্রমণভাগে প্রতিভার কোনো ঘাটতি নেই। বরং সমস্যা হচ্ছে- একসঙ্গে এত প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে কিভাবে মাঠে নামানো যায়, যাতে আক্রমণের ধারও থাকে, আবার মাঝমাঠের ভারসাম্যও নষ্ট না হয়। বিশেষ করে জুদ বেলিংহ্যাম, আরদা গুলের ও বার্নার্দো সিলভাকে একই একাদশে খেলানোই এখন পর্তুগিজ কোচের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মার্কা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন মৌসুম শুরুর আগে মাঝমাঠের সঠিক সমীকরণ খুঁজে পেতে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন মরিনহো। তিন তারকাকেই একসঙ্গে মাঠে দেখতে চান তিনি; কিন্তু তাদের স্বাভাবিক পজিশন ও খেলার ধরন বিবেচনায় নিলে কাজটি মোটেও সহজ নয়।
বেলিংহ্যাম ও গুলের- দুজনেরই পছন্দ মূলত আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকা। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের সামনে থেকে খেলা তৈরি করা, সুযোগ তৈরি করা এবং প্রয়োজনে গোলের জন্য বক্সে ঢুকে পড়া। অন্যদিকে বার্নার্দো সিলভাকে মরিনহো একটু নিচ থেকে খেলানোর পরিকল্পনা করছেন। পর্তুগিজ কোচ চান, অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডার মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং আক্রমণের সূচনা করবেন।
কাগজে-কলমে পরিকল্পনাটি দুর্দান্ত মনে হলেও মাঠে এর বাস্তবায়নই বড় প্রশ্ন। কারণ তিনজনই মূলত বল পায়ে সৃজনশীল এবং আক্রমণমুখী। ফলে একই সঙ্গে তাদের মাঠে নামালে মাঝমাঠে রক্ষণাত্মক ভারসাম্য কমে যেতে পারে। প্রতিপক্ষ তখন মাঝমাঠে জায়গা তৈরি করে দ্রুত রিয়ালের রক্ষণভাগের দিকে আক্রমণ চালানোর সুযোগ পেতে পারে।
মরিনহোর সামনে তাই মূল প্রশ্ন- বেলিংহ্যাম, গুলের ও বার্নার্দোকে কিভাবে একই ছকে খেলানো যায়?
বর্তমান পরিকল্পনায় কিলিয়ান এমবাপের ঠিক পেছনে খেলার জন্য বেলিংহ্যামই প্রথম পছন্দ। ইংলিশ মিডফিল্ডারের শারীরিক সক্ষমতা, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং বক্সে ঢুকে গোল করার দক্ষতা তাকে এই পজিশনের জন্য এগিয়ে রাখছে। গত মৌসুমগুলোতেও বেলিংহ্যাম দেখিয়েছেন, মাঝমাঠ থেকে উঠে এসে কিভাবে আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে হয়।
তবে প্রাক-মৌসুমে আরদা গুলেরও ওই পজিশনে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। বল পায়ে তার সৃজনশীলতা, পাস দেওয়ার ক্ষমতা এবং আক্রমণভাগের সঙ্গে বোঝাপড়া তাকে মরিনহোর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে এমবাপের সঙ্গে গুলেরের বোঝাপড়া নজর কেড়েছে। দুজনের মধ্যে দ্রুত পাস ও জায়গা বদলের ফলে রিয়ালের আক্রমণ আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গাতেই মরিনহোর ‘ত্রিমুখী’ দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেলিংহামকে বাইরে রাখলে হারাতে হবে তার গোল করার ক্ষমতা ও শারীরিক উপস্থিতি। গুলেরকে বেঞ্চে রাখলে কমে যাবে সৃজনশীলতা ও আক্রমণভাগে তার সূক্ষ্ম পাসিং। আর বার্নার্দোকে না খেলালে মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম সেরা অস্ত্রকে হারাবে দল।
তিনজনকেই যদি একসঙ্গে খেলানো হয়, তাহলে তাদের পেছনে একজন শক্তিশালী রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার প্রয়োজন। সেই জায়গায় ফেদেরিকো ভালভার্দে, অরেলিয়েন চুয়ামেনি কিংবা এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার মতো খেলোয়াড়দের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভালভার্দে থাকলে রিয়াল পাবে গতি, শক্তি ও বিপজ্জনক বক্স-টু-বক্স দৌড়। চুয়ামেনি তুলনামূলকভাবে বেশি রক্ষণাত্মক ভারসাম্য দিতে পারেন এবং দুই সেন্টারব্যাকের সামনে থেকে জায়গা বন্ধ করতে পারেন। অন্যদিকে কামাভিঙ্গার রয়েছে বল কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত আক্রমণে ওঠার সক্ষমতা।
তবে এখানেও ঝুঁকি আছে। বেলিংহ্যাম, গুলের ও বার্নার্দোকে একসঙ্গে খেলিয়ে তাদের পেছনে মাত্র একজন রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার রাখলে প্রতিপক্ষের দ্রুত আক্রমণের সময় রিয়ালের মাঝমাঠে জায়গা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চমানের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই দুর্বলতা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
অবশ্য মরিনহো জানেন, একটি দীর্ঘ মৌসুমে সব ম্যাচ একইভাবে খেলা সম্ভব নয়। চোট, প্রতিপক্ষ, ম্যাচের পরিস্থিতি এবং টুর্নামেন্টের গুরুত্ব অনুযায়ী একাদশে পরিবর্তন আনতেই হবে। সে কারণে বেলিংহ্যাম, গুলের ও বার্নার্দোর তিনজনকে সব ম্যাচে একসঙ্গে খেলানোর প্রয়োজনও নেই।
তবু নতুন মৌসুম শুরুর আগে এই তিন তারকার সমন্বয় রিয়ালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ দলটির আক্রমণভাগে এমবাপেকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ভয়ংকর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার পেছনে যদি বেলিংহ্যাম, গুলের ও বার্নার্দোর মতো তিনজন সৃজনশীল খেলোয়াড়কে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ইউরোপের যে কোনো রক্ষণভাগের জন্যই রিয়াল হয়ে উঠতে পারে আরও ভয়ংকর।
কিন্তু মরিনহোর সাফল্য নির্ভর করবে শুধু তারকাদের একাদশে জায়গা দেওয়ার ওপর নয়; বরং তাদের জন্য সঠিক ভারসাম্য তৈরি করার ওপর। আক্রমণে যতটা শক্তিশালী হওয়া যায়, রক্ষণেও যেন দলটি ততটাই সংগঠিত থাকে- এই সমীকরণই এখন সমাধান করতে হবে পর্তুগিজ কোচকে।
নতুন মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ কতটা সফল হবে, তার বড় একটি উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে এই মাঝমাঠের ধাঁধার সমাধানে। বেলিংহাম-গুলের-বার্নার্দো- তিন তারকার আক্রমণাত্মক প্রতিভাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে মরিনহো যদি সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পান, সেটিই হতে পারে রিয়ালের ট্রফি জয়ের অন্যতম বড় অস্ত্র।
আইএইচএস/
বিজ্ঞাপন