বিজ্ঞাপন
‘অনলাইনে প্রথম শ্রেণির টিকিট কেটেছি কিন্তু বিশ্রামাগারের টয়লেট ব্যবহার করতে চাইলে আমাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়, চাবি নেই। অথচ কিছুক্ষণ পর দেখি, টাকার বিনিময়ে অন্যদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে।’
এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশনে যাত্রীসেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ লিটন মিয়া নামের যাত্রী। তার মতো যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর যাতায়াত হলেও স্টেশনজুড়ে এখন অব্যবস্থাপনা। টিকিট কালোবাজারি, যাত্রী হয়রানি, বিশ্রামাগার দখল, সরকারি সম্পদের অযত্ন ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চললেও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো স্টেশন ব্যবস্থাপনাকে কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) সরেজমিন স্টেশন এলাকা ঘুরে, ভুক্তভোগী যাত্রী, স্থানীয় ব্যবসায়ী, সচেতন নাগরিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
আরও পড়ুন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন / লাগামহীন টিকিট কালোবাজারি, যাত্রীদের দুর্ভোগ
স্টেশনে গিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের চলাচলে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ন্ত্রিত হকারদের দৌরাত্ম্য এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি চোখে পড়ে। ট্রেন আসার আগেই বিভিন্ন শ্রেণির দালাল ও টিকিট সংগ্রহকারীদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। কয়েকজন যাত্রী অভিযোগ করেন, কাউন্টারে টিকিট না পেলেও অতিরিক্ত দামে টিকিট সংগ্রহের প্রস্তাব নিয়ে কিছু ব্যক্তি প্রকাশ্যেই ঘোরাফেরা করেন।
‘বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে রেলই সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে এই খাত কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। রেলকে সত্যিকার অর্থে গণমানুষের পরিবহনে পরিণত করতে হলে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে’
বৃষ্টি সাহা নামের এক যাত্রী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার কাছে প্রথম শ্রেণির টিকিট থাকা সত্ত্বেও স্টেশনের প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার ব্যবহার করতে পারিনি। সেখানে গিয়ে দেখি দরজায় তালা ঝুলছে। পরে জানতে পারি, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এক নারী বিশ্রামাগারটি নিয়ন্ত্রণ করেন। টাকা দিলে তালা খুলে ব্যবহার করতে দেন, আর টাকা না দিলে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেন।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারি বিশ্রামাগার যদি টিকিটধারী যাত্রীরা ব্যবহারই করতে না পারেন, তাহলে এমন সুবিধা থাকার কোনো অর্থ নেই।’
ভুক্তভোগী আরেক যাত্রী লাইলী আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন এলেও ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের পরিবেশের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনেক দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রি হলেও তদারকি নেই। যাত্রীরা অভিযোগ করলেও বেশিরভাগ সময় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।’
আরও পড়ুন
রেলওয়ের উদাসীনতা, কোটি টাকার প্রকল্পে মশা-ব্যাঙের বাসা
সাধারণ যাত্রীদের সুবিধার চেয়ে কিছু অসাধু চক্রের স্বার্থই এখানে বেশি গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ করেন স্টেশনে অবস্থানরত এহসানুল হক নামে এক যাত্রী।
‘আমার কাছে প্রথম শ্রেণির টিকিট থাকা সত্ত্বেও স্টেশনের প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার ব্যবহার করতে পারিনি। সেখানে গিয়ে দেখি দরজায় তালা ঝুলছে। পরে জানতে পারি, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এক নারী বিশ্রামাগারটি নিয়ন্ত্রণ করেন। টাকা দিলে তালা খুলে ব্যবহার করতে দেন, আর টাকা না দিলে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেন।’
তিনি বলেন, ‘কী আর বলবো! মানুষকে তারা মানুষই মনে করে না। ট্রেনের সঠিক তথ্যটা পর্যন্ত দিতে চায় না। কোনো বিষয় জানতে চাইলে বিরক্তবোধ করে।’
স্টেশনের ইয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ পুরোনো রেললাইন, সিগন্যালিং যন্ত্রাংশ, লোহার স্লিপার ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। অনেক যন্ত্রাংশ মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু অংশ মাটির নিচে চাপা পড়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন
যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ: প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ পর্যায়ে
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ পাহারা না থাকায় মাঝেমধ্যে এসব সরকারি মালামাল চুরি হয়ে যায়। কোটি টাকার সরকারি সম্পদ এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকলেও তা সংরক্ষণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
রেলওয়ের বিস্তীর্ণ সরকারি জমি দখল করে বিভিন্ন স্থানে দোকান, ঘরবাড়ি ও অস্থায়ী বাজার গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।স্থানীয়রা জানান, মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পরই আবার দখল হয়ে যায়।
‘ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন নিয়ে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে’
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি রেললাইন কেটে নাশকতার ঘটনা এবং পাগলা থানার দাইরেরপুর এলাকায় রেললাইনে ফাটল ধরা পড়ার মতো ঘটনা রেলপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই জংশনে নিরাপত্তা নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
রেলওয়ের মালামাল চুরি, বাড়ানো হচ্ছে গোয়েন্দা তৎপরতা
স্থানীয় নাগরিক নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘রেলওয়ের বিভিন্ন স্তরে গড়ে ওঠা অনিয়মের সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে যাত্রীসেবা কখনোই উন্নত হবে না। শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।’
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট আবুল কালাম আল আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে রেলই সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে এই খাত কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। রেলকে সত্যিকার অর্থে গণমানুষের পরিবহনে পরিণত করতে হলে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, ‘হকারদের কাছ থেকে আমি কোনো টাকা নিই না। ইউসুফ নামের একজন হকারের টাকা তোলার বিষয়টি শুনেছি। অভিযোগটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন
একটি ট্রেনের জন্য আর কত অপেক্ষা?
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. রুপম আনোয়ার বলেন, ‘ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন নিয়ে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসআর/এএসএম
বিজ্ঞাপন