বিজ্ঞাপন
সরকার কি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে? প্রশ্নটি শুনতে খুব সহজ। কিন্তু এর উত্তর দেওয়ার আগে আরও একটি প্রশ্ন করা দরকার: আপনার প্রত্যাশা কী? একজন নাগরিক সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা করেছিলেন, তা যদি স্পষ্ট না থাকে, তাহলে পাঁচ মাস, এক বছর বা পাঁচ বছর পর কীভাবে বলা যাবে যে সরকার সফল হয়েছে, নাকি ব্যর্থ?
গণতন্ত্রে একটি সরকার শুধু ভোটে নির্বাচিত হয় না, ভোটের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারও গ্রহণ করে। মানুষ ভোট দেওয়ার সময় শুধু একজন প্রার্থী বা একটি দলকে নির্বাচন করে না, তারা একটি নির্দিষ্ট ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির ওপরও আস্থা রাখে। সেই প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে নির্বাচনী ইশতেহারে, রাজনৈতিক ঘোষণায়, দলীয় সংস্কার কর্মসূচিতে কিংবা জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
এটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক ভুল করার ঝুঁকি আছে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া আর জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দুই-তৃতীয়াংশ পথ অতিক্রম করা এক কথা নয়।
নির্বাচনে জয় সরকারকে ক্ষমতা পরিচালনার বৈধতা দেয়। কিন্তু সেই বৈধতা সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক প্রমাণ করে না। বরং বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের ওপর দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ বিরোধী দলের সাংসদ কম হতে পারে, কিন্তু জনগণের প্রশ্ন কমে যায় না। বরং তখন প্রশ্নটি আরও সরাসরি হয়: আপনাকে আমরা এত বড় ম্যান্ডেট দিয়েছি, এখন আপনি কী করবেন?
এখানে “প্রত্যাশা” শব্দটির একটি সমস্যা আছে। প্রত্যাশা যদি শুধু মানুষের মনের মধ্যে থাকে, তাহলে তা দিয়ে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা কঠিন। তাই প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে রূপ দিতে হয় এবং অঙ্গীকারকে পরিণত করতে হয় পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যে।
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতে ২৫ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ
বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে একটি ৯ দফা অগ্রাধিকারভিত্তিক ইশতেহার প্রকাশ করেছিল। সেখানে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা, যুব কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরকার, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর পাশাপাশি বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি এবং জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অর্থাৎ এবার জনগণের প্রত্যাশা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট নয়। অনেক প্রত্যাশাই লিখিত হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হওয়া উচিত: এই লিখিত অঙ্গীকারগুলোর কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে?
এখানেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি পুরোনো দুর্বলতা সামনে আসে। আমরা নির্বাচনের আগে ইশতেহার প্রকাশ করি, নির্বাচনের পরে সরকার গঠন করি, কিন্তু তারপর ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল নির্ধারণ করি না।
ফলে পাঁচ বছর পর যখন নতুন নির্বাচন আসে, তখন রাজনৈতিক বিতর্ক আবার শুরু হয়, কে কী করেছে, কে কী করেনি। কিন্তু জনগণের হাতে একটি সহজ হিসাব থাকে না। কোন প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে? কোনটি আংশিক হয়েছে? কোনটি হয়নি? কেন হয়নি? এর জন্য দায়ী কে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থাকা উচিত একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়।
সরকার অবশ্য বলছে, তারা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সরকারের নিজের বক্তব্যই যথেষ্ট নয়। কারণ গণতন্ত্রে সরকার একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষ এবং জবাবদিহির বিষয়। এখানেই নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
Transparency International Bangladesh-এর প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সরকারের কিছু উদ্যোগ জনমনে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করেছে, যেগুলো বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অসঙ্গতির উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এ ধরনের মূল্যায়নকে সরকারবিরোধিতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
একটি সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার অর্থ এই নয় যে ভোটাররা পরবর্তী পাঁচ বছর প্রশ্ন করার অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন। বরং ভোট দেওয়ার পর নাগরিকের দায়িত্ব শেষ হয় না, নতুনভাবে শুরু হয়। ভোট হলো অনুমোদন; জবাবদিহি হলো তার ধারাবাহিক পরীক্ষা।
তাহলে কি সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে? আজ, সরকারের মাত্র কয়েক মাসের কার্যক্রম দেখে চূড়ান্ত রায় দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এখন থেকেই একটি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে।
প্রতিটি বড় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির জন্য একটি নাগরিকভিত্তিক “delivery record” থাকা উচিত। সেখানে থাকবে পাঁচটি বিষয়: প্রতিশ্রুতি কী, বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার, সময়সীমা কত, অগ্রগতি কতদূর এবং জনগণের জীবনে এর ফল কী।
তাহলে রাজনৈতিক বিতর্কও বদলে যাবে। কেউ শুধু বলতে পারবে না, “আমরা অনেক কিছু করেছি।” তাকে বলতে হবে, “এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে এতগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, এতগুলো চলছে, এতগুলো হয়নি এবং না হওয়ার কারণ এটি।”
এটি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নয়। বরং সরকারকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। কারণ একটি সরকার যদি নিজের প্রতিশ্রুতির হিসাব নিজেই প্রকাশ করে, তাহলে জনগণের আস্থাও বাড়ে।
আরেকটি প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ: জনগণ অসন্তুষ্ট হলে কি ধরে নিতে হবে যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি সরকারকে বাধাগ্রস্ত করছে? অবশ্যই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ। বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে, সংসদে প্রশ্ন তুলবে, রাজপথে প্রতিবাদ করবে। কিন্তু বিরোধিতা আর রাষ্ট্র পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি এক জিনিস নয়।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে এমন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যেন বৈধ রাজনৈতিক বিরোধিতা তার প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের অজুহাত হয়ে না দাঁড়ায়। অন্যদিকে বিরোধী দলকেও বুঝতে হবে, সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা আর সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারের শত্রু নয়, জনগণের পক্ষ থেকে একটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা।
তাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো “সরকার ভালো না খারাপ” নয়। প্রশ্ন হলো, সরকার কি নিজের প্রতিশ্রুতির কাছে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত? আর জনগণও কি প্রস্তুত তাদের ভোটের বিনিময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতির হিসাব চাইতে?
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু এই শক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই প্রমাণিত হবে, যখন সরকার এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার পরিবর্তে সংস্কার, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করবে।
কারণ জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য ভোট দেয়নি। ২০২৪-এর পরিবর্তনের পর ২০২৬-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা আবার একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। এখন তাদের প্রত্যাশা আরও গভীর: তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে সরকার বদলালেই শুধু পরিবর্তন আসে না, রাষ্ট্রের আচরণও বদলায়।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি সরকারের কাছে যেমন, জনগণের কাছেও তেমন: সরকার কি আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে?
তার উত্তর আজই হয়তো দেওয়া যাবে না। কিন্তু উত্তরটি পাঁচ বছর পরে যেন অনুমান করে দিতে না হয়, তার জন্য হিসাবটি আজ থেকেই শুরু করা দরকার।
কারণ গণতন্ত্রে জনগণের ভোট শুধু সরকার গঠনের অধিকার দেয় না। সেই ভোটই সরকারকে প্রতিশ্রুতির হিসাব দেওয়ার দায়িত্বও দেয়।
রহমান মৃধাগবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনই-মেইল: rahman.mridha@gmail.com
এমআরএম
বিজ্ঞাপন