বিজ্ঞাপন
ক্যামেরা হাতে ছবি তোলা এটাই ফটোগ্রাফির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যদি কোনো ক্যামেরা ছবি তুলতে থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, অথচ সেটি যে ছবি তুলতে রেখে এসেছিলেন তা-ই ভুলে যান ফটোগ্রাফার? অবিশ্বাস্য মনে হলেও এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল যুক্তরাজ্যের হার্টফোর্ডশায়ারের একটি মানমন্দিরে। প্রায় আট বছর পর খুঁজে পাওয়া সেই ‘ক্যামেরা’ থেকে বেরিয়ে আসে এমন এক ছবি, যেখানে একসঙ্গে ধরা পড়ে সূর্যের হাজার হাজার দিনের পথচলা।
ঘটনার শুরু ২০১২ সালে। তখন রেজিনা ভালকেনবর্গ যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারের একজন শিক্ষার্থী। ফটোগ্রাফি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অংশ হিসেবে তিনি তৈরি করেছিলেন খুবই সাধারণ একটি পিনহোল ক্যামেরা। তবে সেটি কোনো দামি ক্যামেরা ছিল না। বরং একটি খালি পানীয়ের ক্যান, ফটোগ্রাফিক পেপার এবং কিছু টেপ দিয়েই বানানো হয়েছিল সেটি।
ক্যানের গায়ে ছোট্ট একটি ছিদ্র করে তার ভেতরে রাখা হয়েছিল আলো-সংবেদনশীল ফটোগ্রাফিক পেপার। এরপর সেটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেফোর্ডবেরি অবজারভেটরির একটি টেলিস্কোপের গম্বুজের সঙ্গে স্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল সূর্যের গতিপথ দীর্ঘ সময় ধরে ধারণ করা। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর একসময় সেই ছোট্ট ক্যামেরাটির কথা রেজিনার মনেই ছিল না। আর সেখানেই শুরু হয় গল্পের সবচেয়ে আশ্চর্য অধ্যায়।
আট বছর ধরে চললো ‘একটি’ ছবি
২০১২ সালে স্থাপন করা সেই পিনহোল ক্যামেরা ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানেই পড়ে ছিল। অর্থাৎ প্রায় আট বছর এক মাস ধরে সেটি সূর্যের আলো গ্রহণ করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে পৃথিবী যেমন সূর্যের চারদিকে ঘুরেছে, তেমনি ঋতু বদলেছে, দিনের দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয়েছে। আর এসব পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে সেই ছোট্ট ক্যানের ভেতরের ফটোগ্রাফিক পেপারে।
২০২০ সালে মানমন্দিরের টেকনিক্যাল কর্মকর্তা ডেভিড ক্যাম্পবেল পুরোনো ক্যামেরাটি খুঁজে পান। এরপর যখন ভেতরের ফটোগ্রাফিক পেপারটি বের করা হয়, তখন সামনে আসে এক বিস্ময়কর দৃশ্য। ছবিতে সূর্যের গতিপথের প্রায় ২ হাজার ৯৫৩টি আলোকরেখা দেখা যায়। একটি ছবির মধ্যে যেন আট বছরের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ইতিহাস জমে আছে।
আরও পড়ুন
আলোকচিত্র: সময় যেখানে জীবন্ত!
দূর থেকে ছবিটিকে দেখলে হয়তো মনে হতে পারে এটি কোনো বিমূর্ত শিল্পকর্ম। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, ছবির ওপরের দিকে অসংখ্য বাঁকানো আলোর রেখা রয়েছে। প্রতিটি রেখা সূর্যের আকাশপথের একটি রেকর্ড। গ্রীষ্মে সূর্য তুলনামূলক উঁচু পথে চলেছে, শীতকালে তার পথ নেমে এসেছে নিচের দিকে। এভাবেই বছরের পর বছর সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তন একটির ওপর আরেকটি রেখা হিসেবে জমা হয়েছে।
ছবির নিচের অংশে মানমন্দিরের স্থাপনার কিছু অংশও দেখা যায়। ফলে এটি শুধু সূর্যের গতিপথের রেকর্ড নয়; আট বছর ধরে ওই স্থানের পরিবেশ ও স্থাপত্যেরও এক অনন্য দলিল হয়ে উঠেছে। এই ইতিহাসের আরেকটি চমক হলো এখানে ব্যবহার করা হয়নি কোনো অত্যাধুনিক ক্যামেরা, ব্যাটারি, মেমোরি কার্ড কিংবা বিশেষ সফটওয়্যার। একটি সাধারণ ক্যানই হয়ে উঠেছিল দীর্ঘমেয়াদি ক্যামেরা।
আরও পড়ুন
বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস / সংবাদে ছবি যুক্ত হলো কবে?
সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে এ ধরনের আট বছরব্যাপী এক্সপোজার করা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু পিনহোল ক্যামেরায় কোনো জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থা না থাকায় সেটি দীর্ঘ সময় ধরে আলো গ্রহণ করতে পেরেছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এই ছবিটি তৈরি করার পুরো সময়জুড়ে ক্যামেরাটির পাশে কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন না। কেউ প্রতিদিন সেটি পরীক্ষা করেননি, মেমোরি খালি করেননি কিংবা নতুন ছবি তোলার জন্য শাটার চাপেননি। ক্যামেরাটি শুধু সেখানে ছিল। সময় তার কাজ করে গেছে।
রেজিনার ভুলে যাওয়াই হয়ে গেল সাফল্যের কারণ
রেজিনার উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ এক্সপোজারের মাধ্যমে সূর্যের গতিপথ ধারণ করা। কিন্তু তিনি হয়তো কখনো ভাবেননি যে পরীক্ষাটি এত দীর্ঘ সময় চলবে। বরং ক্যামেরাটি ভুলে যাওয়ার কারণেই এটি এমন একটি ছবি তৈরি করতে পেরেছে, যা পরিকল্পনা করে তৈরি করা সম্ভবত আরও কঠিন হতো। এই ছবির সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই ফটোগ্রাফার মুহূর্তটিকে ধরতে পারেননি; বরং সময় নিজেই ছবিটি তৈরি করেছে।
২০২০ সালে আবিষ্কারের পর ছবিটিকে দীর্ঘতম ফটোগ্রাফিক এক্সপোজারের অন্যতম অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসও এটিকে দীর্ঘতম ফটোগ্রাফিক এক্সপোজার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সাধারণ একটি ছবিতে হয়তো একটি মুহূর্ত ধরা পড়ে একটি হাসি, একটি সূর্যাস্ত কিংবা কোনো বিশেষ ঘটনা। কিন্তু এই ছবিটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে একটি মুহূর্ত নয়, বরং আট বছরের সময় জমে আছে। ২ হাজার ৯৫৩টি সূর্যরেখা যেন বলে দেয় সময় কখনো থেমে থাকে না। আমরা হয়তো প্রতিদিন তার পরিবর্তন বুঝতে পারি না, কিন্তু দিনগুলো একসঙ্গে জমা হলে তার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কেএসকে
বিজ্ঞাপন