বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ভয়াবহ বন্যার এক মাস পরও দুর্ভোগ কাটেনি স্থানীয় বাসিন্দাদের। সেখানে প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের ক্ষত এখন পরিণত হয়েছে পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জে। ঘরহারা অধিকাংশ মানুষ রয়ে গেছেন সহায়তা পাওয়ার বাইরে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মাছচাষিরা প্রয়োজনীয় সাহায্য পাননি। মেরামতের অপেক্ষায় ভেঙে পড়া অর্ধশতাধিক গ্রামীণ সড়ক।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার সময় কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানির চাপে প্রায় চার হাজার কাঁচাঘর পুরোপুরি ধসে যায়। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও সাড়ে চার হাজার ঘর। সেই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদ খাতে ক্ষতি হয় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৬০টি সড়ক এবং ২৭টি কালভার্ট ও ব্রিজ ক্ষতির মুখে পড়ে।
বন্যায় ধসে যাওয়া ঘরের সামনে দুই বাসিন্দা/ছবি: জাগো নিউজ
পানি নামার পর ধসে পড়ে ঘর
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার সময় কয়েকদিন পানির নিচে থাকায় মাটির ঘরগুলোর দেওয়াল ও ভিত নরম হয়ে যায়। পানি নামার পর অনেক ঘরই ধসে পড়ে। এতে হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের পাশেই অবস্থান করছেন।
পরিবারগুলো বলছে, বন্যার সময় ও পরে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকে এগিয়ে এলেও এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঘরবাড়ি নির্মাণ ও জীবিকা পুনরুদ্ধার। ঘর নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় টিন, বাঁশ, কাঠ কিংবা নগদ অর্থসহায়তা এখনো অধিকাংশ পরিবার পায়নি।
পুনর্বাসন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সবাইকে এর আওতায় নিয়ে আসা হবে। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২০ শতাংশ মানুষ পুনর্বাসনের আওতায় এসেছে। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষও ধীরে ধীরে আওতায় চলে আসবে।- ইউএনও মো. রুহুল আমিন
ত্রাণের পর এখন পুনর্বাসন
বন্যার সময় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়। এখন সেই কার্যক্রমের জায়গা নিয়েছে পুনর্বাসন কর্মকাণ্ড। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘর নির্মাণ ও জীবিকা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
পুনর্বাসনে সহায়তা করছে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট, আলহাজ্ব শামসুল হক ফাউন্ডেশন, আলম ফাউন্ডেশন, আহসানিয়া মিশন ও এডিআরএ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সরকারের পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঘর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিক্ষিপ্তভাবে ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে। কেউ আবার টিন ও নগদ অর্থ দিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তবে এসব উদ্যোগকে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলছেন স্থানীয়রা।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক/ছবি: জাগো নিউজ
৮০ শতাংশ মানুষ পুনর্বাসনের বাইরে
স্থানীয় বাসিন্দা যুবনেতা খোরশেদ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঘর তৈরির টিন, বাঁশ, কাঠ, সিমেন্ট ও নগদ অর্থ। শুধু এককালীন সহায়তা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জাগো নিউজকে জানান, পুনর্বাসন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সবাইকে এর আওতায় নিয়ে আসা হবে। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২০ শতাংশ মানুষ পুনর্বাসনের আওতায় এসেছে। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষও ধীরে ধীরে আওতায় চলে আসবে।
‘অনেক এনজিও এবং ব্যক্তিবিশেষ বিক্ষিপ্তভাবে নগদ টাকা ও টিন বিতরণ করছেন। আমরা উপজেলা প্রশাসন থেকে সবগুলো সমন্বয় করছি। আশা করছি সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টায় আমাদের সেবা কার্যক্রম ও পুনর্বাসন সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারবো,’ যোগ করেন তিনি।
আরও পড়ুন
ত্রাণমন্ত্রী / বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ করছে সরকার
বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা পেলো নতুন বাড়ির চাবি
বীজের পাশাপাশি সার ও আর্থিক সহায়তা দাবি
বন্যার পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল। অনেক কৃষকের জমিতে পলি ও বালু জমে চাষাবাদ ব্যাহত হয়েছে। মৎস্যখাতেও ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। পানির তোড়ে পুকুর ও ঘেরের বাঁধ ভেঙে মাছ ভেসে গেছে। এতে অনেক চাষি পুরো মৌসুমের বিনিয়োগ হারিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে, কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে এরই মধ্যে ছয় হাজার কৃষকের মধ্যে ধানের বীজ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও। তবে কৃষকদের দাবি, শুধু বীজ নয়, সেই সঙ্গে সার, কৃষি উপকরণ ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাও দিতে হবে। দ্রুত সহায়তা না পেলে পরবর্তী মৌসুমে ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ধসে যাওয়া ঘর/ছবি: জাগো নিউজ
পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগ, সর্দি-কাশিসহ নানা রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
এ অবস্থায় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ সহায়তা দিচ্ছে।
সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য গৃহনির্মাণ সহায়তা, কৃষকদের জন্য কৃষি পুনর্বাসন, মৎস্যচাষিদের জন্য পুনরায় উৎপাদনে ফেরার সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।- স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ভেঙে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা
বন্যার তোড়ে অর্ধশতাধিক গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে, কোথাও কালভার্ট ভেঙে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় রাস্তার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইফরাদ বিন মুনীর জাগো নিউজকে জানান, গত জুলাইয়ে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালীতে ৬০টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ১১০ দশমিক ৭০ কিলোমিটার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৫টি কালভার্ট ও দুটি ব্রিজ। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ মিটার। এছাড়া পানিসম্পদ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, সব মিলিয়ে বাঁশখালীতে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট ও পানিসম্পদ অবকাঠামোর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৮ লাখ টাকা।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মাঠ/ছবি: জাগো নিউজ
পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সংস্কারের দাবি
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা বলছেন, শুধু এখনকার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করলেই হবে না। ভবিষ্যতে বন্যার ক্ষতি কমাতে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে- স্লুইস গেট সংস্কার, খাল পুনঃখনন, খালের দখল উচ্ছেদ, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং জলাবদ্ধ এলাকাভিত্তিক পৃথক ড্রেনেজ পরিকল্পনা।
সেই সঙ্গে তাদের মতে, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি এনজিও, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘর নির্মাণ করতে হবে। এরপর কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাত পুনরুদ্ধারে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে।
আরও পড়ুন
বাঁশখালীকে বন্যামুক্ত করতে নির্মাণ হবে টেকসই বেড়িবাঁধ: ত্রাণমন্ত্রী
বন্যার ধাক্কা সামলে বোরো সংগ্রহে স্বস্তি
মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্টাফ অফিসার টু ডিসি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসিফ জাহান সিকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি বাসস্থান, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ- সব খাতেই একযোগে কাজ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এ নিয়ে কথা হলে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। এখন পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য গৃহনির্মাণ সহায়তা, কৃষকদের জন্য কৃষি পুনর্বাসন, মৎস্যচাষিদের জন্য পুনরায় উৎপাদনে ফেরার সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
এমআরএএইচ/একিউএফ/ এমএফএ
বিজ্ঞাপন