বিজ্ঞাপন
মায়া কিংবা আত্মীয়তার বন্ধন—সবকিছুকেই যেন আড়াল করে দিয়েছিল সম্পত্তির লোভ। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে জীবিত শাশুড়িকে কাগজপত্রে ‘মৃত’ বানিয়ে জমি লিখে নেওয়ার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সাবরেজিস্ট্রারের সন্দেহ ও তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদে ভেস্তে গেছে সেই অপচেষ্টা।
ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ঘটেছে এমনই জালিয়াতির ঘটনা। মৃত জহিরুল হকের স্ত্রী সাজেদা আক্তার তার শাশুড়ি হাজেরা খাতুনকে ‘মৃত’ দেখিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ও জমাখারিজ তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ফেনী পৌর এলাকার রামপুর মৌজার সাড়ে ৪ শতক জমি বিক্রি করা।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে সন্দেহ হয় ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মোহাম্মদ তামিমের। তথ্যে গরমিল দেখে তিনি সাজেদা আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সাজেদা স্বীকার করতে বাধ্য হন, তার শাশুড়ি প্রকৃতপক্ষে জীবিত আছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া মাত্রই সাবরেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং ভুয়া কাগজপত্রগুলো জব্দ করেন।
ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে হাজির হন প্রতারণার শিকার বৃদ্ধা হাজেরা খাতুন। তিনি সাবরেজিস্ট্রারের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং সঠিক সময়ে জালিয়াতি ধরে ফেলায় তাকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট জহিরুল হক মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে রেখে যান। তবে ওই বছরেরই জুলাই মাসে সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া এক ওয়ারিশ সনদে কৌশলে মায়ের নাম বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ওই জালিয়াতি করা সনদ দিয়েই জমি জমাখারিজ সম্পন্ন করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন
‘আপনার লাশ বিলের পানিতে ভাসিয়ে দেব’ ভূমি কর্মকর্তাকে সেবাগ্রহীতা
ফেনী ট্রাংক রোডের ব্যবসায়ী আবদুর রহিম। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটা শুনে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না! নিজের স্বার্থের জন্য মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, এটা তার একটা চরম উদাহরণ।’
সালমা আক্তার নামের একজন গৃহিণী বলেন, ‘খবরটা শোনার পর থেকে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। যেখানে আমাদের সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠ বা শাশুড়িকে সম্মান ও যত্নে রাখার কথা, সেখানে জমিলোভী স্বজনরাই তাকে জালিয়াতি করে মৃত বানিয়ে দিচ্ছে! এটা শুধু কোনো জমি বিক্রির চেষ্টা নয়, এটা পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়।’
সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক আবু ছালেহ টিপু জানান, তাকে যে ওয়ারিশ সনদ ও জমাখারিজ এনে দেওয়া হয়েছিল, তিনি সে অনুযায়ী দলিল প্রস্তুত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।
ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মোহাম্মদ তামিম জানান, জমি ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জালিয়াতি থেকে রক্ষা করতে ও শতভাগ সঠিক মালিকানা নিশ্চিতে তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ভুয়া কাগজপত্র ও তথ্য গোপন করে দলিল হস্তান্তরের চেষ্টা করা হলে তা আমাদের নজরে আসে। শাশুড়িকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া সনদ তৈরির বিষয়টি স্বীকার করায় দলিলটি জব্দ করা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি বা যেকোনো ধরনের প্রতারণা রোধে আমাদের এই কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।’
আবদুল্লাহ আল-মামুন/এসআর/জেআইএম
বিজ্ঞাপন