বিজ্ঞাপন
বিয়ের প্রলোভনে এক নারীকে ‘ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি’ দেওয়া শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা সহযোগী অধ্যাপক ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীকে দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তার বিরুদ্ধে দুই দফা তদন্ত হয়। এক দফায় অভিযোগ সন্দেহাতীত প্রমাণ হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদনেও মিলেছে ঘটনার সত্যতা।
প্রথম দফায় অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফা তদন্তে কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। তাতেও অভিযোগের ‘আংশিক প্রমাণ’ মিলেছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। তারপরও শুধুমাত্র সংরক্ষিত নারী আসনের এক সংসদ সদস্যের (এমপি) আধা-সরকারি পত্রের (ডিও লেটার) ভিত্তিতে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকির দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
দায়মুক্তি পাওয়া সহযোগী অধ্যাপক গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী জয়পুরহাট সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। ঘটনার সময়ে তিনি কর্মরত ছিলেন বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে। তার বিষয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন বগুড়া ও জয়পুরহাটের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) সুরাইয়া জেরিন রনি।
আরও পড়ুন
পদোন্নতিতে অনিয়ম / এখন ইইডির প্রধান প্রকৌশলী হতে বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতার দৌড়ঝাঁপ
গত ১৭ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের শৃঙ্খলাবিষয়ক শাখার সহকারী সচিব মো. আব্দুল জলিল মজুমদারের সই করা এক প্রজ্ঞাপন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রজ্ঞাপনের একটি কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদেরও মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে বিষয়টি।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধ স্পষ্টভাবে প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়ার মতো অপরাধ থেকে শুধু এমপির ডিও’র ওপর ভিত্তি করে দায়মুক্তি দেওয়াটা নিয়ম-বহির্ভূত। একই সঙ্গে এমন স্পর্শকাতর অভিযোগের তদন্ত চলাকালে একজন এমপির ডিও লেটার দেওয়াটাও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে বলছেন তারা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মাউশির তদন্তে ঘটনা প্রমাণ হওয়ার পর বিভাগীয় মামলায় তদন্ত করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। তিনি ফরেনসিক রিপোর্টসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমাও দেন। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত বলে উল্লেখ করেছেন। তারপরও একজন নারী এমপির ডিও লেটারে অপরাধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এ নিয়ে মুখ খুলছেন না মন্ত্রণালয়ের কেউ।
প্রজ্ঞাপনে ঘটনার বর্ণনা যেভাবে
‘জয়পুরহাট সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী আগে সরকারি আজিজুল হক কলেজে কর্মরত ছিলেন। সেসময় এক নারীকে (নাম গোপন রাখা হলো) বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তিনি। তাকে ঢাকা শহরে নিয়ে এসে কাজী ছাড়াই শুধু হুজুর দিয়ে বিয়ে করেন গাজী তৌহিদুল, যা পরবর্তীতে তিনি অস্বীকার করেন।’
মাউশির তদন্তে ঘটনা প্রমাণ হওয়ার পর বিভাগীয় মামলায় তদন্ত করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। তিনি ফরেনসিক রিপোর্টসহ তদন্ত প্রতিবেদন জমাও দেন। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত বলে উল্লেখ করেছেন। তারপরও একজন নারী এমপির ডিও লেটারে অপরাধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
‘বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলায় গাজী তহিদুল ওই নারী ও তার ছেলে সন্তানকে হত্যার হুমকি দেন। এ নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। তার ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মাউশি। মাউশির তদন্তে এসব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন/ ছবি- জাগো নিউজ
মাউশির কমিটির প্রতিবেদন মতে, ‘গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী নৈতিক চরিত্রস্খলনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়।’
আরও পড়ুন
শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব, বাস্তবায়ন ‘লেজেগোবরে’
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, ‘গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী নোটিশের জবাব প্রদান করেন এবং ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশগ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করায় গত ২২ জানুয়ারি তার ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করা হয়। শুনানিতে দেওয়া বক্তব্য সন্তোষজনক না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৭(২)(ঘ) অনুযায়ী তদন্তের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা বিস্তারিত তদন্ত শেষে গত ৬ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আংশিক প্রমাণিত হয়।’
দুই দফা তদন্তে প্রমাণিত, তারপরও কেন দায়মুক্তি?
