বিজ্ঞাপন
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার দুই দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে সময় যত যাচ্ছে, জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ততই কমে আসছে। এর মধ্যেই বন্যার পানিতে তৈরি হওয়া নতুন একটি হ্রদ ভেঙে আরও বড় বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত নেপালে বন্যায় অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নেপাল ও প্রতিবেশী তিব্বতে প্রায় ১ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে।
বুধবার সকালে হিমালয় এলাকায় একটি হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ি নদীগুলোর দিকে নেমে আসে। এর ফলে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়।
গ্রাম ও সড়ক তছনছ
বন্যার প্রবল স্রোত নেপালের বিভিন্ন গ্রাম ও উপত্যকার ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়েছে। কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসা যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পথটি পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
নেপাল কর্তৃপক্ষ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষের সন্ধান করছে। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হাজারো মানুষের কাছে জরুরি খাবার ও অন্যান্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
উদ্ধারকারী দল কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়েও নিখোঁজদের সন্ধান চালানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া বেশ কিছু মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
‘সবাই চলে গেছে’
বৃহস্পতিবার নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রাসুয়া শহর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন দিবগা তামাং। আরও তিনজনের সঙ্গে তাকে হেলিকপ্টারে করে নুয়াকোটের একটি সেনা ক্যাম্পে নেওয়া হয়।
উদ্ধারের পর নিজের স্বজনদের কথা বলতে গিয়ে তামাং বলেন, তার পরিচিত ও আপনজনদের কেউ আর বেঁচে নেই। তার কথায়, সবাই চলে গেছে। তারা মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো কেউ নেই। সবকিছু এবং সবাই চলে গেছে।
তার এই কথায় ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অসহায় পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে।
নতুন বন্যার আশঙ্কা
বন্যার পানি ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ এখন নতুন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার ধ্বংসাবশেষ জমে ভোতেকোশি নদীর ওপর একটি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়েছে। পানির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। হ্রদটির বাঁধ ভেঙে গেলে আবারও ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।
চীনের পক্ষ থেকেও একই ধরনের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
চীনা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি এরই মধ্যে বাঁধ দিয়ে আটকে থাকা একটি হ্রদে প্রবেশ করতে পারে। এই পরিমাণ পানি প্রায় ১ হাজার ২০০টি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুলের সমান।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জলবিদ্যা বিভাগের গবেষক ঝু জিনফেং বলেন, পানির পরিমাণ বাড়তে থাকায় ঝুঁকিও বাড়ছে।
তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
বন্যার ভয়াবহতা তিব্বতেও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। চীনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি হলো গিরং কাউন্টির সীমান্তবর্তী গিরং সীমান্ত বন্দর।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছিল।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড নেটওয়ার্কে গিরং সীমান্ত বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গত এক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে চীনের যোগাযোগ ও বাণিজ্য বাড়াতে সেখানে বিভিন্ন লজিস্টিক ও পার্কিং অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
বুধবার ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, মুহূর্তের মধ্যে বিপুল পরিমাণ কাদামিশ্রিত পানি ও ধ্বংসাবশেষ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। পালানোর চেষ্টা করা মানুষদেরও পানির প্রবল স্রোতের মধ্যে পড়তে দেখা যায়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনের অংশে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
নেপাল ও তিব্বতে উদ্ধার অভিযান চললেও নতুন করে বন্যার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধানের পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন বিপর্যয় ঠেকানোই এখন উদ্ধারকারী ও প্রশাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: রয়টার্স
এমএসএম
বিজ্ঞাপন