প্রজ্ঞাপনে গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীকে দায়মুক্তির কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তার পক্ষে সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যের ডিও লেটারকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘দ্বিতীয় দফা তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আংশিক প্রমাণিত হলেও জাতীয় সংসদ, বগুড়া ও জয়পুরহাটের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন আধা-সরকারি পত্রে (ডিও লেটার) উল্লেখ করেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
আরও পড়ুন
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল / সাফল্যের হাসির আড়ালে অসংখ্য শিক্ষার্থীর চাপা কান্না
‘যেহেতু, বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী, তদন্ত প্রতিবেদন, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, বগুড়া-জয়পুরহাটের সংরক্ষিত মহিলা আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব সুরাইয়া জেরিন-এর আধা-সরকারি পত্র এবং বিভাগীয় মামলার প্রাসঙ্গিক রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় তাকে এ বিভাগীয় মামলার দায় হতে অব্যাহতি প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’
প্রজ্ঞাপনের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘সেহেতু, সার্বিক বিবেচনায় ড. গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক (বাংলা), জয়পুরহাট সরকারি কলেজ, জয়পুরহাট (প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক (বাংলা), সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া)-এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিধায় তাকে ভবিষ্যতে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ প্রদান করে এ বিভাগীয় মামলার দায় হতে নির্দেশক্রমে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।’
যে নারী অভিযোগ দিয়েছেন, উনি আওয়ামী লীগের লোক। ভুয়া অভিযোগ দিয়ে প্রমাণ করিয়েছেন। আবার আমাদের ম্যাডামের (সুরাইয়া জেরিন) বিরুদ্ধেও উনি মামলা করেছিলেন। সেজন্য এমপি শিক্ষকের পক্ষে ডিও দিয়েছেন।— এমপি সুরাইয়া জেরিন রনির একান্ত সহকারী ফুয়াদ হাসান
বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে গাজী তৌহিদুল আলম চৌধুরীকে মোবাইল ফোনে কল করলে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, প্রজ্ঞাপন হয়েছে। এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাই না।’ এরপর তিনি মোবাইল ফোনকল কেটে দেন।
অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তি কী, আইন যা বলছে
মাউশি ও মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির তদন্তে দুই দফায় অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। অথচ তাকে শুধুমাত্র এমপিও ডিও লেটারের ভিত্তিতে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী, এটি সম্পূর্ণ নিয়ম-বহির্ভূত।
আরও পড়ুন
চাঁদপুরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৬৪২ বিদ্যালয়
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী এমপির ডিও লেটার কর্তৃপক্ষের নিকট জমা করা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মাউশির সাবেক একজন মহাপরিচালক নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘ধর্ষণ ও হত্যার হুমকির মতো অপরাধ প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ হয়েছে। বিভাগীয় তদন্তেও আংশিক প্রমাণ হওয়ার কথা প্রজ্ঞাপনে রয়েছে। তারপরও যে প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী।’
আরও পড়ুন
১৮০ দিনের মূল্যায়নের মুখে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা, রদবদল নিয়ে জল্পনা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার সহকারী সচিব মো. আব্দুল জলিল মজুমদার। শৃঙ্খলাবিষয়ক শাখারও অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে জানতে তাকে মোবাইলে কল করা হলে ঘটনা শুনে কিছু না বলেই কল কেটে দেন। পরে তাকে কয়েক দফায় কল ও এসএমএস করেও আর সাড়া মেলেনি।
এ বিষয়ে জানতে ডিও লেটার দেওয়া সংসদ সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনির ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে কল দেওয়া হলে তার একান্ত সহকারী ফুয়াদ হাসান রিসিভ করেন। ঘটনা শুনে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে নারী অভিযোগ দিয়েছেন, উনি আওয়ামী লীগের লোক। ভুয়া অভিযোগ দিয়ে প্রমাণ করিয়েছেন। আবার আমাদের ম্যাডামের (সুরাইয়া জেরিন) বিরুদ্ধেও উনি মামলা করেছিলেন। সেজন্য এমপি মহোদয় শিক্ষকের পক্ষে ডিও দিয়েছেন।’
যদিও মাউশি চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ অভিযোগ তদন্ত করেছে। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত বিভাগীয় কমিটি গত জুলাই মাসে এ অভিযোগের তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়। দুই কমিটির একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এবং আরেক কমিটি বিএনপি সরকারের সময়ে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এএএইচ/কেএসআর
বিজ্ঞাপন